হোম > আমার দেশ স্পেশাল

২৩ হাজার কারবারির কাছে জিম্মি দেশ

আলাউদ্দিন আরিফ

আমার দেশ গ্রাফিক্স

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার মাদক কারবারির কাছে একরকম জিম্মি হয়ে পড়েছে জনগণ। এই অবৈধ কারবারের বিস্তার ঠেকাতে সম্প্রতি ২৩ হাজার ৩৬ মাদক কারবারির তালিকা তৈরি করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে তালিকাটি নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে।

তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের ইয়াবা, ফেনসিডিল, ক্রিস্টাল মেথ, হেরোইন, কোকেন, এলএসডি, ক্যানাবিস ব্রাউনি, খাত, ফেনইথাইল্যামিন, সিসা, গাঁজা ও ম্যাজিক মাশরুমসহ বিভিন্ন মাদকের চোরাচালান আর কেনাবেচার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে ইয়াবার বিস্তার।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গত ১৭ সেপ্টেম্বর হালনাগাদ করা তালিকায় সবচেয়ে বেশি মাদক কারবারি রয়েছে ঢাকা বিভাগে ৪,৮৩৯ জন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে রয়েছে ৪,৭৬৬, রাজশাহী বিভাগে ৪,২৩৫, খুলনায় ৩,১৮৪, রংপুরে ১,৯৬৯, ময়মনসিংহে ১,৬০৯, বরিশালে ১,২৩৭ এবং সিলেটে ১,১৯৭ জন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখের মধ্যে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৯০ লাখ। শতকরা হিসাবে এটা মোট জনসংখ্যার প্রায় পাঁচ শতাংশ। দেশে একক জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি মাদক কারবারির বসবাস কক্সবাজারে। জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল বলেন, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে জেলার মাদক কারবারিদের তালিকা তৈরি ও নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে। তালিকাভুক্তদের নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।

ইয়াবা আসছে সীমান্তপথে

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে মাদকাসক্তদের মধ্যে ইয়াবা আসক্তির হার বেশি। ইয়াবার বড় অংশ মিয়ানমার থেকে এলেও ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকাতেও ইয়াবা উৎপাদনের কয়েকটি কারখানার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে বিজিবি। এসব কারখানা থেকে বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ফেনসিডিল ও গাঁজার প্রায় পুরোটাই চোরাচালান হয় ভারত থেকে।

কোটি কোটি পিস ইয়াবা জব্দ

পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে ইয়াবাই সবচেয়ে বেশি জব্দ করা হচ্ছে। পুলিশ গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত এক কোটি ৩৫ লাখ পিস ইয়াবা জব্দ করেছে।

বিজিবি ২০২৫ সালে এক কোটি ৪৭ লাখ ১৫ হাজার পিস ইয়াবা, সাড়ে ১০ কেজি ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, এক লাখ ৩৫ হাজার বোতল ফেনসিডিল, ২৩ হাজার কেজি গাঁজা, ৫৬ কেজি ৬৩৬ গ্রাম হেরোইন এবং প্রায় ১৪ কেজি কোকেন জব্দ করেছে।

বিজিবির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন ও প্রশিক্ষণ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম আমার দেশকে বলেন, মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে বিজিবি জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে কাজ করছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় কিছু ইয়াবা ও ফেনসিডিল কারখানা স্থাপনের তথ্য পাওয়ার বিষয়টি সীমান্ত সম্মেলনে বিএসএফকে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিকারের আশ্বাসও পাওয়া গেছে। কিন্তু বাস্তবে তারা সেটা কতটুকু বাস্তবায়ন করে বা প্রতিফলন ঘটায়Ñসেটা আমরা জানতে পারি না।

বিজিবির উখিয়া ব্যাটালিয়ন (৬৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম বলেন, মাদক সরবরাহকারী ও চোরাচালানে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি চোরাচালান ও মাদক প্রতিরোধেও বিজিবি দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে।

কারবারিদের সম্পদের হিসাব নিচ্ছে সিআইডি

মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি তাদের অবৈধ সম্পদের উৎস খুঁজছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ঢাকায় মাদক কারবারে জড়িত ৪০৬ কারবারি ও তাদের পৃষ্ঠপোষকের অবৈধ সম্পদ নিয়ে তদন্ত করছে সিআইডির মানিলন্ডারিং ইউনিট।

তদন্তের অংশ হিসেবে মাদক কারবারিদের নিজেদের ও স্বজনদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক হিসাব এবং বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে তথ্য চেয়ে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।

