হোম > আমার দেশ স্পেশাল > অনুসন্ধান

এসএসএফের ৩২ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়নি দুই বছরেও

আল-আমিন

জুলাই বিপ্লবের সময় গণভবন থেকে এসএসএফের খোয়া যাওয়া অত্যাধুনিক ৩২টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি দুই বছরেও। এসব অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে চলে গেলে নাশকতাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। খোয়া যাওয়া এসব অস্ত্র উদ্ধারে সাঁড়াশি অভিযানের পরিকল্পনা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর গণভবনের প্রাচীর ও প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে ঢোকে গণঅভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতা। তখন প্রাণরক্ষার জন্য দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন এসএসএফ (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স) সদস্যরা। এ সময় তারা কোনো অস্ত্র ও গুলি নিতে পারেননি। শুধু নিজেদের সঙ্গে থাকা ছোট আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে গণভবন থেকে তারা চলে যান।

গণভবনের এসএসএফের অপারেশন কক্ষে অত্যাধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদ, সাজসরঞ্জাম, বেতার যোগাযোগ যন্ত্র, ট্যাকটিক্যাল গিয়ার ও অপারেশনাল সরঞ্জামাদি স্থায়ীভাবে স্থাপন করা দুটি ভল্টে মজুত ছিল। একটি ভল্টে দুটি এসএমজি টি-৫৬ এবং অপর ভল্টে তাজা গোলাবারুদ ছিল। কিন্তু পরে গণভবনে থাকা ভল্টগুলো আর পাওয়া যায়নি। সেখান থেকে ৩২টি অত্যাধুনিক অস্ত্র খোয়া গেছে। এসব অস্ত্রের মধ্যে ছিল—অত্যাধুনিক অ্যাসল্ট রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, ফ্ল্যাশ ব্যাং গ্রেনেড, অ্যান্টি ড্রোনগান, অ্যান্টি ড্রোন সিস্টেম এবং বেতার যোগাযোগের ডিভাইস। এসএসএফের অস্ত্রগুলো ছিল লং রেঞ্জ এবং দুরবিন লাগানো।

এসএসএফের খোয়া যাওয়া এসব অস্ত্র নিয়ে ভাবাচ্ছে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলো সন্ত্রাসীদের হাতে চলে গেলে দেশে নৈরাজ্য বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন অপরাধ বিজ্ঞানীরা।

এদিকে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের বিভিন্ন থানা থেকে খোয়া যাওয়া ১,৩১০টি অস্ত্র দুই বছরেও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এসব অস্ত্র উদ্ধারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একাধিকবার পুরস্কার ঘোষণা করা হলেও উদ্ধার হয়নি। ওই সময় লুট হওয়া সরকারি অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চালাতে মাঠে নামছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। গত ২ সেপ্টেম্বর প্রেস ব্রিফিংয়ে র‌্যাবের মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ এ কথা জানান।

খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ কতটা তৎপর—জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এআইজি এএইচএম শাহদাত হোসাইন আমার দেশকে বলেন, ‘খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে। অস্ত্রের অবস্থান শনাক্ত করে দ্রুত উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। এছাড়া তথ্যদাতাদের পরিচয় গোপন রেখে পুরস্কারের ব্যবস্থাও রয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেসব অস্ত্র গণঅভ্যুত্থানের সময় হারিয়ে গেছে বা লুট হয়েছে, সেগুলো দ্রুত উদ্ধার জরুরি। নইলে আইনশৃঙ্খলার বিঘ্ন ঘটবে। খোয়া যাওয়া অস্ত্রগুলো যারা নিয়েছে, তারা তো ভুল করে নেয়নি। যারা নিয়েছে, তারা পরিকল্পনা করে নিয়েছে। তাদের আলাদা একটি উদ্দেশ্য আছে। অপরাধমূলক কাজে অস্ত্রগুলো ব্যবহার করবে তারা। অস্ত্র উদ্ধারে সরকারের পুরস্কার ঘোষণার যে কৌশল, সেটা খুব একটা কাজে দেবে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘পুরস্কারে সাড়া দেবে না অপরাধীরা। শুধু অস্ত্র উদ্ধারের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ অভিযান চালাতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের পাশাপাশি সেনাবাহিনী যদি সারা দেশে বিশেষ অভিযান চালায়, তাহলে একটি ফল পাওয়া যাবে।’

