হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

৯ হাজার জলমহাল উন্মুক্ত করার প্রস্তাব ভূমি মন্ত্রণালয়ে

বেলাল হোসেন

দেশের সরকারি জলমহাল, হাওড়-বাঁওড়, খাল-বিল ও নদী ঘিরে দীর্ঘদিনের ইজারা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে চিন্তা করছে সরকার। সারা দেশে ৯ হাজার জলাশয় উন্মুক্ত করতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণ থেকে সরকারি জলাশয় মুক্ত করে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের মাছ ধরার সুযোগ নিশ্চিত করতে যৌথভাবে কাজ করছে দুই মন্ত্রণালয়।

সরকার ঘোষিত লক্ষ্য ‘জাল যার, জলা তার’ নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে উন্মুক্ত জলাশয়ে প্রকৃত জেলেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং একইসঙ্গে প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা এর মূল উদ্দেশ্য।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সরকারি জলাশয়ে মাছ ধরা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও মৎস্যজীবীদের যেসব আইনগত ও প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়তে হয়, সেগুলো দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জলমহাল ব্যবস্থাপনায় শুধু সরকারি রাজস্ব আদায়কে প্রধান বিবেচনা না করে মৎস্য উৎপাদন, প্রকৃত জেলেদের জীবিকা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং পরিবেশ-প্রতিবেশ সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

গত জুনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সায়রাত অনুবিভাগে দেশের প্রায় ৯ হাজার জলমহাল স্থানীয় সুফলভোগীদের জন্য উন্মুক্ত করার প্রস্তাব পাঠায়। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসকদের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (সায়রাত-১) রহুল আমীন আমার দেশকে বলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জলমহাল উন্মুক্ত করার প্রস্তাব পাওয়ার পর আমরা সব জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন পাঠিয়েছি। তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে কয়েকটি জেলায় যেসব জলমহাল ইজারার সময় শেষ হয়ে গেছে, সেগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। আর যেগুলো আগামীতে শেষ হতে যাচ্ছে, সেগুলোও যাচাই-বাছাই করে স্থানীয় সুফলভোগীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সরকারি জলমহাল মূলত দুই ধরনের। এর একটি প্রাকৃতিক জলমহাল—বিল, নদী, খাল, হাওড়-বাঁওড়। এসব জলমহালের মালিকানা মূলত ভূমি মন্ত্রণালয়ের এবং মাঠ পর্যায়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এগুলো পরিচালনা করে। অন্যটি কৃত্রিম সরকারি জলমহাল—পুকুর, দিঘি, বরোপিট, খাল ও হ্রদ। এসব জলাশয়ের মালিকানা ভূমি, পানিসম্পদ, সড়ক ও জনপথ এবং রেল মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে রয়েছে।

ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি জলমহালকে আয়তনের ভিত্তিতে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। ২০ একর এবং তার বেশি আয়তনের জলমহাল পৃথকভাবে পরিচালনা ও ইজারা দেওয়া হয়। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে সরকারি জলমহালের সংখ্যা ছিল ৩৯ হাজার ১৯০টি। এর মধ্যে ২০ একর পর্যন্ত জলমহাল ৩৬ হাজার ৮০৬টি এবং ২০ একরের বেশি আয়তনের জলমহাল ২,৩৮৪টি।

ওই অর্থবছরে ১৫ হাজার ৪২০টি সরকারি জলমহাল ইজারা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২০ একর পর্যন্ত জলমহাল ছিল ১৩ হাজার ৮৫৬টি এবং ২০ একরের বেশি আয়তনের জলমহাল ১,৫৬৪টি। ২০ একর পর্যন্ত জলমহাল উপজেলা প্রশাসন এবং ২০ একরের বেশি আয়তনের জলমহাল জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত ও ইজারা দেওয়া হয়।

