মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের সংকট চলছে। দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও বিপণনে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। জ্বালানি তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, বিপণন প্রতিষ্ঠান, ডিপোর কর্মকর্তা ও ডিলারদের মধ্যেও চলছে সমন্বয়হীনতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের মন্ত্রী ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সমন্বিত উদ্যোগের অভাব দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সুপারিশও আমলে নেওয়া হচ্ছে না।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। আতঙ্কে স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে বেশি করে জ্বালানি তেল কেনা শুরু হলে সরকার রেশনিং পদ্ধতি প্রয়োগ করে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে দাবি করে এক পর্যায়ে রেশনিং পদ্ধতি প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু এখনো পেট্রোল পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে।
মজুত ও সরবরাহ নিয়েও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান এবং পেট্রোল পাম্প মালিকদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যায়। সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুতের কথা বলা হলেও বাস্তবে কতটা রয়েছে তা পরিষ্কার করা হচ্ছে না। অপরদিকে চাহিদার তুলনায় অর্ধেক জ্বালানি তেল পাচ্ছেন বলে দাবি করছেন পেট্রোল পাম্প মালিকরা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বিশেষজ্ঞরা।
মাঠের চিত্র বনাম মন্ত্রী-কর্মকর্তাদের আশ্বাস
জ্বালানি তেলের পরিস্থিতি নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গত মঙ্গলবার বলেছেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।
নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। তবে, মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনতে শুরু করায় পাম্পগুলোতে সময়ের আগেই তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যায়ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
এর আগে ৭ মার্চ এক ব্রিফিংয়ে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। ৯ মার্চ দেশে আরো দুটি তেলবাহী জাহাজ আসছে। ফলে সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
২৩ মার্চ নিজ বাসায় আয়োজিত ব্রিফিংয়ে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং গত বছরের তুলনায় এবার ২৫ শতাংশ বেশি তেল আমদানি করা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ভর্তুকি দিয়েও জ্বালানি তেলের আমদানি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা হয়েছে। সবাই তেল পাবেন, তাই অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমদানিতে কোনো ঘাটতি নেই, বরং চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বাড়ানোর সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি তেলের পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল বুধবার দিনের শুরুতেই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকের বিষয়ে বিকেলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে, এটি আরো বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
এদিন দুপুরে তথ্য মন্ত্রণালয় সরকারের এক মাসের সাফল্য ও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের সূচনা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে। এতে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদুর রহমান মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও দেশের জ্বালানি তেলের পরিস্থিতির প্রসঙ্গ নিয়ে বক্তব্য দেন।
তারা বলেন, আতঙ্ক থেকে অতিরিক্ত পরিমাণে জ্বালানি তেল কেনায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক হয়ে গেলে জ্বালানি তেলের বিষয়ে কোনো সমস্যা থাকবে না।
সরকারের এমন বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও পেট্রোল পাম্পের মালিকরা। তাদের মতে, মজুত স্বাভাবিক থাকলে পাম্পগুলো এতদিন ধরে বন্ধ থাকার কথা নয়।
সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, একটি ট্যাংক লরির প্রতিটি চেম্বারের ধারণক্ষমতা চার হাজার পাঁচশত লিটার। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ডিপো থেকে দুই থেকে তিন হাজার লিটার পেট্রোল ও অকটেন বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।
পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির নেতারা জানান, ডিজেলের সরবরাহের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সমস্যা না হলেও পেট্রোল ও অকটেন চাহিদার তুলনায় অর্ধেক দিতে পারছেন। সমস্যার জন্য তারা বিপিসিকে দায়ী করেন। তাদের মতে, বিপিসির কর্মকর্তারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারছেন না।
সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা
জ্বালানি তেল নিয়ে পেট্রোল পাম্পগুলোতে হাহাকার চলছে। এ পরিস্থিতির জন্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থা এবং পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির নেতাদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন আমার দেশকে বলেন, আমাদের জ্বালানি তেলের মধ্যে ডিজেল পুরোটাই আমদানি করতে হচ্ছে। পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদার বেশিরভাগই দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে যোগান দেওয়া হয়। আমরাও দেখছি বাজারে ডিজেলের কোনো ঘাটতি নেই। অথচ অকটেন ও পেট্রোলের জন্য সর্বত্র হাহাকার চলছে। স্বাভাবিকভাবে এটি হওয়ার কথা নয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে মন্ত্রী ও সরকারের নীতি-নির্ধারকদের পর্যাপ্ত মজুতের কথা বলাটা অতিরঞ্জিত নয়।
তবে মাঠের চিত্র ভিন্ন বলে মনে করেন জ্বালানি খাতের এ বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই সরকারের উচিত ছিল সব অংশীজনকে নিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া। কারণ আমাদের সমস্যা সামনে আরো প্রকট হবে। ওই পরিস্থিতিতে সরকার প্রায় তিনগুণ দামে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কিনছে। এটা সাপ্লাই চেইনে যোগ হতেও সময় লাগবে। তাছাড়া সবার বক্তব্যেও একটি সমন্বয় থাকা প্রয়োজন, যাতে জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি না হয়। অকটেন ও পেট্রোল ডিপো থেকে পাম্পে ঠিকমতো যাচ্ছে কি না বা পাচার হচ্ছে কি না, সেটাও তদারকি করা জরুরি।
জ্বালানি ব্যবহারে আরো সাশ্রয়ী ও এখনই কর্মপদ্ধতি নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। আমার দেশকে তিনি বলেন, এ সংকটের বিষয়ে সবাই অবগত। এখন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। আমাদের কৃষিকে আগে বাঁচাতে হবে। ব্যক্তিগত পর্যায়ের গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহারে সবাইকে উৎসাহিত করাসহ জ্বালানি সাশ্রয়ী কার্যক্রম নিতে হবে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হুঁশিয়ারি আমলে নেয়নি সরকার
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, চলমান যুদ্ধের কারণে গোটা বিশ্বেই জ্বালানি তেলের মারাত্মক প্রভাব দেখা দিয়েছে। তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধের কারণে বিশ্ব মারাত্মক জ্বালানি সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিল আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)। পাশাপাশি ১০টি সুপারিশ তুলে ধরেছে সংস্থাটি। সরকার কর্মপদ্ধতি নির্ধারণের আগে এ সুপারিশগুলো আমলে নেওয়া জরুরি ছিল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
চলমান জ্বালানি সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরে গত সোমবার অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় এক অনুষ্ঠানে আইইএ প্রধান ফাতিহ বিরোল বলেন, গত শতকের সত্তরের দশক ও কয়েক বছর আগের ইউক্রেন যুদ্ধ যে জ্বালানি সংকট তৈরি করেছিল, সেই দুই ঘটনা যোগ করলেও এবারের পরিস্থিতির সমান হবে না। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার কারণে বর্তমানে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এটা ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালের ধাক্কা এবং ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের ফলে সৃষ্ট গ্যাস-সংকটকেও ছাড়িয়ে গেছে।
তিনি আরো বলেন, হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলার কারণে বিশ্বে জ্বালানি তেল সরবরাহ প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ব্যারেল কমেছে। এর মাত্রা সত্তরের দশকের সংকটের দ্বিগুণের বেশি। বর্তমান সংকটের কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ কমেছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি কিউবিক মিটার। অথচ ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এই ঘাটতি ছিল প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি কিউবিক মিটার।
সংকটকে সংকট হিসেবে না নিয়ে পাশ কাটানোর চেষ্টা করা হলে তা আরো বেশি করে ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলে মনে করেন জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন।
তিনি বলেন, দেশে যে জ্বালানি সংকট চলছে তাতে সরকারের দায় নেই। বৈশ্বিক পরিস্থিতির শিকার এখন বাংলাদেশ। বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা এটিকে ভয়াবহ সংকট হিসেবে দেখছে। ফিলিপাইন সরকারও সে দেশে জ্বালানি নিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছে। আমাদের সামনেও হয়তো এ ধরনের একটি সংকট আসতে পারে। এখন থেকেই জনগণ ও সরকারকে সচেতন এবং তা মানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। সংকটকে পাশ কাটিয়ে গেলে তার দায় পুরো জাতিকেই বহন করতে হবে।