জানা গেছে, চব্বিশের ৫ আগস্ট ঢাকাসহ সারা দেশে পুলিশের থানা ও ফাঁড়িগুলোয় বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালায়। ওই সময় সেখান থেকে কে বা কারা অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করে নিয়ে যায়।

পুলিশ জানায়, ওই সময় ৫,৭৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ছয় লাখ ৫১ হাজার ৮২৬ রাউন্ড গোলাবারুদ লুট হয়। পুলিশ পর্যায়ক্রমে লুট হওয়া অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা শুরু করে। কিছু উদ্ধার হলেও এখনো ১,৩১০টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়নি। খোয়া যাওয়া গোলবারুদের মধ্যে প্রায় দুই লাখ ৫২ হাজার উদ্ধার হয়নি। লুট হওয়া অস্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি (লাইট মেশিনগান), শটগান, পিস্তল, কাঁদানে গ্যাস লঞ্চার, গ্যাসগান, কাঁদানে গ্যাসের শেল, পিপার স্প্রে, সাউন্ড গ্রেনেড, বিভিন্ন বোরের গুলি, টিয়ার গ্যাসের শেল, টিয়ার গ্যাস গ্রেনেড, সাউন্ড গ্রেনেড, কালার স্মোক গ্রেনেড, সেভেন মাল্টিপল ব্যাং স্টান গ্রেনেড, ফ্ল্যাশ ব্যাংক গ্রেনেড ও হ্যান্ডহেল্ড টিয়ার গ্যাস স্প্রে।

এদিকে, এসব অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারে পুলিশের কচ্ছপগতি লক্ষ করা গেছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে খুন ও ছিনতাইয়ের ঘটনার পর কেউ যখন পুলিশের কাছে ধরা পড়ছে, তখন তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হচ্ছে ৫ আগস্ট খোয়া যাওয়া অস্ত্র। গত ২৭ এপ্রিল রাতে রাজধানীর পল্লবী এলাকায় অরিন ও হুদা নামে স্থানীয় দুই সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ২০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। ডিবি জানায়, ওই ২০ রাউন্ড গুলি জুলাই আন্দোলনের সময় খোয়া যাওয়া গুলি।

পুলিশ জানায়, লুট হওয়া অস্ত্রে পুলিশ বাহিনীর সাংকেতিক চিহ্ন রয়েছে। এতে অস্ত্রগুলো সহজেই চিহ্নিত করা যায়। অস্ত্রগুলো দৃর্বৃত্তরা রঙ করে অথবা সাংকেতিক চিহ্ন বদল করতে পারে। ফলে উদ্ধার করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। খোয়া যাওয়া অস্ত্রগুলো উদ্ধারে দেরি হওয়ার অন্যতম কারণ পুলিশের বদলি প্রভাব। গত ১৭ বছর ধরে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে যারা কর্মরত ছিলেন, তাদের সবাই বদলি হয়ে গেছেন। ঢাকায় নতুন আসা পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অনেকেই রাস্তাঘাট ও অলিগলি চিনতে পারছেন না। দুর্বৃত্তদের শনাক্ত না করার কারণে অস্ত্রগুলো উদ্ধার হচ্ছে না।

পুলিশ জানায়, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ঢাকাসহ সারা দেশে ৪৭২টি থানায় হামলার ঘটনা ঘটে। ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে ৯৮টি থানা ও ফাঁড়িতে। ঢাকায় ৪৮টি থানায় আগুন দেওয়া হয়। ওই সময় দুর্বৃত্তরা থানা ও পুলিশ ফাঁড়িসহ পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করে নিয়ে যায়। ওই সময় চায়না রাইফেল ১,১১৪টি, বাংলাদেশি টি-৮ রাইফেল ১২টি, চায়না এসএমজি ২৫৩টি, এলএমজি ৩৪টি, এসএমজি/এসএমটি ৩৩টি, পিস্তল ১,৬৩১টি, শটগান ২,০৭৯টি এবং সিঙ্গেল শটের গ্যাসগান ৫৮৯টি লুট হয়েছিল। এছাড়া টিয়ার গ্যাস লঞ্চার ১৫টি এবং তিনটি সিগন্যাল পিস্তলও লুটের তালিকায় রয়েছে।

