হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

বন্ধের শঙ্কায় লাখো মানুষের ভরসার স্বাস্থ্য বাতায়ন

গোলাম মোস্তফা

হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মাঝরাতে চিকিৎসকের পরামর্শ দরকার? পরিচিত কোনো চিকিৎসককে পাওয়া যাচ্ছে না? এমন সংকটে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা লাখো মানুষের ভরসা টেলি-স্বাস্থ্যসেবা ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩’। সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসক ও হাসপাতাল-সংক্রান্ত তথ্য, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে গত এক দশকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে লাখো লাখো মানুষকে সেবা দিয়েছে এ হেল্পলাইন।

বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময়, যখন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সরাসরি চিকিৎসাসেবা নেওয়া অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখন ঘরে বসেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সেবা পাওয়ার অন্যতম নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হয়ে ওঠে এ প্রতিষ্ঠান।

টানা ২২ মাস ধরে এ প্রতিষ্ঠানটির চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন বন্ধ রয়েছে। আর দীর্ঘদিন ধরে এ প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়ন বন্ধ থাকায় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে একসময় লাখো মানুষের নির্ভরতার প্রতীক হয়ে ওঠা এ সেবাটি। ফলে এর প্রভাব পড়েছে সেবার মান ও কার্যক্রমে। অনেক সেবাগ্রহীতা ফোন করেও চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও মিলছে না সাড়া আর সম্পূর্ণ বিনামূল্যের এ সেবা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়া এবং বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে সেবা অব্যাহত রাখতে মন্ত্রণালয়কে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) ই-হেলথ কার্যপরিকল্পনার অধীনে ২০১৫ সালে এ সেবা কার্যক্রম চালু হয়। চুক্তির মাধ্যমে এ সেবা পরিচালনার দায়িত্ব পায় সিনেসিস আইটি লিমিটেড নামের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। গত ৩০ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সরকারের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে, কিন্তু এখনো নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়নি।

সরকারের কাছ থেকে অর্থ না পাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে জনবল প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সেবার মানের ওপর। এর ফলে প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকার অসংখ্য মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপরামর্শ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অর্থায়নের সংকট, চুক্তি নবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রশাসনিক জটিলতায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ জনস্বাস্থ্য সেবার ভবিষ্যৎ এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এক বছরের জন্য মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ছয় মাস মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়। এ প্রস্তাবটি বর্তমানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

কী সেবা এবং কীভাবে পাওয়া যায়

‘সুস্থ দেহ, প্রশান্ত মন, পাশে আছে স্বাস্থ্য বাতায়ন’ এ স্লোগানে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—সরাসরি ডাক্তারের পরামর্শ, তথ্য, ফোন নম্বর, সাধারণ রোগের চিকিৎসা, কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক দিকনির্দেশনা এবং প্রয়োজনীয় রেফারেন্স সেবা। এছাড়া অ্যাম্বুলেন্স সেবা, রক্তের তথ্য এবং দুর্ঘটনাজনিত জরুরি স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয় নির্দেশনার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা বা হাসপাতালবিষয়ক কোনো অভিযোগ কিংবা অভিযোগের ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে হেল্পলাইনের মাধ্যমে জানা যায়।

এ হেল্পলাইনে আসা প্রতিটি কল স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড করা হয় এবং রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ই-প্রেসক্রিপশন মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে পাঠানো হয়। প্রয়োজন হলে ভিডিও কলের মাধ্যমে চিকিৎসক সরাসরি পরামর্শ দেন। স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ থেকে প্রদত্ত সব সেবার তথ্য নিয়মিতভাবে সরকারের কাছে প্রতিবেদন আকারে জমা দেওয়া হয়, যা দৈনিক ছাড়াও মাসিক, ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়। এতে ফোন করতে মোবাইল ফোনের স্বাভাবিক বিলের অতিরিক্ত বিল হয় না। প্রায় ১০০ জন এমবিবিএস চিকিৎসক এবং ২৫ জন স্বাস্থ্য তথ্যকর্মকর্তা পালাক্রমে এ সেবা প্রদান করতেন।

পরিসংখ্যান

চালু হওয়ার পর থেকে চলতি বছরের ২৯ জুন সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিতে মোট দুই কোটি ৮১ লাখ ৭৬ হাজার ৭৩৬টি কল এসেছে। এর মধ্যে চলতি বছরে ১০ লাখ ৭৪ অহাজারের বেশি কল আসে। এর আগের বছর ২০২৫ সালে ২৩ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি, ২০২৪ সালে ১৯ লাখ ৪২ হাজারের বেশি এবং করোনাকালে ২০১৯ সালে এক কোটি ৯ লাখের বেশি মানুষ ফোন করে এখান থেকে সেবা নেয়। প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার কল আসে এ হেল্পলাইনে। তবে জনবল কমে যাওয়ার কারণে বর্তমানে দিনে মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার কলের উত্তর দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে বিপুলসংখ্যক কল অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে, যার কারণে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাজারো মানুষ।