তালিকাভুক্তদের মধ্যে রাজধানীর ভাটারা এলাকার রাজু আহমেদের বিরুদ্ধে ৪৭, ভাসানটেকের রূপচানের বিরুদ্ধে ৪৩ এবং শাহজাহানপুরের সোহেলের বিরুদ্ধে ২৭টি মামলা রয়েছে। খিলগাঁওয়ের খালেদ মিয়ার বিরুদ্ধে ২১ এবং মুগদার লালনের বিরুদ্ধে ২২টি মামলা রয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য মাদক কারবারির প্রত্যেকে এক ডজন বা তারও বেশি মামলার আসামি।

সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোশাররফ হোছাইন বলেন, মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অনেকে দ্রুত বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হচ্ছে। মাদক কারবারিদের অবৈধ সম্পদের উৎস শনাক্ত করা এবং অর্থ পাচারের বিষয়টি তদন্ত করছে সিআইডি। পর্যায়ক্রমে সারা দেশের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারির সম্পদের উৎস ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ খতিয়ে দেখা হবে।

‘বাকিতে’ জামিনের অভিযোগ

মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তারের পর আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আবার একই কারবারে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও রয়েছে। র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘বাকিতে’ বা পরে টাকা পরিশোধের শর্তে মাদক মামলার আসামিদের জামিন করানোর তথ্যও তারা পেয়েছেন।

এর উদাহরণ হিসেবে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের মাদক কারবারি সেলিম আশরাফী ওরফে চুয়া সেলিমের কথা উল্লেখ করেছে র‌্যাব। গত ১১ জানুয়ারি তাকে গ্রেপ্তারের সময় একটি বিদেশি পিস্তল, দুই রাউন্ড গুলি ও ১১০ গ্রাম হেরোইন জব্দ করা হয়।

র‌্যাব-২-এর অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি নাঈমুল হাসান জানান, চুয়া সেলিম গ্রুপের প্রধান সেলিম আশরাফকে গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হলেও কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে ফের মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ে সে। গত ১৯ আগস্ট তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়।

সে সময় জিজ্ঞাসাবাদে সেলিম জানিয়েছে, আইনজীবীর টাকা বাকি রেখে সে জামিনে বের হয়েছিল। শর্ত ছিল, বের হওয়ার পর মাদক কারবার করে কদিনের মধ্যেই টাকা ফেরত দেবে। পরে ঠিকই জামিনে মুক্তির পর মাদক কারবার করে সে টাকা পরিশোধ করে চুয়া সেলিম। র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, এভাবে মাদক কারবারিরা জামিনে বেরিয়ে পুনরায় কারবারে জড়িয়ে পড়লে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

মাদকের চতুর্মুখী জাল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক আমার দেশকে বলেন, দেশে মাদককে কেন্দ্র করে একটি চতুর্মুখী জাল তৈরি হয়েছে। মাদক কারবার একটি ভয়ানক অপরাধমূলক বাণিজ্য। এর কারবারিদের কাছে দেশের মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে। মাদক কারবারে অল্প বিনিয়োগে বেশি লাভ হওয়ায় নতুন নতুন মানুষ এতে জড়িয়ে পড়ছে। নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকাদের কেউ কেউ আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে মাদক কারবারিদের সুযোগ করে দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, মাদকের সহজলভ্যতার কারণে সেবনকারীর সংখ্যাও বাড়ছে। অনলাইন ও অফলাইন—দুই মাধ্যমেই মাদক পাওয়া যাচ্ছে। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন।

তার মতে, মাদক কারবারিরা গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে আবার একই কাজে জড়ালে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। জামিনে মুক্ত ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি আইন অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে নির্মোহভাবে তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। ওই তালিকার ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাদক পাচারের স্থল ও জলপথ চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন এবং নৌপথে টহল জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মাদক বহনের সঙ্গে যুক্তদেরও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

মাদরাসার আবাসিক শিক্ষার্থীদের খাবারে পুষ্টির তীব্র ঘাটতি

খাল খননে মহাপরিকল্পনা সাফল্য নিয়ে সংশয়

চাকরিচ্যুতি ও কঠোর সাজা হতে পারে ওসি রাকিবুলের

১২০০ কোটি টাকা আজও ফেরত দেয়নি ভারত

কওমিপন্থি সাত ইসলামি দলের ঐক্য কত দূর

এবার পুলিশেও ‘গুপ্ত’, বাহিনীতে অস্বস্তি

ঋণ ১১৩ বিলিয়ন ডলার, অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে দেশ

কৌশলগত সাবমেরিন ক্যাবল আরাফাতের মালিকানায়

সঞ্চালন লাইনের অভাবে আনা যাচ্ছে না ভোলার গ্যাস

হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশা ওসির, অবশেষে প্রত্যাহার