বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের সম্প্রসারণে আগামী পাঁচ বছরে ৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন) বিনিয়োগের রোডম্যাপ উন্মোচন করেছে বাংলাদেশ ও জাপান। এই রূপকল্প বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণে শিগগির জাপানের বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশ সফর করবে। জাপানের বেসরকারি খাত থেকে বাংলাদেশে সম্ভাব্য এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে জাপানের রাজধানী টোকিওতে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। দুদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো বিস্তৃত ও কার্যকর কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীতের লক্ষ্যে বৈঠক শেষে ১৪ দফার যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। এতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, যোগাযোগ, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত তুলে ধরা হয়েছে।
গতকাল স্থানীয় সময় দুপুর পৌনে ১২টায় টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কান্তেই’-তে দুদেশের শীর্ষ নেতার নেতৃত্বে বৈঠক হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মানে আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান ও সফরসঙ্গীরা। বিকালে প্রধানমন্ত্রী জাপানের চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরে জেরার এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ইচিকাওয়া শহরে নিটসু লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন জানান, দুদেশের শীর্ষ বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও শিল্পায়নের লক্ষ্য অর্জনে জাপান সরকার ও দেশটির বেসরকারি খাতকে আরো সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের প্রত্যাশা
বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাত থেকে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে স্বাগত জানান তারা। এই বিনিয়োগের ফলে উৎপাদন, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি ও উৎপাদন শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। ২০৩৪ সালের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
জাপানের বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারত্ব কয়েক দশকের বন্ধুত্ব, আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার সুযোগ এখন তৈরি হয়েছে। তিনি জাপানের বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশের বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধান এবং দেশের প্রবৃদ্ধির পরবর্তী পর্যায়ে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
জ্বালানি, অবকাঠামো ও আইসিটি খাতে প্রস্তাবিত এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত জাপানি বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট খাতগুলোয় বিনিয়োগের সুযোগ চিহ্নিত করা, কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ তৈরি করতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্কের পরিকল্পনা
বাংলাদেশের যোগাযোগ অবকাঠামো আধুনিকায়নে জাপানের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং দেশব্যাপী উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। এসব বৃহৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা, কারিগরি সহায়তা, বিনিয়োগ ও অর্থায়নে জাপানের অংশগ্রহণ কামনা করেন তিনি।
ঢাকার মেট্রোরেল (এমআরটি) লাইনগুলোর নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার বিষয়েও একমত হয়েছে দুই দেশ।
বাংলাদেশ ও জাপানের যৌথ উন্নয়ন উদ্যোগ ‘বিগ-বি’ সম্প্রসারণ করে ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ বা অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। এর আওতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও আইসিটি অবকাঠামোকে সমন্বিত করে এ অঞ্চলকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে দুই দেশ একযোগে কাজ করবে। মাতারবাড়ী বন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ উদ্যোগের মাধ্যমে জাপানের কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ মেধাবী, উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি খাতের দক্ষ জনশক্তির সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত টেক পার্কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি মহাকাশ বিজ্ঞান, স্যাটেলাইট প্রকৌশল ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে জাপানের অগ্রসর সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
জ্বালানি নিরাপত্তায় ৫০ বিলিয়ন ইয়েন ঋণ
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জাপানের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগ ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
এশিয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে জাপানের ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশকে ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হয়। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলা ও বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ঋণ সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জ্বালানি সহযোগিতার বাস্তব চিত্র দেখতে গতকাল দুপুরে চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরে জেরা’র স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া জাপানের আধুনিক পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা নিতে বিকালে চিবা প্রিফেকচারের ইচিকাওয়া শহরে নিটসু লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেন তিনি।
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে দুই দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) সই হয়েছে।
ইপিএ চুক্তি ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই ও কার্যকর করার মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের মসৃণ ও টেকসই উত্তরণে এ চুক্তি সহায়ক হবে বলে যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির অনুরোধ নিয়েও আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছে জাপান।
বৈঠকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতসংশ্লিষ্ট তিনটি পৃথক সহযোগিতা স্মারক (এমওসি) সই হয়। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, কৃষি আধুনিকায়ন এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে জাপানি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষ আইসিটি পেশাজীবী তৈরি এবং নিরাপদ ডিজিটাল সংযোগ প্রতিষ্ঠায় দুই দেশ একযোগে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে। বাণিজ্যিক সহযোগিতার গতি ধরে রাখতে শিগগিরই জাপান থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশ সফরের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি
দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর-সংক্রান্ত চুক্তি সই এবং কার্যকর হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। সমুদ্র ও বন্দর নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থার প্রশাসনিক ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে উপজেলা গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের দ্বিতীয় পর্যায়ে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ। জাপানের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের (এমইএক্সটি) বৃত্তিসহ বাংলাদেশে জাপানি ভাষা শিক্ষার প্রসারে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে দুই দেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। এ সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে নিজ দেশে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে।
গাজা, হরমুজ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় গাজা পুনর্গঠনের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া এবং দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের মাধ্যমে ফিলিস্তিন সংকটের ন্যায্য ও স্থায়ী সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন দুই প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দ্রুত ও পুরোপুরি খুলে দেওয়া এবং লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা। উত্তর কোরিয়ার পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন দুই নেতা। পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
গণতন্ত্র ও অভিন্ন মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার
যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং অবকাঠামো, জ্বালানি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সহযোগিতার অগ্রগতির প্রশংসা করা হয়। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের মতো অভিন্ন মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় গত পাঁচ দশকে জাপানের ধারাবাহিক সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠায় জাপানের গঠনমূলক ভূমিকারও প্রশংসা করেন তিনি।
অন্যদিকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বাংলাদেশে প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের প্রশংসা করেন। জাপান সরকারের নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের পর্যবেক্ষণে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ ছিল উল্লেখ করে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অভিনন্দন জানান। দুই নেতা অবাধ, উন্মুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।
যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব
দুই দেশের অগ্রাধিকারভিত্তিক খাত চিহ্নিত করা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং সহযোগিতার সম্ভাবনাকে কার্যকর উদ্যোগে রূপ দিতে মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এবারের শীর্ষ বৈঠক বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। পারস্পরিক আস্থা, বিস্তৃত অর্থনৈতিক সহযোগিতা, শক্তিশালী বিনিয়োগ সম্পর্ক এবং শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির অভিন্ন অঙ্গীকারের ভিত্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্ব ভবিষ্যতে আরো গভীর হবে।
সফরকালে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তার জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী ও জনগণকে ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান। একই সঙ্গে সুবিধাজনক সময়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচিকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি।
জাপানের ১৪ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক আজ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের তৃতীয় দিন আজ বুধবার বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি রয়েছে। জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর, দেশটির তৈরি পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর প্রেসিডেন্ট ও পরিচালনা পর্ষদ; এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্ট; মিতসুই, সুমিতোমো ও জেরা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং জাপানের ১৪টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দুটি গ্রুপে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী।
এ দিন বিকালে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন। দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে টোকিওর হোটেল নিউ ওতানিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কমিউনিটি অনুষ্ঠানেও যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তার।
সফরের তৃতীয় দিনে জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময়েরও কর্মসূচি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। চারদিনের এ সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।