ব্যস্ত সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা কিংবা আবাসিক এলাকা—কোথাও পুরোপুরি নিরাপদ বোধ করছেন না দেশের সাধারণ মানুষ। ভোরে রিকশা থেকে ব্যাগ টানতে গিয়ে নারীর মৃত্যু, দিনে-দুপুরে ব্যাংকের টাকা ছিনতাই, প্রকাশ্যে গুলি, সশস্ত্র মহড়া, বোমা উদ্ধার কিংবা পরিত্যক্ত অবস্থায় লাশ উদ্ধার—সাম্প্রতিক একের পর এক এ ধরনের ঘটনায় সারা দেশে নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
পুলিশ বিভিন্ন সময় অভিযান, গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য দিলেও অপরাধের পরিসংখ্যান ও মাঠের চিত্রে সেই স্বস্তি পুরোপুরি প্রতিফলিত হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, মানুষের নিরাপত্তাহীনতা যখন দৃশ্যমান, তখন পুলিশের অগ্রাধিকার কোথায়?
গত ২৯ আগস্ট ভোরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে স্বামীর সঙ্গে রিকশায় যাচ্ছিলেন বগুড়ার একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন (৫৫)। চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীর টানে চলন্ত রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে তিনি গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঘিরে যেখানে বাড়তি নিরাপত্তা থাকার কথা, সেখানেই এভাবে একজন নারীর মৃত্যু নতুন করে নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে এনেছে।
এর একদিন পর ধানমন্ডিতে ব্যাংক থেকে তোলা ৩৯ লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলযোগে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এর আগে ৯ আগস্ট উত্তরায় একটি ফিলিং স্টেশনের এক কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা দিতে যাওয়ার সময় সশস্ত্র দল গাড়ি থামিয়ে টাকা নিয়ে যায়। ৩১ আগস্ট গেন্ডারিয়ার স্বামীবাগ-মুন্সিরটেক এলাকায় সশস্ত্র ব্যক্তিদের গুলিতে নারীসহ কয়েকজন আহত হন।
শুধু ছিনতাই, ডাকাতি কিংবা প্রকাশ্যে গুলির ঘটনাই নয়, রাজধানী ও আশপাশে একের পর এক বোমা উদ্ধারের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ২৪ জুলাই মতিঝিলে ছাতা বোমা, ৩১ জুলাই আশুলিয়ায় প্রেসার কুকার, ১১ আগস্ট সাভারে বোমার আস্তানা, ১২ আগস্ট আবার প্রেসার কুকার এবং ১৬ আগস্ট ডেমরায় বোমা উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক থেকে আবাসিক এলাকা, দিনের ব্যস্ত সময় থেকে ভোররাত—সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আসলে কতটা নিশ্চিত?
পুলিশের হিসাবেও স্বস্তি নেই
পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পর্যালোচনার হিসাবও পুরোপুরি স্বস্তির ছবি দিচ্ছে না। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই— ছয় মাসে সারা দেশে বিভিন্ন অপরাধে ৯৯ হাজার ৯৯২টি মামলা হয়েছে। আগের ছয় মাসে এ সংখ্যা ছিল ৮৯ হাজার ১২টি। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে নথিভুক্ত মামলাই বেড়েছে ১০ হাজার ৯৮০টি।
কিছু অপরাধ কমলেও মানুষের জীবন ও শারীরিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কয়েকটি অপরাধ বেড়েছে। ফেব্রুয়ারি-জুলাই সময়ে হত্যার মামলা হয়েছে ১,৭৮৯টি, আগের ছয় মাসে যা ছিল ১,৭৮০টি। বছরের প্রথম ছয় মাসে সারা দেশে ১,৭৭৮ জন খুন হয়েছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের (১,৫৮৫টি) তুলনায় ১২ দশমিক দুই শতাংশ বেশি। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ১০ হাজার ৯০টি থেকে বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার ১৬৫টি। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ২৭৫ থেকে বেড়ে ৩১৭টিতে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত সাত মাসে অন্তত ৭৫ জনের প্রাণহানির তথ্যও সামনে এসেছে। চট্টগ্রামের রাউজান, নিউমার্কেট, খাগড়াছড়ি, মুক্তাগাছা, কাপাসিয়া, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ৩ সেপ্টেম্বর রাতে মিরপুরের রূপনগরে একটি বাসা থেকে ১৮ বছর বয়সি এক নারীর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। গতকাল শুক্রবার ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে মুখ টেপ দিয়ে আটকানো অবস্থায় ইসমাইল নামের এক সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকের লাশ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ডেমরায় মাথায় ইটের আঘাতে দেলোয়ার হোসেন নামে এক অটোরিকশা চালক নিহত হন। এদিকে একই দিন সকালে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে সড়কের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৩০ বছর বয়সি এক অজ্ঞাত নারীর রক্তাক্ত লাশ।
অপরাধের নেপথ্যে অবৈধ অস্ত্র
মাঠপর্যায়ে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় থানা ও ব্যারাক থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, পিস্তল, সাব-মেশিনগান (এসএমজি) ও চাইনিজ রাইফেলের মতো অন্তত ১,৩১১টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো অপরাধী ও সন্ত্রাসী চক্রের হাতে রয়েছে।
অস্ত্রের সহজলভ্যতার সঙ্গে সংঘবদ্ধ ছিনতাই ও প্রকাশ্যে হামলার প্রবণতাও বাড়ছে। রাজধানীতে শুধু চলন্ত যান থেকে ব্যাগ টানাই নয়, ২ থেকে ৫ জনের সশস্ত্র দল পথচারীকে ঘিরে চাপাতি বা আগ্নেয়াস্ত্রের ভয় দেখিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সর্বস্ব নিয়ে যাচ্ছেÑ এমন অভিযোগের অভাব নেই।
