প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের তদবির উপেক্ষা করায় পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরীকে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিসিএস ২৫ ব্যাচের এ যুগ্ম সচিবকে গত মঙ্গলবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়।
বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ এ বদলিকে নিয়মিত প্রশাসনিক রদবদল বলে দাবি করলেও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ভিন্ন তথ্য জানিয়েছে। সূত্রগুলোর দাবি, প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর তার পছন্দের প্রার্থী জহিরুল ইসলামকে পিয়ন পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে তদবির করেন। তবে প্রক্সি পরীক্ষা ও জালিয়াতির অভিযোগে জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন ডিসি।
অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। এ ঘটনায় প্রতিমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে অভিযোগ করেন এবং এর পরই ডিসিকে পটুয়াখালী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। এ নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মচারী নিয়োগে প্রতিমন্ত্রী নুরের অযাচিত হস্তক্ষেপে প্রশাসনেও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালী সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের ব্যক্তিগত সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটর রাকিবুল ইসলাম।
মামলার এজাহারে বলা হয়, পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা রাজস্ব প্রশাসনে অফিস সহায়কের (পিয়ন) ১০টি শূন্য পদে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা ২৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা চলাকালে জহিরুল ইসলাম নামে এক চাকরি প্রার্থীকে ডাকা হয় (তিনি লিখিত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পান)। পরীক্ষা বোর্ডের সদস্যরা তাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করলে তিনি জবাব দিতে ব্যর্থ হন। বোর্ড সদস্যরা অতি সাধারণ কয়েকটি প্রশ্ন করলেও জহির জবাব দিতে না পারায় সন্দেহ তৈরি হয়। তখন তার লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন ও হাতের লেখা যাচাইকালে ভিন্নতা দেখা যায়।
ভাইভা বোর্ডের জিজ্ঞাসাবাদে জহিরুল ইসলাম প্রক্সি পরীক্ষার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি জানান, গত ২৫ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত পটুয়াখালী সরকারি কলেজের বাণিজ্য ভবনে অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় তার পরিবর্তে সাখাওয়াত নামে এক ব্যক্তি অংশ নেন।
জহিরুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্বচুক্তি অনুযায়ী সাখাওয়াত তার নাম ও প্রবেশপত্র ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তাকে উত্তীর্ণ করেন। বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর ভাইভা বোর্ডের সদস্যরা পুলিশকে অবহিত করেন। পরে পুলিশ জহিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মচারী আমার দেশকে বলেন, জহির প্রতিমন্ত্রীর পছন্দের প্রার্থী ছিলেন। তাকে চাকরি দিতে তদবির করেন প্রতিমন্ত্রী নুর। কিন্তু ডিসি তাকে নিয়োগ না দিয়ে উল্টো পুলিশের হাতে সোপর্দ করায় ক্ষুব্ধ হন প্রতিমন্ত্রী। পরে তিনি ডিসির বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন।
তদবির না শোনায় জেলা প্রশাসককে বদলি করার বিষয়ে জানতে চাইলে নুরুল হক নুর আমার দেশকে বলেন, ডিসির আচরণগত সমস্যা রয়েছে। তিনি সিনিয়রদের সম্মান করেন না। আমি একজন প্রতিমন্ত্রী। আমি এলাকায় গেলে তিনি আমার অনুষ্ঠানে যোগ দেন না। অথচ জেলা পুলিশ সুপার আমার এখানে আসেন, অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
তিনি আরো বলেন, কয়েকদিন আগে আমি সরকারি সফরে পটুয়াখালী গেলে তিনি (ডিসি) একটি সেমিনারে যোগ দেওয়ার নাম করে কুয়াকাটা চলে যান। অথচ ওই অনুষ্ঠানটি সরকারি কোনো অনুষ্ঠান ছিল না। আমি ডিসির অসদাচরণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তারা ব্যবস্থা নিয়েছেন। পিয়ন নিয়োগের তদবিরের যে অভিযোগ উঠেছে, সেটা সঠিক নয়।
প্রতিমন্ত্রীর রোষানলে পড়ে ডিসিকে বদলি করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ আমার দেশকে বলেন, ডিসির পদোন্নতি হয়েছে। তার বদলি জনপ্রশাসনের রুটিন ওয়ার্ক। সেখানে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের কোনো হাত আছে কি না সেটা আমার জানা নেই।
২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালীতে জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান বিসিএস ২৫ ব্যাচের কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী। সম্প্রতি তিনি যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান। উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
প্রক্সি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া একজন চাকরিপ্রার্থীকে চাকরি দেওয়ার জন্য প্রতিমন্ত্রীর তদবির না শোনায় জেলা প্রশাসককে বদলির বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, একই দিন যেহেতু কয়েকজন জেলা প্রশাসককে বদলি করা হয়েছে, আপাতদৃশ্যে মনে হচ্ছে এটা প্রশাসনিক রুটিন ওয়ার্ক। কিন্তু পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসকের ক্ষেত্রে যেহেতু একজন জনপ্রতিনিধি বা প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনৈতিক চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, তাই এটা অগ্রহণযোগ্য।
তিনি আরো বলেন, প্রক্সি পরীক্ষার মতো প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া কোনো প্রার্থীর পক্ষে একজন জনপ্রতিনিধির চাকরির সুপারিশ করা সম্পূর্ণ অনৈতিক। একইসঙ্গে তা প্রতারণা-সহায়ক ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দৃষ্টান্ত।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিশেষ করে সেই প্রার্থীর বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে যদি একজন সরকারি কর্মকর্তাকে স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বাইরে বাস্তবে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়ে থাকে, তাহলে তা সরকারের ৩১-দফা ও নির্বাচনি অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।