দেশের স্কুল-কলেজ ও মাদরাসাগুলো পরিচালনায় ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি গঠনে ভোটের মাধ্যমে শিক্ষক-অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচনের নিয়ম আছে। তবে বিভিন্ন অজুহাতে দীর্ঘদিন ধরে সে নির্বাচনের সুযোগ পাচ্ছে না প্রতিষ্ঠানগুলো। একের পর এক গঠন করা হচ্ছে অ্যাডহক কমিটি। এমনকি জরুরি অবস্থার নিয়ম কাজে লাগিয়ে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সময় বিশেষ পরিস্থিতি কমিটিও গঠন করা হচ্ছে।
সম্প্রতি রাজধানীর একটি স্কুল অ্যান্ড কলেজে গভর্নিং বডি নির্বাচনের আয়োজন করা হলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করা হয়। এতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও অভিভাবকদের মাঝে বেশ ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনির্বাচিত কমিটি দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অনিয়ম-দুর্নীতি ও দলীয়করণসহ বিভিন্ন জটিলতা বাড়ছে বলে তারা দাবি করেন।
এদিকে, দেশের সব দাখিল ও আলিম মাদরাসার মেয়াদোত্তীর্ণ অ্যাডহক কমিটি বাতিল করে নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠনে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত সব প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে জানানো হয়েছে। নিয়মিত কমিটির পরিবর্তে এভাবে অ্যাডহক কমিটির দ্বারা পরিচালনা করায় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক গতি বিঘ্ন হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্রমতে, পতিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি নির্বাচন প্রক্রিয়া থমকে যায়। কিছু প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন হলেও তাতে ব্যাপক অনিয়মের ঘটনা ঘটে। সবশেষ চব্বিশের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি বাতিল করে অ্যাডহক কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তখন ওই কমিটিতে স্থান পাওয়া নিয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের অনুসারীদের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের দাবি উঠলেও বিভিন্ন কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। এ সুযোগে ছয় মাস মেয়াদি অ্যাডহক কমিটিগুলোর মেয়াদ কয়েক দফায় বাড়ানো হয়।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি দখল নিয়ে নতুন তৎপরতা শুরু হয়। নতুন করে গঠন করা হচ্ছে অ্যাডহক কমিটি। এমনকি প্রবিধানমালার বিশেষ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ কমিটি গঠনেরও খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবক নেতারা চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে নির্বাচিত কমিটি গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
সূত্রমতে, গত ২৫ জুলাই রাজধানীর সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আগের রাতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে তা স্থগিত করা হয়। এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং নির্বাচনের নতুন শিডিউল ঘোষণার দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেন প্রতিষ্ঠানটির অভিভাবক ও গভর্নিং বডির নির্বাচনের প্রার্থীরা। তবে ওই নির্বাচন আর আলোর মুখ দেখেনি।
অ্যাডহক কমিটি গঠনের বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা সম্পর্কে জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া ছয় মাস পর অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ নেই। তাদের নিয়মিত কমিটি গঠনের দিকে যেতেই হবে। ২০২৪ সালের সংশ্লিষ্ট প্রবিধানমালা ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সংশোধনীর আলোকে সমন্বিতভাবে একটি প্রবিধানমালা তৈরির কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
মাদরাসার মেয়াদোত্তীর্ণ অ্যাডহক কমিটি বাতিল
এদিকে, গত ২ আগস্ট মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের রেজিস্ট্রার এসএম তৌহিদুজ্জামান স্বাক্ষরিত জরুরি চিঠিতে অ্যাডহক কমিটি বাতিলের নির্দেশের কথা জানানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের গত ৩০ জুলাইয়ের পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (দাখিল ও আলিম স্তরের বেসরকারি মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি) প্রবিধানমালা, ২০২৫-এর প্রবিধি ৬৪ অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। এর আওতায় মেয়াদোত্তীর্ণ অ্যাডহক কমিটিসহ দেশের সব বেসরকারি দাখিল ও আলিম মাদরাসার অ্যাডহক কমিটি বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত অ্যাডহক কমিটি গঠনের অনুমতি গ্রহণ করে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠন করতে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
এতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (দাখিল ও আলিম স্তরের বেসরকারি মাদরাসার গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি) প্রবিধানমালা, ২০২৫ (সংশোধিত)-এর প্রবিধান ৬৪-এর উপপ্রবিধান (৩) প্রতিস্থাপিত হবে। সে অনুযায়ী মাদরাসার সভাপতি মনোনয়নের জন্য মাদরাসাপ্রধানকে তিনজনের একটি তালিকা তৈরি করতে হবে। তালিকায় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি, খ্যাতিমান সমাজসেবক, জনপ্রতিনিধি অথবা কর্মরত কিংবা অবসরপ্রাপ্ত নবম গ্রেড বা তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার সরকারি কর্মচারীদের নাম রাখা যাবে। তালিকাটি স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডে পাঠাতে হবে। তবে সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত মাদরাসার ক্ষেত্রে মাদরাসাপ্রধান বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে শিক্ষা বোর্ডের কাছে প্রস্তাব পাঠাবেন।
চিঠিটি সব মাদরাসার অধ্যক্ষ/সুপার/প্রতিষ্ঠানপ্রধান/সভাপতি ও পরিচালনা কমিটির সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়। এর আগে ৩০ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাদরাসা শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মোস্তাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে মেয়াদোত্তীর্ণ অ্যাডহক কমিটি বাতিল করে নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠনের বিষয়ে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে অবহিত করা হয়।
এভাবে অ্যাডহক কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে ভিন্নমতের লোকদের বাদ দিয়ে পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে একটি মহল প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করতে চায় বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
এ বিষয়ে রাজধানীর তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, অ্যাডহক কমিটিতে প্রতিষ্ঠানের যথাযথ কল্যাণ হয় না। এতে শিক্ষক ও অভিভাবকদের নির্বাচিত প্রতিনিধি না আসায় তাদের কথাগুলো উঠে আসে না। একটানা অ্যাডহক কমিটিতে প্রতিষ্ঠান চললে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেবে। তাই দ্রুত নিয়মিত কমিটি গঠনের বিষয়ে উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু বলেন, দেশে এখন গণতান্ত্রিক সরকার। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি। এমন কোনো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়নি, যাতে অ্যাডহক বা বিশেষ কমিটি গঠন করা লাগবে।
তিনি বলেন, অ্যাডহক কমিটির উদ্দেশ্যই থাকে নির্বাচন দেওয়া। কিন্তু এখন বিভিন্ন অজুহাতে নির্বাচন দেওয়া হচ্ছে না। বর্তমানে স্কুলকেন্দ্রিক রাজনীতি শুরু হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি গঠনে নির্বাচনের বিকল্প নেই।