নথির বাইরেও থেকে যাচ্ছে অপরাধ
এদিকে পুলিশের নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা দিয়েই পুরো অপরাধচিত্র বোঝা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, জেলা বা বিভাগের অপরাধের সংখ্যা কম দেখানোর প্রবণতায় অনেক ক্ষেত্রে ছিনতাই, ডাকাতি বা দস্যুতার মামলা না নিয়ে ভুক্তভোগীদের সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে বলা হয়।
গত ১৬ আগস্ট মৌচাক মোড়ে ধারালো অস্ত্রের মুখে সর্বস্ব হারানো এক ব্যবসায়ী থানায় গেলে তাকে ছিনতাইয়ের মামলা না করে ফোন হারানোর জিডি করতে বলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে গত জুনে মোহাম্মদপুরে ছিনতাইয়ের শিকার দুজনের একজন শুধু মোবাইল হারানোর জিডি করেছেন, অন্যজন হয়রানির আশঙ্কায় থানাতেই যাননি।
বাংলাদেশ পুলিশের নিজস্ব ‘ক্রাইম ভিকটিমাইজেশন সার্ভে’র তথ্য অনুযায়ী, সংঘটিত অপরাধের প্রায় ৭৩ শতাংশ ভুক্তভোগী পুলিশি ঝামেলা ও বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় থানামুখী হন না। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানে যত মামলা দেখা যায়, বাস্তবে অপরাধের সংখ্যা তার চেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একজন নাগরিক রাতে বাসায় ফেরার সময় কতটা নিরাপদ বোধ করছেন, কিংবা ব্যবসায়ী নগদ টাকা বহনের সময় কতটা আশ্বস্ত— সেটিই আইনশৃঙ্খলার আসল পরিমাপক। কিন্তু সে পরিমাপকে রাজধানীর অবস্থান উদ্বেগজনক। ১৯ মার্চ উত্তরা এলাকায় মুক্তা আক্তার, জুনে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে সোহেলি ইসলাম এবং সর্বশেষ ২৯ আগস্ট রনজিনা পারভীন একই ধরনের ঘটনায় প্রাণ হারান। গত ছয় মাসে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ১৭২টি মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪০২ জনকে।
পুলিশের অভিযানও চলছে
তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আলোচনায় পুলিশের সাফল্যের দিকও রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ১ মে থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত দেশব্যাপী বিশেষ অভিযানে ৫৩ হাজার ৫১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যান্য মামলা ও অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন আরো এক লাখ ৪১ হাজার ৬২৮ জন। দুই ধরনের অভিযানে মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৯৫ হাজার ১৪৬।
২৯ জুলাই পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতি ও অপহরণের মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়। সমস্যা তাই নির্দেশনার অভাবে যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি বাস্তবায়নের জায়গায়।
অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, মানুষের নিরাপত্তাহীনতা যখন দৃশ্যমান, তখন পুলিশের অগ্রাধিকার কোথায়?
রাজপথে যখন একের পর এক অপরাধ ঘটছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে যখন নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে, ঠিক সেই সময় পুলিশ সদর দপ্তর ও পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা ভার্চুয়াল জগতের ‘গুজব, অপতথ্য’ এবং কর্মকর্তা কিংবা বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার বিষয়টি ঠেকানোও যেন পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে।
গত ৭ আগস্ট পুলিশ সদর দপ্তর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশ ও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নামে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে উদ্বেগ জানায়। পরদিন দেশজুড়ে বোমা হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে সেটিকে গুজব বলে জানায় পুলিশ। ৯ ও ১১ আগস্ট পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনও সামাজিক মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রকাশিত খবরের সমালোচনা করে। পরে ডিএমপির অপরাধ পর্যালোচনা সভাতেও ‘অপপ্রচার ও গুজব মোকাবিলা’ গুরুত্ব পায়।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যেখানে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, দ্রুত অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। নিয়মিত অভিযানও অব্যাহত রয়েছে। সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির আলোকে অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরলস প্রচেষ্টায় জনগণের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে এবং পরিস্থিতি আরো উন্নত ও টেকসই করতে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) দিদারুল আলমের মতে, সংঘবদ্ধ ছিনতাই ও ডাকাতচক্রের মূল নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, অবৈধ অস্ত্রের উৎস বন্ধ, একাধিক মামলার আসামিরা কীভাবে আবার অপরাধে ফিরছে তা খুঁজে বের করা এবং দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। তার মতে, অপরাধের পর অভিযান চালানোর পাশাপাশি অপরাধ ঘটার আগেই তা প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।