এসব আগ্নেয়াস্ত্রের সঙ্গে বিভিন্ন বোরের ছয় লাখ ১৩ হাজার ১৫৮ রাউন্ড গুলি, টিয়ার গ্যাসের শেল ৩১ হাজার ২১২টি, টিয়ার গ্যাস গ্রেনেড ১,৪৮৬টি, সাউন্ড গ্রেনেড ৪,৭৪৬টি, কালার স্মোক গ্রেনেড ২৭৩টি, মাল্টিপল ব্যাং স্টান গ্রেনেড ৫৫টি, ফ্ল্যাশ ব্যাং গ্রেনেড ৯০০টি এবং ১৭৮টি হ্যান্ডহেল্ড টিয়ার গ্যাস স্প্রে লুট হয়।

উদ্ধার হয়নি যেসব অস্ত্র

পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানায়, লুট হওয়া অস্ত্রগুলোর মধ্যে এখনো ১০৯টি চায়না রাইফেল, একটি রাইফেল, ৩০টি চায়না এসএমজি, তিনটি এলএমজি, ২০৩টি ৭.৬২ পয়েন্ট ২৫ মিমি পিস্তল এবং ৪৪৩টি ৯.১৯ মিমি পিস্তল, ৩৮৪টি ১২ বোরের শটগান, ১২৮টি সিঙ্গেল শটের গ্যাসগান, সাতটি সিক্স শটের টিয়ার গ্যাস লঞ্চার এবং দুটি সিগন্যাল পিস্তল উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া লুট হওয়া ৩৩টি এসএমজি/এসএমটির একটিও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে লুট হওয়া বিভিন্ন বোরের দুই লাখ ৪৩ হাজার ৮০০ রাউন্ড গুলি, ১১ হাজার ৩৯৮টি বিভিন্ন ধরনের টিয়ার গ্যাস শেল, ২৯১টি টিয়ার গ্যাস গ্রেনেড, ১,১৬৮টি সাউন্ড গ্রেনেড, ৪১টি কালার স্মোক, ২২টি মাল্টিপল ব্যাং স্টান গ্রেনেড, ২৮৪টি ফ্ল্যাশ ব্যাং গ্রেনেড এবং ১১৬টি হ্যান্ডহেল্ড টিয়ার গ্যাস স্প্রে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশ জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সারা দেশে নৈরাজ্যকর অবস্থা চলছিল। ওই সুযোগে এক শ্রেণির আসামি জেল থেকে পালিয়ে যায়। যারা জেল থেকে পালিয়েছে, তাদের সবাইকে ফেরত আনা সম্ভব হয়নি। এছাড়া পটপরিবর্তনের সুযোগে বেশকিছু জঙ্গি ও শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিন নিয়ে জেলখানা থেকে বেরিয়ে আসে। তারা অপরাধ কার্যক্রম পরিচালনা করতে অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহ করতে পারে।

সূত্র জানায়, লুণ্ঠিত কিছু অস্ত্র অপরাধী চক্রের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে পুলিশ বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার করা সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে খোয়া যাওয়া ওই সব অস্ত্রের কিছু উদ্ধার করেছে। খোয়া যাওয়া অস্ত্র সীমান্ত দিয়ে যাতে পাচার হতে না পারে, সেজন্য শিগগির সাঁড়াশি অভিযান চালাবে পুলিশ। সীমান্ত এলাকাগুলোয় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ।

জানা গেছে, অস্ত্র খোয়া যাওয়ার বিষয়ে ডিএমপিতে ৯৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ১১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে লুট হওয়া অস্ত্রগুলো উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ।

ডেভিড ইমনের সহযোগী টেস্তার মোবারক দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার

ফাইনালে মুখোমুখি রিবাকিনা-সাবালেঙ্কা

প্রেমিকার পেছনে ৫ কোটি টাকা খরচ, সম্পর্ক ভাঙতেই ফেরত চেয়ে মামলা

হুথিদের রুখতে সহায়তা চাইল সৌদি, ট্রাম্পের না

গ্যাস তেল জ্বালানি সংকটের সমাধানে অংশ নিতে চাই

তরুণরা চাইলে দেশটাকে পরিবর্তন করতে পারে

লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, ফের হামলার হুমকি হুথিদের

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক: বহুমাত্রিক সম্ভাবনা

চকরিয়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল স্কুল শিক্ষার্থীর

৬.৬ মাত্রার ভূমিকম্পে কাঁপল ইন্দোনেশিয়া