উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৯ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি
বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছয় জেলায় বন্যা এবং তিন জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আগাম পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। দুই দিন আগে চার জেলায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করা হলেও গতকাল সোমবার এই নতুন পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
বন্যা সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, আগামী ৭২ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলায় তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে এবং সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় সুরমা-কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও শেরপুর জেলায় ভুগাই-কংস ও সোমেশ্বরী নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
এবার জুনে অন্যান্য বছরের তুলনায় কম বৃষ্টি হলেও হঠাৎ এই বন্যা পরিস্থিতির জন্য ভারত থেকে আসা পানির ঢলকেই দায়ী করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পানি বিশেষজ্ঞরা।
স্থানীয় বাসিন্দা রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল হাদী আমার দেশকে বলেন, ভারতের একতরফা পানি ব্যবস্থাপনা ও পানি আগ্রাসনের কারণে তিস্তাপাড়ের মানুষ বারবার ক্ষতির মুখে পড়ছে। তিনি বলেন, শুকনো মৌসুমে যখন কৃষিকাজের জন্য পানির প্রয়োজন হয়, তখন ভারতে পানি আটকে রাখা হয়। আবার কৃষকেরা যখন ফসল ঘরে তোলার মৌসুমে থাকে এবং অতিরিক্ত পানির প্রয়োজন হয়, তখন কোনো পূর্বসতর্কতা বা সমন্বয় ছাড়াই হঠাৎ ভারতে পানি ছেড়ে দেয়।
তিনি বলেন, এবারের এই হঠাৎ বন্যায় তিস্তার পানির চাপে বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেরিতে ফলানো বোরো মৌসুমের ফলানো ধান ঘরে তোলার অপেক্ষায় থাকা পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। নষ্ট হয়েছে পাট ও অন্যান্য ফসল, ডুবে গেছে বাদামের ক্ষেত। মৌসুমের পরিশ্রম হারিয়ে কৃষকরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
তার দাবি, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে কৃষকের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। হাজার হাজার ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং তিস্তা নদীর ভাঙনে অনেক এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ সৃষ্ট এ বন্যায় গঙ্গাচড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
একই ধরনের কথা জানিয়েছেন নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর সিলেট ও সুনামগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা।
এ প্রসঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান আমার দেশকে বলেন, দেশে বৃষ্টিতে নয়, বরং উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রভাবে এবং ভারতীয় ঢলে নদ-নদীর পানি বেড়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছয় জেলায় সাময়িকভাবে বন্যা এবং আরো তিন জেলায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থা আগামী পাঁচদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
তিনি বলেন, বর্ষার শুরুতে এ ধরনের বন্যা নতুন নয়; প্রতি বছরই উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রভাবে এবং ভারতীয় ঢলে নদ-নদীর পানি বেড়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির তৈরি হয়ে থাকে। প্রাকৃতিকভাবেই বাংলাদেশ ভাটিতে অবস্থান করায় বরাবরই এ দেশের নাগরিকদের এই ভোগান্তি পোহাতে হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক আমার দেশকে বলেন, আগেই পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে এবারের বর্ষা তথা জুন-জুলাই মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। সেই সঙ্গে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকার কথা । সেদিক থেকে এ পর্যন্ত জুনে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে তাতে স্বাভাবিকের চেয়ে কমই রয়েছে। জুনের বাকি দিনগুলোয় যে খুব বেশি বৃষ্ট হবে তেমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। তবে ২৭ জুন থেকে রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে।
এছাড়া রোববার ওই তিন বিভাগে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
৯ জেলায় হঠাৎ বন্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই বৃষ্টি অভ্যন্তরীণ বৃষ্টির কারণে নয়, বরং ভারতের মেঘালয় ও আসামে যে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে সেটার কারণে উজান থেকে আসা ঢলে দেশের নদ-নদীর পানি বেড়ে এই বন্যা পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। ভারতের সঙ্গে আমাদের দেশের ৫৪ নদ-নদীর সংযোগ রয়েছে; ফলে সেখানে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি নদীতে নামছে। এতেই বয়ে আসা উজানের ঢলে আমাদের নদ-নদীর পানি বেড়ে বন্যা পরিস্থিতির তৈরি হচ্ছে।
জানা যায়, সুনামগঞ্জের নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাটবাজার, রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। তাহিরপুরের আনোয়ারপুর-সুনামগঞ্জ সড়ক ডুবে চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। মাঠিয়ান হাওরে বাড়িঘরের সামনে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে গেছে। বড়ছড়া সীমান্তে পাহাড়ি ঢলের পানি ঢুকে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। সদর উপজেলার মঙ্গলকাটা বাজারসহ কয়েকটি বাজারে পানি ঢুকে পড়েছে। খাসিয়ামারা নদীর দুকূল উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকছে।
এছাড়া সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার, তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চল এবং হাওর তীরবর্তী কয়েকটি গ্রামে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। হঠাৎ পানি বৃদ্ধিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এদিকে গতকাল সোমবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সতর্কবার্তায় বলা হয়, দেশের সব প্রধান নদ-নদীগুলো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে তিস্তা নদী ডালিয়া পয়েন্ট, কাউনিয়া ও তারাপুর স্টেশনে, সুরমা নদী ছাতক ও সুনামগঞ্জ স্টেশনে, কুশিয়ারা নদী ফেঞ্চুগঞ্জ ও মারকুলি স্টেশনে এবং সোমেশ্বরী নদী কলমাকান্দা স্টেশনে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছে।