* দেড় বছরে ২০ হাজারের বেশি অভিযোগ
* লাগেজ গায়েব, কাটা ও ভাঙা নিত্যদিনের ঘটনা
* ট্রলির জন্য কাড়াকাড়ি লেগেই থাকে
ব্যবসায়ী নাঈমুল ইসলাম দেশে ফিরছিলেন চীন থেকে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার চোখে ধরা পড়ে যাত্রী হয়রানির নিষ্ঠুর চিত্র। মধ্যপ্রাচ্য ফেরত এক যাত্রীর আনা স্বর্ণের বার মাপা হচ্ছিল সবজি মাপার পাল্লায়। যাত্রীর ক্রয়রশিদের সঙ্গে কাস্টমসের পাল্লার রিডিংয়ে কয়েক গ্রামের পার্থক্য। এটিকে মওকা হিসেবে নিয়ে পুরো স্বর্ণের বারটিই বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করেন কর্মকর্তা।
যাত্রীর অসহায়ত্ব দেখে বিবেকের তাড়নায় মৃদু আপত্তি তোলেন নাঈমুল। সঙ্গে সঙ্গেই দেখতে পান কর্মকর্তার রুদ্র মূর্তি। তল্লাশির নির্দেশ দেওয়া হয় নাঈমুলের লাগেজ। অনেক খোঁজাখুঁজির পর ব্যবহার্য কাপড়-চোপড়ের ফাঁকে মেলে ফোল্ডিং করা ছোট একটি ওয়াটার স্টোরেজ ব্যাগ। এটি তিনি অনেক কষ্টে ডিজাইন করিয়ে এনেছেন সিটি করপোরেশনকে স্যাম্পল হিসেবে দেখানোর জন্য। সঙ্গে সঙ্গেই সক্রিয় হয়ে উঠলেন বিমানবন্দরে কর্মরত কাস্টমস, এনএসআই ও এসবিসহ সব সংস্থার কর্মকর্তারা। বলা হয়, আমদানির জন্য অনুমোদিত পণ্যের তালিকায় এটি নেই। শুরু হলো হয়রানি, মামলা, জরিমানা আরো কত কি।
কষ্টদায়ক এ অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে নাঈমুল আমার দেশকে বলেন, ‘অন্য যাত্রীর সঙ্গে করা অস্বাভাবিক এবং হয়রানিমূলক আচরণের সামান্য প্রতিবাদ করায় আমার ওপর নেমে আসে চরম বিপর্যয়। ১৯৬৯ সালের কাস্টমস অ্যাক্ট, ১৯৫০ সালের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট অ্যাক্ট এবং ১৯৪৭ সালের বৈদেশিক মুদ্রা আইনে তারা আমাকে দোষী সাব্যস্ত করে ৩৬ হাজার টাকা জরিমানা করে। আমার ব্যবহার্য সামগ্রী, স্যাম্পল হিসেবে আনা ওয়াটার স্টোরেজ ব্যাগসহ ৪০ হাজার টাকা দামের লাগেজটি আটকে রাখে। পরবর্তী কর্মদিবসে জরিমানার টাকা ব্যাংকে জমা দিলেও আজ পর্যন্ত আমার মালামালসহ লাগেজটি ফেরত পাইনি।’
সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ট্রলি সংকট ও অব্যবস্থাপনা, অপেক্ষমাণ যাত্রীদের বসার জায়গার সংকট, লাগেজ পেতে বিলম্ব, লাগেজ গায়েব হয়ে যাওয়া, লাগেজ কেটে মালামাল চুরি, লাগেজ ভেঙে ফেলা, লাগেজ বুকিংকালে ওজন ও মালামাল নিয়ে হয়রানি, কথায় কথায় ফ্লাইট বিলম্ব, ইমিগ্রেশনকালে অযাচিত জিজ্ঞাসাবাদ, শরীর তল্লাশির নামে হয়রানিসহ নানা অনিয়মের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘এতকিছুর পরও আমরা যারা বাধ্য হয়ে এ বিমানবন্দর ব্যবহার করি, তারা তো অসহায়। বিদেশি বায়াররা তো একবার এলে দ্বিতীয়বার এ বিমানবন্দর ব্যবহার করতে রাজি হতে চান না।’
কেবল নাঈমুল নন, শাহজালাল বিমানবন্দর ব্যবহারকারী প্রতিটি যাত্রীই যাতায়াতের পথে নিজেদের অসহায় মনে করেন। সিভিল অ্যাভিয়েশন, নিরাপত্তাকর্মী, আনসার বাহিনী, বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা এবং এয়ারলাইনসের ডিউটি অফিসারদের কাছে যাত্রীরা পুরো জিম্মি। একটি ট্রলি পাওয়ার জন্য রীতিমতো যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয় যাত্রীদের। এ নিয়ে তর্কবিতর্ক, ঝগড়া, মারামারি লেগেই আছে।
হয়রানির ভয়ে অনেক যাত্রী লাগেজ ভেঙে গেলে বা হারানো গেলে বেশিরভাগ সময় অভিযোগই করেন না। সিভিল অ্যাভিয়েশন বা অন্য সংস্থার কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে সংশ্লিষ্ট যাত্রীর কপালে জোটে হয়রানি, অপমান কিংবা মারধর।
গত সপ্তাহে ৩৮ জন সংসদ সদস্য এবং তাদের পরিবারের শতাধিক সদস্যের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনার বিষয়টি পুনরায় সামনে আসে।
‘হয়রানির ভয়ে লাগেজ আনি না’
ব্যবসায়িক কারণে মাসে অন্তত দুবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঢাকায় আসেন একজন দ্বৈত নাগরিক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি আমার দেশকে বলেন, ‘হয়রানির ভয়ে আমি কখনো লাগেজ আনি না। একটা হ্যান্ড ব্যাগ নিয়ে যাতায়াত করি।’