সিনেসিস আইটির বক্তব্য

মূলত স্বাস্থ্য বাতায়নের অর্থায়ন হতো স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতের চতুর্থ কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) আওতায়। কর্মসূচির মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত। পরে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মার্চে প্রস্তাবিত পঞ্চম কর্মসূচি বাতিল করে দেয়। তারপর থেকেই চরম অর্থসংকটে পড়ে এ সেবা প্রতিষ্ঠানটি। যদিও চতুর্থ এইচপিএনএসপির অসমাপ্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করতে গত বছরের ডিসেম্বরে একটি পৃথক প্রকল্প অনুমোদন দেয় সরকার। সেখানে স্বাস্থ্য বাতায়নকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং চলতি মাসের শুরুতে প্রকল্পে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হয়নি। যার ফলে প্রতিষ্ঠানটি টানা ২২ মাস ধরে কোনো অর্থ পাচ্ছেন না এবং এপ্রিলের পর তাদের জনবল প্রায় ৫০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে সিনেসিস আইটি প্রতিষ্ঠানটি।

এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহরাব আহমেদ চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, আমাদের এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার জন্য কল করে। এমনকি মহামারি করোনার সময়েও আমরা কোটি কোটি মানুষকে সেবা দিয়েছি। এখন সরকারের সঙ্গে আমাদের প্রতিষ্ঠানটির চুক্তির মেয়াদ শেষ। কিন্তু তার আগে থেকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়ে একাধিকবার জানিয়েছি। তারা সব সময় ইতিবাচক এবং আমাদের আশ্বাস দিয়েছে। এর মধ্যে চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়ে যায়, যা এখনো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পায়নি।

তিনি বলেন, নতুন চুক্তির জন্য দরপত্রের পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে সাধারণত আট থেকে ১০ মাস সময় লাগে। তাই নতুন চুক্তির মেয়াদ ছয় মাস বৃদ্ধি যথেষ্ট না। কারণ এরই মধ্যে প্রায় দুই মাস পার হয়ে গেছে। এখন অনুমোদন মিললেও বাস্তবে সর্বোচ্চ চার মাস সেবা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এরপর আবারও সেবা কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা বা শূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

সোহরাব আহমেদ বলেন, প্রায় ২২ মাস ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অর্থছাড় দিচ্ছে না। তবুও আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। ব্যাংক লোনসহ বিভিন্নভাবে ঋণ করে চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের স্যালারি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এভাবে কতদিন এ সেবা চালিয়ে যেতে পারব জানি না। আর এমনটি চলতে থাকলে আমাদের পক্ষে এ সেবা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

অধিদপ্তরের বক্তব্য

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস পরিচালক আবু আহাম্মদ আল মামুন আমার দেশকে বলেন, স্বাস্থ্য বাতায়নের বিষয়টি আমরা জানি। যেহেতু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাই চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং তা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছিল, কিন্তু বরাদ্দ আসেনি, তাই টাকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। শুধু এ গুরুত্বপূর্ণ সেবাটি নয়, এমন অনেক প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়া যায়নি। এখন নতুন অর্থবছর আসছে, আশা করছি বরাদ্দ এলে তা থেকে পরিশোধ করা যাবে।

হাসিনার সাজা বাড়ানোর শুনানি ঝুলে আছে আপিলে

সীমান্তে বিজিবির অপ্রতুল সরবরাহ, ওপারে প্রযুক্তিনির্ভর বিএসএফ

ঢাবিতে ছদ্মবেশে সক্রিয় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ

কাজ পেতে বিশ্বখ্যাত পাঁচ অপারেটরের প্রতিযোগিতা

দুই হাজার টাকার জন্য জোড়া খুন, এখন শুধুই হাহাকার

বেনজীরকে ফেরানো নিয়ে অনিশ্চয়তা

গণভোটের রায় বাস্তবায়নে চাপ বাড়াতে চায় ১১ দলীয় ঐক্য

দুর্যোগে ত্রাণ পৌঁছাতে তেজগাঁও বিমানবন্দরে হবে লজিস্টিক হাব

কেঁদে কেঁদে দিন কাটে রামিসা হত্যায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত স্বপ্নার

ধর্ষণের ঘটনা বারবার বলতে হয় ভিকটিমদের