তবে বিভিন্ন মামলাজনিত কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জলমহাল ইজারামুক্তও রয়েছে। সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করেই এসব জলমহাল ইজারা দেওয়া হয় বলে ভূমি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। মূলত মাছ চাষসহ জনস্বার্থে সরকারি জলমহাল ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে রাজস্ব আদায় ইজারা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বিবেচনায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ মৎস্যজীবীদের।

সরকারি হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জলমহাল ইজারা দিয়ে সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে প্রায় ১৩০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ, জলমহাল সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজস্বের উৎস। কিন্তু মৎস্যজীবী নেতাদের প্রশ্ন—রাজস্ব আদায়কে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে যদি প্রকৃত জেলেরা জলাশয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন কমে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র ও জনগণ উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

মৎস্যজীবী-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি প্রাকৃতিক জলমহালের মালিকানা ভূমি মন্ত্রণালয়ের হলেও এসব জলাশয়ের মাছ ও জলজসম্পদ সংরক্ষণ এবং মৎস্যজীবীদের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের। ফলে জলমহাল ব্যবস্থাপনায় দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি জলমহালের জন্য নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। এ সময় ‘সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতি, ২০০৯’ হালনাগাদ করার বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা ও মতামত নেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে প্রণীত সরকারি আইনের খসড়ায় জলমহালের দখল ও দূষণ প্রতিরোধ, প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার রক্ষার বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন আইন কার্যকর হলে জলমহাল ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু আইন বা নীতিমালা পরিবর্তন করলেই প্রকৃত জেলেদের অধিকার নিশ্চিত হবে না। স্থানীয় পর্যায়ে ইজারা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রকৃত মৎস্যজীবী শনাক্তকরণ, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং জলমহালের অবৈধ দখল ও দূষণ প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু সম্প্রতি বলেছেন, ‘জাল যার, জলা তার’ নীতি বাস্তবায়নে সরকার নিরলস কাজ করছে। দেশের উন্মুক্ত জলাশয়গুলোতে যাতে প্রকৃত জেলেরা সহজে মাছ আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

জলাশয় ও নদী-খাল সংস্কার প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে খাল খনন কর্মসূচি প্রথম শুরু করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নদী-খাল খনন, জলাশয় সংরক্ষণ ও নাব্য রক্ষায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নদী ও খাল খননের ফলে জলাবদ্ধতা নিরসন, জলাশয় সংরক্ষণ এবং মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য জলাশয়গুলোকে প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত ও উন্মুক্ত রাখা, যাতে প্রান্তিক ও প্রকৃত জেলেরা কোনো বাধা ছাড়াই মাছ আহরণ করতে পারেন এবং তাদের অধিকার ও জীবিকা নিশ্চিত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলমহাল ব্যবস্থাপনায় উভয় মন্ত্রণালয়ের সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন করা হলে দীর্ঘদিনের ইজারানির্ভর ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে ‘জাল যার, জলা তার’ নীতির বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে মাঠ পর্যায়ে এর কতটা কঠোর ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন হয়, তার ওপর। প্রকৃত জেলেদের হাতে জলাশয় ফিরিয়ে দিয়ে প্রভাবশালীদের দখলদারিত্ব খর্ব করা হলে সরকারি জলমহাল শুধু রাজস্বের উৎসই নয়, গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

থাইল্যান্ড বন্দরে মার্কিন রণতরি ‘আব্রাহাম লিংকন’

ইরানের বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানাল বাহরাইন

হৃদরোগ ও দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের চিকিৎসা

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিএনপি কাজ করছে

নারীস্বাস্থ্যে ঋতু বদলের প্রভাব

ব্রিটেনে দুই দিনের সফরে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট

যমুনা নদীতে নিখোঁজ ভারতীয় সেনা

ধুনটে ডিবি পরিচয়ে শিক্ষকের কাছে চাঁদা দাবি

অল্প জ্বরেই হাসপাতালে আসছেন ডেঙ্গু রোগী

মিসরে শি জিনপিং ও আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি’র বৈঠক আজ