তাতেও ভোগান্তির শেষ নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যেভাবে চলছে, বিমানবন্দরও একইভাবে চলছে। যে যেখানে যতটুকু দায়িত্ব পাচ্ছে, সেটাকে সে ক্ষমতা হিসেবে নিচ্ছে। যাত্রীদের ওপর সাধ্যের সবটুকু ক্ষমতা দেখিয়ে হয়রানি করছে।’
তার মতে, পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে চাইলে উপযুক্ত লোকবল দিয়ে এবং তাদের প্রয়োজনীয় মোটিভেশন দিয়ে সেবক হওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি মনিটরিং বৃদ্ধি করা, বড় কর্মকর্তাদের ঝটিকা সফর বাড়ানো এবং অপকর্মের জন্য শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও হতে পারে।
টাকা দিয়েও সেবা মিলছে না
শাহজালাল বিমানবন্দর ব্যবহারকারী প্রতিটি এয়ারলাইনসের যাত্রীদের চেকইন কাউন্টার সামলানো, বোর্ডিং, উড়োজাহাজে মালামাল ওঠানো-নামানো, যাত্রীসেবা, প্রকৌশল সেবা ও গ্রাউন্ড সার্ভিস ইকুইপমেন্ট (জিএসই) সেবার দায়িত্বে রয়েছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
এসব সেবার বিপরীতে প্রতিটি এয়ারলাইনস বিমানকে নির্দিষ্ট হারে ফি দিয়ে থাকে । কিন্তু সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতি, অনিয়ম, অবহেলা এবং বিমানের পর্যাপ্ত জনবলের ঘাটতি ছাড়াও যন্ত্রপাতি ও তদারকির অভাবে সেবামূলক এসব কার্যক্রম মারাত্মক বিঘ্নিত হচ্ছে। টাকা পরিশোধ করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো বিমানের ওপর মারাত্মক অসন্তুষ্ট।
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে দেশের প্রবেশদ্বার উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, একজন প্রবাসীকে যখন বছরের পর বছর বিদেশে শ্রম দিয়ে দেশে ফেরার সময় বিমানবন্দরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগেজের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, তখন তার দুঃখের শেষ থাকে না। তিনি যদি প্রয়োজনীয় তথ্য না পেয়ে কিংবা প্রত্যাশিত সেবার ছিটেফোঁটাও না পেয়ে অসহায় বোধ করেন, সেটি তখন একটি দেশের জাতীয় অসাড়তারই প্রমাণ বহন করে।
একইভাবে একজন বিদেশি যাত্রী, বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী কিংবা পর্যটক যখন বাংলাদেশে আসেন, তখন বিমানবন্দরে তার প্রথম অভিজ্ঞতাই দেশের সামগ্রিক প্রশাসনিক সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে পারে। বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এটি দেশের ভাবমূর্তি, অর্থনীতি ও নাগরিক আস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
ফ্যাসিবাদীদের অপতৎপরতা
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কনটেইনার নিয়ে নয়ছয়, ব্যাগেজ চুরি, আন্তর্জাতিক অ্যাভিয়েশন নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনসহ চরম অনিয়ম, অব্যবস্থাপনায় চলছে বিমানের দেশি-বিদেশি স্টেশনগুলো। ফ্যাসিবাদী আমলে নিযুক্ত কর্মীরা দেশ ও বিমানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে তৎপর। গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদেই বসে আছেন ফ্যাসিবাদী আমলে নিয়াগ পাওয়া কর্মকর্তারা।
অভিযোগের পর অভিযোগ সত্ত্বেও থামছে না অযোগ্যদের দাপট। তারই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি মদিনা স্টেশনের ম্যানেজারের কাছ থেকে ঢাকায় কনটেইনার নম্বর ও প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ায় ওমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি নিয়ে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়।
জনবল-সরঞ্জাম সংকট
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রতিদিন ২৭টি এয়ারলাইনসের ১১০-১১৫টি ফ্লাইট ওঠানামা করে। এসব ফ্লাইটে যাতায়াত করেন প্রায় ২০ হাজার যাত্রী। হাইলোডার, ট্রান্সপোর্টার, ডলি, ট্রলি, টোয়িং ট্রাক্টর, হুইলচেয়ারসহ ১৮ ধরনের দুই শতাধিক যন্ত্রপাতি আছে এ স্টেশনে। বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবায় প্রায় ১,২০০ জন কাজ করছেন।
বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও এয়ারলাইনসকে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার জন্য বিমানের এ জনবল ও সরঞ্জাম পর্যাপ্ত নয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত আগমনী টার্মিনালে যাত্রীর চাপ বেশি থাকে। এ সময় বোর্ডিং ব্রিজ এলাকা ও কাস্টমসে যাত্রীর চাপ পড়ে। আর সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বহির্গমনে যাত্রীর চাপ থাকে। এ সময় চেকইন কাউন্টার ও ইমিগ্রেশনে চাপ বেশি থাকে। একসঙ্গে তিনটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট এসে নামলে যাত্রীসেবা এলোমেলো হয়ে পড়ে। বোর্ডিং ব্রিজে জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকট থাকায় কখনো কখনো উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামাতে কখনো কখনো দুই ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়।
এওসির অভিযোগ
বিমানবন্দরের সেবা কার্যক্রমে অসন্তোষ প্রকাশ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাহজালালে ফ্লাইট পরিচালনাকারী ২৭টি উড়োজাহাজ সংস্থার সংগঠন এয়ারলাইনস অপারেটরস কমিটির (এওসি) একজন কর্মকর্তা জানান, শাহজালাল বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাপনা ঠিকভাবে সামাল দিতে পারছে না বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
ফ্লাইট ব্যবস্থাপনার জন্য এয়ারলাইনসগুলো বিমানকে প্রতি ফ্লাইটে ২২০০-৫৭০০ ডলার দিয়ে থাকে জানিয়ে তিনি বলেন, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কারণে প্রায়ই আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো ছাড়তে দেরি হয়। এমনকি বিমানবন্দরের বে-এরিয়ায় উড়োজাহাজগুলোকে প্রায় অপেক্ষা করতে হয়। কখনো তা এক থেকে দুই ঘণ্টাও ছাড়ায়। বিমান থেকে ব্যাগেজ নামানোর জন্য প্রয়োজনীয় হাইলোডার সরবরাহ না করায় অনেক সময় যাত্রীদের ব্যাগ বুঝে পেতে দুই ঘণ্টাও লেগে যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিশ্বসেরা ১০০-তে নেই শাহজালাল
যুক্তরাজ্যভিত্তিক জরিপ সংস্থা স্কাইট্র্যাক্সের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বসেরা ১০০ বিমানবন্দরের তালিকায় স্থান পায়নি শাহজালাল বিমানবন্দর। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ১০টি বিমানবন্দরের তালিকাতেও জায়গা হয়নি এটির।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলা জরিপে ১০০টির বেশি দেশের যাত্রী অংশ নেন। মূল্যায়ন করা হয় ৫৭৫টির বেশি বিমানবন্দর। চেকইন, আগমন, ট্রানজিট, কেনাকাটা, নিরাপত্তা তল্লাশি ও ইমিগ্রেশন থেকে শুরু করে বোর্ডিং গেট পর্যন্ত পুরো যাত্রা নিয়ে যাত্রীদের মত নেওয়া হয়। গত ১৮ মার্চ লন্ডনে এ ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এতে টানা ১৪তম বারের মতো এবারও বিশ্বের সেরা বিমানবন্দর হয়েছে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর। দ্বিতীয় দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচন, তৃতীয় জাপানের টোকিও হানেদা। সেরা পাঁচের সবকটি এশিয়ার।
শম্বুকগতির বিমানবন্দর
ভ্রমণবিষয়ক ওয়েবসাইট ট্রিপ অ্যাডভাইজারে যাত্রীদের পর্যালোচনাতেও সমস্যার ছাপ স্পষ্ট। শাহজালালের বর্ণনা দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের বাসিন্দা মাইকেল এল ফ্লেমিং ২০২৫ সালে লিখেছেন, বিমানবন্দরটি ছোট ও ভিড়ে ঠাসা।
তার মতে, এখানে সবকিছু চলে শম্বুকগতিতে। শুল্কমুক্ত কেনাকাটার সুযোগও সামান্য। গত বছরের ডিসেম্বরে আরেক যাত্রী লিখেছেন, ইমিগ্রেশনের সারি এগোচ্ছিল খুব ধীরে, লাগেজ পেতে লেগেছে প্রায় দুই ঘণ্টা। যাত্রী সহায়তা বলতে কিছু পাননি, ওয়াইফাই কাজ করেনি, বাইরে বেরিয়ে ট্যাক্সি পেতেও ভোগান্তি। পুরো অভিজ্ঞতাকে তিনি ভয়ংকর ও আতঙ্কজনক বলে বর্ণনা করেন।
