হোম > আমার দেশ স্পেশাল

পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা, নেই বাস্তবায়নের উদ্যোগ

আল-আমিন

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে জনমুখী ও জবাবদিহিমূলক করতে গঠিত ‘পুলিশ সংস্কার কমিশন’ তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিলেও তা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকে প্রধান বাধা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে পুলিশ বাহিনীকে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এতে পুলিশ বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা কমে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরীহ আন্দোলনরত জনতার ওপর লেলিয়ে দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। সে সরকার পতনের পর পুলিশের মনোবলে চিড় ধরে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর ‘পুলিশ সংস্কার কমিশন’ গঠন করে। দীর্ঘ পর্যালোচনা শেষে কমিশন ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি ৩৫৫ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়, যেখানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। তবে প্রতিবেদন জমার পরও তা বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, পুলিশ বাহিনী যেহেতু রাজনৈতিক সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন, তাই সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বিভিন্ন সময়ে গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশের বড় একটি অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৮৩ সালে গঠিত ব্রিগেডিয়ার এনাম কমিশনের প্রায় ৬০ শতাংশ সুপারিশই বাস্তবায়নের বাইরে থেকে যায়। ফলে বর্তমান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।

পুলিশের অভ্যন্তরের পেশাদার কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করে, জনমুখী, জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সংস্কার কমিশনের এ সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। অন্যথায় বাহিনী আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা জনআস্থাকে আরো ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এছাড়া পুলিশের প্রশিক্ষণের পর যেসব মোটিভেশনাল ট্রেনিং ছিল, সেগুলোও ধীরগতিতে চলছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশের সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা আমার দেশকে বলেন, শুধু পুলিশ নয়, যেকোনো সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি।

সংস্কার কমিশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১১টি সংস্কার প্রস্তাব আশু বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে বাছাই করা হয়েছে। প্রস্তাবগুলো হচ্ছে- থানায় জিডি রেকর্ড, মামলা রুজু, তদন্ত ও পুলিশ ভেরিফিকেশন; আটক, গ্রেপ্তার, তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ; বেআইনি সমাবেশে বল প্রয়োগ; মানবাধিকার; পুলিশের বিশেষায়িত সংস্থা বা ইউনিট শক্তিশালীকরণ; নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি; প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা; যুগোপযোগী আইন ও প্রবিধানমালা; প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক পুলিশ বাহিনী; ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং বিবিধ পর্যবেক্ষণ। সুপারিশের বিস্তারিত আলোচনায় কোন বিভাগ কোনটি বাস্তবায়ন করবে সেটি বলা হয়েছে।

কমিশনের সুপারিশে আটক ব্যক্তি বা রিমান্ডে নেওয়া আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রতিটি থানায় স্বচ্ছ জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ স্থাপন, নারী আসামির ক্ষেত্রে নারী পুলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, অজ্ঞাত আসামির বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের অপচর্চা বন্ধ এবং আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন না করার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

একইসঙ্গে এতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করার জন্য সরাসরি সব পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর ন্যস্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ও জনবান্ধব পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে র‌্যাবের অতীত কার্যক্রম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পর্যালোচনা করে এর প্রয়োজনীয়তা পুনর্মূল্যায়নের কথাও বলা হয়েছে।

এছাড়াও জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতাকে হত্যা ও আহত করার জন্য দোষী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় শাস্তি নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে পুলিশ সংস্কার কমিশন। কমিশনের সুপারিশে প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশন আইনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হবে, নাকি সাংবিধানিক কাঠামোভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান হবে তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে হওয়া বাঞ্ছনীয়। পুলিশ কমিশনের গঠন, কার্যপরিধি, সাংবিধানিক বা আইনি বাধ্যবাধকতা, আইনে অন্তর্ভুক্ত বিষয়াদি বিচার-বিশ্লেষণ ও যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। কমিশনের সুপারিশমালায় ফৌজদারি মামলা তদন্তের জন্য একটি বিশেষায়িত দল গঠন করার কথা বলা হয়েছে, যাদের তদন্ত সংক্রান্ত ইউনিট ও থানা ব্যতীত অন্যত্র বদলি করা যাবে না।

পুলিশ ভেরিফিকেশনের বিষয়ে কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, জাতীয় পরিচয়পত্রধারী চাকরিপ্রার্থীদের স্থায়ী ঠিকানা অনুসন্ধানের বাধ্যবাধকতা রহিত করা, রাজনৈতিক মতাদর্শ যাচাই-বাছাই বন্ধ, ভেরিফিকেশনের কাজ সর্বোচ্চ এক মাসে শেষ করা এবং অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনে ১৫ দিন বৃদ্ধি করা যেতে পারে। এছাড়াও পুলিশের দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রতিটি থানা বা উপজেলায় একটি ‘সর্বদলীয় কমিটি’ গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। যারা ওয়াচডগ বা ওভারসাইট বডি হিসেবে কাজ করবে এবং দুর্নীতি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।

নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সততা ও নিষ্ঠাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়াও নদীপথের অপরাধ কমাতে ভাসমান থানা গঠন করা, নারী ও জেন্ডার সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, লিগ্যাল অফিসার্স সেল ও লিগ্যাল এক্সপার্ট নিয়োগ, কর্মঘণ্টার ক্ষেত্রে আট ঘণ্টার বেশি হলে অতিরিক্ত প্রণোদনা, মানসিক চাপ হ্রাসের জন্য পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ও মেলামেশার সুযোগ, বিনোদন কার্যক্রম গ্রহণ, আবাসন সমস্যা নিশ্চিত করা, নির্দিষ্ট মেয়াদে ছুটি ভোগ বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছে।

কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, সহকারী পুলিশ সুপার নিয়োগের ক্ষেত্রে পৃথকভাবে উচ্চতা, ওজন, ফিজিক্যাল এনডিউরেন্স টেস্ট, মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। পুলিশ সুপার ও থানার ওসি পদে পদায়নের জন্য ফিট লিস্ট তৈরি, কনস্টেবল থেকে এএসআই এবং এএসআই থেকে এসআই পদোন্নতিতে প্রতি বছর পরীক্ষা দেওয়া ও উত্তীর্ণ হওয়ার রীতি বাতিল করে একবার উত্তীর্ণ হলে তাকে শারীরিক যোগ্যতাসাপেক্ষে পরবর্তী তিন বছরের জন্য পদোন্নতির যোগ্য হিসেবে বিবেচনার সুপারিশ করা হয়েছে। নারী পুলিশের সংখ্যা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। জনকেন্দ্রিক ও জনবান্ধব পুলিশিং করার জন্য নিয়মিত টাউন হল সভা, নাগরিক নিরাপত্তা কমিটি গঠন, ‘একদিন পুলিশ হয়ে দেখুন’ শিরোনামে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি, কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী ও সম্প্রসারণ, সেবামূলক ও জনবান্ধব কার্যক্রম বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

সার্বিকভাবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কার্যকর রাজনৈতিক উদ্যোগ ছাড়া এ সংস্কার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকতে পারে, যা দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

দিল্লির ‘আতিথেয়তায়’ দিল মজেছে হাসিনার, ছাড়তে নারাজ ভারত

যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা

আবু সাঈদ ভেবেছিলেন সামনে মানুষ, তবে ‘তারা ছিল অমানুষ’

ডিআরআরও এবং পিআইওদের কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি

হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য আওয়ামী সিন্ডিকেটের হাতে

মার্কিন টার্গেটে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র রেল সেতু

দুই দেশের মন্ত্রীপর্যায়ের বৈঠকে গুরুত্ব পেতে পারে মামলা প্রসঙ্গ

শীর্ষ ২০ খেলাপি কোম্পানির ১১টিই এস আলমের

বাংলাদেশকে জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতায় প্রস্তুত ইরান

পাইলটদের দ্বন্দ্বে অস্থির বিমান