হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

সাবমেরিন ক্যাবল আওয়ামী সিন্ডিকেটের দখলে

আবু সুফিয়ান

আমার দেশ গ্রাফিক্স

ডিজিটাল নিরাপত্তার সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও কৌশলগত খাত সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া শেখ হাসিনার আমলে পরিণত হয়েছিল রাজনৈতিক লুটপাটের ক্ষেত্রে। ২০২০ সালের অক্টোবরে বিটিআরসিতে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সভায় তৎকালীন তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সরাসরি নির্দেশে মূলত এ সিন্ডিকেটের পথ চলা শুরু হয়। দেশের ব্যান্ডউইথ চাহিদার কোনো যথার্থ মূল্যায়ন বা বিশেষজ্ঞ মতামত না নিয়েই বিশেষ মহলের স্বার্থ রক্ষার্থে রাতারাতি পরিবর্তন করা হয় সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্সিং গাইডলাইন।

অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে লাইসেন্স তুলে দেওয়া হয় জয়ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, বিতর্কিত চরিত্র এবং আওয়ামী লীগ ঘরোয়া সিন্ডিকেটের হাতে। জালিয়াতির আড়ালে চলা এ সাবমেরিন সিন্ডিকেটের আদ্যোপান্ত অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

বিটিআরসির জারিকৃত এক পত্রে দেখা যায়, ২০২০ সালের অক্টোবরে তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বারের সভাপতিত্বে এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের উপস্থিতিতে বিটিআরসিতে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বেসরকারি খাতে সাবমেরিন ক্যাবলের লাইসেন্স প্রদানের বিষয়ে সরাসরি নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালে দেশের ব্যান্ডউইথ চাহিদার যথার্থ মূল্যায়ন বা বিশেষজ্ঞ মতামত ছাড়াই সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় বেসরকারি খাতে তিনটি সাবমেরিন ক্যাবলের লাইসেন্স প্রদান করা হয়। এ লক্ষ্যে একদিকে তড়িঘড়ি করে সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্সিং গাইডলাইনের সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে দুদফা সময়সীমাও বাড়ানো হয়। ফলে টেলিযোগাযোগ খাতে উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও আওয়ামীঘনিষ্ঠ এবং একই খাতের বিতর্কিত কয়েকটি নতুন প্রতিষ্ঠান সাবমেরিন ক্যাবলের লাইসেন্স লাভ করে।

মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ ৯২.৪৬ নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অর্জন করে সামিট কমিউনিকেশনস। প্রতিষ্ঠানটির ২৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক সাবেক মন্ত্রী ফারুক খানের ভাই ফরিদ খান। এছাড়া ৪৯ শতাংশ শেয়ারের মালিক দুবাইভিত্তিক গ্লোবাল এনার্জিস হোল্ডিং লিমিটেড, যার মালিকানায় রয়েছেন আজিজ খানের কন্যা আদিবা আজিজ খান। বাকি ২১ শতাংশ শেয়ারের মালিক মরিশাসভিত্তিক সিকোয়া ইনফো টেক লিমিটেড এবং অবশিষ্ট পাঁচ শতাংশ শেয়ারের মালিক সামিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ আল ইসলাম। সামিট কমিউনিকেশনসকে সাবমেরিন ক্যাবলের লাইসেন্স দেওয়ার মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ খাতের প্রায় প্রতিটি স্তরে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়। এর ফলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর টেলিযোগাযোগ খাতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, সদ্য প্রতিষ্ঠিত সিডিনেট ৮৭.৬৪ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে, যেখানে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ফাইবার অ্যাট হোম মাত্র ৭০.১২ নম্বর পেয়ে পঞ্চম স্থানে অবস্থান করে। মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার এ আশ্চর্যজনক জালিয়াতির চিত্র খতিয়ে দেখতে গিয়ে বের হয়ে আসে লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান তিনটির মালিকানায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ।

৮৬.৪৮ নম্বর পেয়ে তৃতীয় স্থান অধিকারী মেটাকোর শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ছেলে রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক, লেভেল থ্রি ক্যারিয়ার লিমিটেডের মালিক আহমেদ জুনায়েদ, অ্যাম্বার আইটির প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম এবং নাভিদুল হক। সাবেক রাষ্ট্রপতির ছেলে রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিকের প্রভাবে লাইসেন্স পায় মেটাকোর। তৌফিক নিজে লেভেল থ্রি ও মেটাকোর উভয় প্রতিষ্ঠানের মালিকানার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অন্যদিকে মেটাকোরের অন্যতম শেয়ারহোল্ডার মোহাম্মদ আমিনুল হাকিমের প্রতিষ্ঠান অ্যাম্বার আইটির বিরুদ্ধেও অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার অভিযোগ আছে। ২০২০ সালের মে মাসে অবৈধ কল টার্মিনেশন (ভিওআইপি) কার্যক্রমে সহায়তার অভিযোগে অ্যাম্বার আইটিকে পাঁচ লাখ টাকা প্রশাসনিক জরিমানা করা হয়েছিল। মেটাকোরে আমিনুল হাকিমের শেয়ারের পেছনে মূল জোগানদাতা মূলত পারটেক্স গ্রুপের অ্যাম্বার আইটি।