২০ হাজার অভিযোগ
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৮ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় দেড় বছরে হটলাইন ও ওয়েবসাইটে ২০ হাজারের বেশি অভিযোগ ও জিজ্ঞাসা জমা পড়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৩০ শতাংশ হারানো জিনিস খোঁজার শাখা লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড সংক্রান্ত। সে হিসাবে সংখ্যাটা দাঁড়ায় প্রায় ছয় হাজারে।
ইতিপূর্বে প্রকাশিত অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে ১২০ জন যাত্রী লাগেজ ছাড়াই বিমানবন্দর ছাড়েন। কর্তৃপক্ষের দাবি, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মোট অভিযোগ ও জিজ্ঞাসার ৯৯ দশমিক ৬৪ শতাংশের সমাধান হয়েছে। যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, হারিয়ে যাওয়া মানেই চুরি নয়। তবে লাগেজ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা যে দীর্ঘদিনের, এ তথ্য তা মনে করিয়ে দেয়।
বের হতেই ডাকাতের মুখোমুখি
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পরপরই বহু যাত্রী ডাকাতি ও অপহরণের শিকার হন। সৌদি আরব থেকে ফিরে বিমানবন্দর গোলচত্বরের কাছে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন প্রবাসি ইমরুল কায়েস। হঠাৎ অস্ত্র ঠেকিয়ে কেড়ে নেওয়া হয় তার লাগেজ, হাতব্যাগ, সোনার গয়না ও নগদ টাকা। আরেক ঘটনায় দুবাইফেরত ফারুক হাসানকে বিমানবন্দর এলাকা থেকে অপহরণ করে লাগেজ ও পাসপোর্ট লুটের অভিযোগ ওঠে। জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের সদস্যরা এক বছরে বিমানবন্দর এলাকায় ৫০-৬০টি ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণ করে মালামাল লুটের তথ্য দিয়েছে। অথচ মামলা হয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি।
ভরসা থার্ড টার্মিনাল
শাহজালাল বিমানবন্দরের সার্বিক অব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলার জন্য নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঊর্ধতন কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, শাহাজালাল বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, এপিবিএন, এনএসআই ও ডিজিএফআইসহ প্রায় ২৬টি ভিন্ন ভিন্ন সংস্থা কাজ করে। এদের প্রত্যেকের নিজস্ব সংস্থা বা বাহিনী থাকলেও তারা বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের কাছে দায়বদ্ধ নয়। ফলে বিমানবন্দরে কোনো অব্যবস্থাপনা বা অনিয়ম দেখা দিলে এয়ারপোর্ট অথরিটির পক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় না।
শাহজালালকে সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রীর চাপ নিতে হয় দাবি করে তিনি বলেন, থার্ড টার্মিনাল চালু হয়ে গেলে এই দুরবস্থা আর থাকবে না।
যাত্রীসেবা নিশ্চিতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ
বিমানবন্দরের সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি করতে সরকার বদ্ধপরিকর উল্লেখ করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত গতকাল গণমাধ্যমকে বলেন, এগুলো নিরসনের জন্য সরকারকে সময় দিতে হবে। যেহেতু দীর্ঘদিন এ প্রবণতাটা চলে আসছিল। আমাদের যারা কাজ করে, তারা অলস হয়ে গিয়েছিল। অনেকে দলীয়ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছে। তারা কাজ করতে পারে না।
লাগেজ কাটার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন মনে হয়, এটা হচ্ছে না। অতীতে দু-একটি ঘটনা যদি ঘটে থাকে, সেগুলো অ্যাড্রেস করব।
সাম্প্রতিক সময়ে যাত্রী হয়রানিসহ যেসব অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে, তা সত্য নয় দাবি করে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বিমানবন্দরে ট্রলি সংকট নেই এবং যাত্রী হয়রানিও নেই। লক্ষ্য অর্জনে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতকে আরো আধুনিক, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।