* মন্ত্রীর ঘোষণার ১১ দিন পর কার্যকর
* অবৈধ অস্ত্রের তথ্য দিলেই পুরস্কার : র্যাব ডিজি
দেশে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই ও চুরিসহ নানা ধরনের ভয়ানক অপরাধের সূচক বাড়ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণার ১১ দিন পর পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে গত সোমবার থেকে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে র্যাব। এছাড়া ১ মে থেকে চলমান বিশেষ অভিযানের পরিধিও বাড়িয়েছে পুলিশ। তবে এখন পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে বড় ধরনের সফলতার খবর মেলেনি।
গত ২৯ আগস্ট রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ‘ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভা’ শেষে সন্ত্রাস দমনে সারা দেশে বিশেষ অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘সারা দেশে অবৈধ ও লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চলছে। পাশাপাশি মাদক চোরাচালান, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি ধরার জন্যও আমরা বিশেষ অভিযান পরিচালনা করব।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ‘মন্ত্রীর ঘোষণার পর বিশেষ অভিযানের কোনো নির্দেশনা আমাদের কাছে আসেনি। তবে চব্বিশ সালের আগস্টে লুণ্ঠিত অস্ত্রের মধ্যে যেগুলো এখনো উদ্ধার হয়নি, সেগুলোর বিষয়ে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি), অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) ও র্যাবের ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে বিশেষ অভিযানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। র্যাবকে এই বিশেষ অভিযানের সমন্বয় করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী র্যাবকে সহযোগিতা করবে। অস্ত্র ও অপরাধ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে ওই বিশেষ অভিযান চালাবে র্যাব।’
বিশেষ অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) ও অতিরিক্ত আইজিপি আহসান হাবীব পলাশ আমার দেশকে বলেন, ‘আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। লুণ্ঠিত অস্ত্র ও অবৈধ অস্ত্রের তথ্য চেয়ে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। তথ্যদাতার নাম-ঠিকানা গোপন রাখা ও তাকে পুরস্কৃত করার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।’
পুলিশের পরিসংখ্যান থেকে কয়েক মাসের অপরাধ সূচক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সারা দেশে ডাকাতি, দস্যুতা, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, চুরি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো ভয়ানক অপরাধ বেড়েছে। বেড়েছে মামলার সংখ্যাও। গত মে মাসে সারা দেশে মামলা রুজু হয়েছিল ১৮ হাজার ১৪৯টি। জুনে সেখানে মামলা রেকর্ড হয়েছে ১৮ হাজার ৮২০টি। অর্থাৎ আগের মাসের তুলনায় ৭১৭টি মামলা বেশি রেকর্ড হয়েছে। জুনে যেসব মামলা রেকর্ড হয়, তার মধ্যে ১১ হাজার ৮৮৮টি বা ৬৩ দশমিক ৭১ শতাংশ ছিল উদ্ধারজনিত মামলার বাইরে। মে মাসের তুলনায় জুনে খুনের মামলা ১৬টি, নারী ও শিশু নির্যাতন ২৪৮টি, চুরি ও সিঁধেল চুরি ৭৭টি বেশি হয়েছে। জুনে দেশে ৩২৬টি খুনের মামলা হয়েছে। মে মাসে সেই সংখ্যা ছিল ৩১০টি। অর্থাৎ জুনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১টি খুনের মামলা রেকর্ড হয়েছে। জুলাই ও আগস্টে এ সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। তবে বিস্তারিত পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, পুলিশের রেকর্ডেই যখন অপরাধের বিষয়ভিত্তিক সূচক বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন বলতে হবে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে। গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দল ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে তুমুল বিতর্ক হয়েছে।
অপরাধবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও মাঠ প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে, যা আইনশৃঙ্খলা অবনতির বড় কারণ। পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় অপরাধীরাও থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন কিংবা নির্দেশনা দিলেও মাঠপর্যায়ে সেটা কার্যকর হচ্ছে না। মাঠপর্যায়ে গোয়েন্দা কার্যক্রমের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। ফলে পুলিশ মাঠপর্যায়ে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ডিআইজি জানান, দেশে বিদ্যমান অপরাধ নিয়ন্ত্রণে র্যাব, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার ও কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে বিশেষ অভিযান চালানো জরুরি। ব্লক রেইড, কম্বিং অপারেশন ও কম্বাইন্ড অপারেশনসহ নানা কৌশলে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। তার আগে জরুরি এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসীদের তালিকা। এখন পর্যন্ত যৌথ কোনো অভিযানের প্রস্তুতি দেখা যায়নি। তবে অস্ত্র উদ্ধারে সোমবার থেকে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে র্যাব।
বিশেষ অভিযানের ঘোষণা দেওয়ার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ইন্টেলিজেন্স সাপোর্ট নিয়ে আমরা বিশেষ অভিযানের কার্যক্রম চালাব। কিছু অভিযান চালু আছে। কিছু কৌশল প্রণয়ন করেছি। সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পুলিশকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, কোনো কর্মকর্তা এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখাতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষ অভিযানের অগ্রগতি সম্পর্কে এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন আমার দেশকে বলেন, মন্ত্রী হয়তো চলমান বিশেষ অভিযানের পরিধি বাড়ানোর কথা বলেছেন। চব্বিশের আগস্টে খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধার, অবৈধ মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারসহ পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে গত ১ মে থেকে সারা দেশে বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। মন্ত্রীর নির্দেশনার পর অভিযানের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। অভিযানে ১ মে থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত ৫৩ হাজার ৫১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময় অন্যান্য মামলা ও অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে আরো এক লাখ ৪৩ হাজার জন। বিশেষ অভিযান এবং অন্যান্য মামলায় মোট গ্রেপ্তার হয়েছে এক লাখ ৯৫ হাজার জন। অভিযানে পুলিশ ৪৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্রসহ বোমা ও অস্ত্র তৈরির বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে। এছাড়াও এক কোটি ৪০ লাখের বেশি ইয়াবাসহ বিপুল মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেছে।
বিশেষ অভিযান সম্পর্কে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, দেশব্যাপী সরকারি সব হারানো অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ যৌথ অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযানে র্যাবকে প্রধান সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত সঠিক তথ্য ও সংবাদ পরিবেশনে সবার সার্বিক সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে। র্যাব জানিয়েছে, ‘হারানো সরকারি অস্ত্রের তথ্য দিন; গোপনে ও নিরাপদে পুরস্কার নিন।’