তবে সভার প্রতিবেদনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠে আসে ৮৭.৬৪ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিডিনেটের মালিকানা ও লাইসেন্স প্রাপ্তির প্রক্রিয়া ঘিরে। অনুসন্ধানে রাজনৈতিক প্রভাবের এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে, যেখানে প্রভাবশালী মহলের স্বার্থরক্ষায় সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। লাইসেন্সের আবেদন আহ্বানের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত (মোহাম্মদ এ আরাফাত) এবং অর্থনৈতিক খাতে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আলোচিত চৌধুরী নাফিজ শরাফত যৌথভাবে সিডিনেট কমিউনিকেশনের সূচনা করেন এবং বিস্ময়করভাবে টেলিযোগাযোগ খাতে নবগঠিত এ কোম্পানি মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে যায়। দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর খাতটির এমন রাজনীতিকরণ বিটিআরসির লাইসেন্স প্রদানের পুরো প্রক্রিয়াটিরই স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি আইআইজি প্রতিষ্ঠানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, একই গোষ্ঠীর সাবমেরিন ক্যাবল, আইটিসি, আইআইজি, এনটিটিএন এবং আইএসপি খাতে উপস্থিতির কারণে বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। ফলে অন্যান্য আইআইজি প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যবসা পরিচালনা ও বাজারে টিকে থাকা দিনদিন কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফাইবার অ্যাট হোমের সিইও সুমন আহমেদ সাব্বির আমার দেশকে বলেন, ‘প্রক্রিয়াটা (লাইসেন্স দেওয়ার) সঠিক ছিল না, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সে প্রক্রিয়াটা আসলেই রিভিউ হওয়া দরকার।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান তিনটির প্রকৃত মালিকানা এখনো আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর কাছেই রয়েছে। আরো অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান ক্ষমতাসীনদের মধ্য থেকে নতুন অংশীদার যুক্ত করে প্রকল্পটির অনুমোদন আদায়ের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির চালানো হচ্ছে।

অনুসন্ধানে আরো উঠে এসেছে, রাজনৈতিক প্রভাবে লাইসেন্স অর্জনের পর সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের প্রক্রিয়াতেও তিনটি প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ব্যবসায়িক সুবিধা নিশ্চিত করতে পৃথক লাইসেন্সধারী তিনটি প্রতিষ্ঠান একটি যৌথ কনসোর্টিয়াম গঠন করেছে। তবে বিদ্যমান সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্সিং গাইডলাইনে পৃথক লাইসেন্সধারীদের এ ধরনের কনসোর্টিয়াম গঠনের কোনো বিধান পাওয়া যায়নি। এর ফলে তিনটি স্বতন্ত্র লাইসেন্স কার্যত একটি একক ব্যবসায়িক সত্তা হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, গাইডলাইনে এ ধরনের ব্যবস্থার কোনো আইনগত ভিত্তি না থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে এবং সেটিকে বিটিআরসি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে অনুমোদন করিয়ে নেয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, লাইসেন্সিং গাইডলাইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এ ব্যবস্থাকে বৈধতার আবরণ দিতেই এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী আমার দেশকে বলেন, ‘আমার কাছে এমন কোনো অভিযোগ আসেনি।’

এছাড়া গাইডলাইন অনুযায়ী তিনটি প্রতিষ্ঠানের মোট ছয়টি ফাইবার পেয়ার স্থাপনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে তারা তিনটি ফাইবার পেয়ার কম এনেছে, যা লাইসেন্সিং গাইডলাইনের পরিপন্থী। একই সঙ্গে লাইসেন্সধারীদের পূর্ব ও পশ্চিম উভয় দিকের আন্তর্জাতিক সংযোগ স্থাপনের শর্ত থাকলেও অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠান তিনটি শুধু কক্সবাজার-সিঙ্গাপুর পূর্বমুখী রুট বাস্তবায়ন করেছে, পশ্চিমমুখী (ইউরোপ/মধ্যপ্রাচ্যগামী) কোনো সংযোগ স্থাপন করেনি, যা লাইসেন্সের অন্যতম মৌলিক শর্তের লঙ্ঘন ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবমেরিন ক্যাবল দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট একটি কৌশলগত খাত। ফলে এ খাতে যে কোনো সিদ্ধান্ত ক্যাবল বাণিজ্যিক নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সাইবার নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিয়ে গ্রহণ করা উচিত।

সম্পাদনা: রকিব

মিসরে রাবা গণহত্যার ১৩ বছর, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবি পরিবারের

বাংলাদেশের বুকে এক টুকরো ভারত: রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানায় বন্যায় ৫ জনের মৃত্যু

তারেক রহমানকে কটূক্তি, ছেলের বদলে বাবাকে শাসালেন যুবদল নেতা

মুখ দিয়ে লিখে দাখিল জয় রিয়াদের

‘হরমুজ দখলের যেকোনো প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেবে ইরান’

সীতাকুণ্ডের দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজে ছিল বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস

হরমুজ খুলে দেওয়া এবং ওমানের সঙ্গে আলোচনা আলাদা বিষয়

অকেজো রাডারসহ নানা সংকটে খুঁড়িয়ে চলছে আবহাওয়া দপ্তর

নতুন আয়োজনে আট ব্যান্ড ও ১২ শিল্পীর কণ্ঠে আইয়ুব বাচ্চুর ২০ গান