হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

ভূমির রাজস্ব কর নির্ধারণে রক্ষকই ভক্ষক

রেজিস্ট্রার, সাব-রেজিস্ট্রারদের একক নিয়ন্ত্রণ

গাজী শাহনেওয়াজ

জমির দলিল নিবন্ধন করেন সাব-রেজিস্ট্রাররা! একইভাবে জমির শ্রেণি অনুসারে বাজারমূল্য বা সরকারি ফি (রাজস্ব কর) নির্ধারণেও তারাই নিয়ন্ত্রক। ফলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব একই ব্যক্তিদের হাতে ন্যস্ত রয়েছে। আর এ সুযোগে প্রতি শতাংশে জালিয়াতির মাধ্যমে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে যুগের পর যুগ সরকারকে ঠকিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করছে একটি চক্র। এমনকি ভূমিদস্যুদের সঙ্গে আঁতাত করে জমির শ্রেণি পরিবর্তনেও সহায়তা করার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। ফলে ‘ভূমির রাজস্ব কর নির্ধারণে রক্ষকই ভক্ষক’—এমন ভূমিকায় এখন কাঠগড়ায় জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রাররা।

তবে জমির বাজারমূল্য নির্ধারণের এই গতানুগতিক পদ্ধতিতে কমিটির পরিধি বাড়িয়ে এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিকে যুক্ত করে কাঠামোয় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

জানতে চাইলে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু ও সিনিয়র সচিব সালেহ আহমেদ অভিন্ন বক্তব্য দেন। আমার দেশকে তারা বলেন, অভিনব কৌশলে জমির দলিল নিবন্ধনে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। সাব-রেজিস্ট্রারদের সঙ্গে কিছু ভূমিদস্যু মিলে বাড়ি বা ভিটাকে ‘নাল’ জমি দেখিয়ে দলিল নিবন্ধন করিয়ে নিচ্ছে। আমরা চাইছি গতানুগতিক এই ধারায় পরিবর্তন আসুক। এছাড়া ভূমি-সংক্রান্ত সেবাগুলো একই ছাতার নিচে আনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে জানান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে গুলশানের অধীন মৌজাসমূহের শ্রেণিভিত্তিক প্রতি অযুতাংশ জমির সর্বনিম্ন গড়মূল্য নির্ধারণে একটি তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ঢাকা জেলার তৎকালীন জেলা রেজিস্ট্রার সাবিকুন নাহার নিজে এর সভাপতি হন। আর তার অধীনস্থ বাড্ডার সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলম ও গুলশানের সাব-রেজিস্ট্রার শাহ মো. আশরাফ উদ্দিন ভূঁইয়াকে এই বাজারমূল্য নির্ধারক কমিটির সদস্য করা হয়।

তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, তেজগাঁও শিল্প এলাকায় প্রতি অযুতাংশ জমির শ্রেণি অনুযায়ী বাড়ির ক্ষেত্রে নিবন্ধন ফি ৩৬ হাজার ২৯ টাকা। একইভাবে ভিটি হলে ৫১ হাজার ৬৮৩ টাকা, চালার ক্ষেত্রে ১৫ হাজার ১৫২ টাকা, পতিত হলে ১৫ হাজার ১৫৬ টাকা, নাল জমির ক্ষেত্রে চার হাজার ৩১৫ টাকা, ডোবা ১৭ হাজার ১০৪ টাকা এবং পুকুরের ক্ষেত্রে ছয় হাজার ৭৫১ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, যেসব জায়গাকে ‘নালা’ বা ‘নাল’ দেখিয়ে দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে, তার প্রায় সবগুলোই বাস্তবে ভিটি বা ক্ষেত্রবিশেষে বাড়ি। শুধু তেজগাঁও নয়; আবদুল্লাহপুর, আনুল, কড়াইল, জোয়ারসাহারা, দক্ষিণখান, ধামালকোট, পুরাকৈর ও মহাখালীসহ পুরো এলাকার চিত্র একই।

গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের আওতাধীন জোয়ারসাহারা মৌজার সরকারি মূল্যতালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নাল শ্রেণির জমির প্রতি অযুতাংশের মূল্য ৯ হাজার ৮৬ টাকা। অন্যদিকে একই মৌজায় বাড়ি শ্রেণির জমির মূল্য ৫৩ হাজার ৪৩৮ টাকা। এ হিসাবে পাঁচ কাঠা জমির দলিলমূল্য নাল শ্রেণিতে দাঁড়ায় প্রায় ৭৪ লাখ ৯৬ হাজার টাকা, যার ওপর ১৩ শতাংশ হারে সরকারি রাজস্ব আসে ৯ লাখ ৭৪ হাজার ৪৭৩ টাকা।

বিপরীত পক্ষে একই জমি যদি বাড়ি বা ভিটা শ্রেণিতে নিবন্ধিত হয়, তবে দলিলমূল্য দাঁড়ায় প্রায় চার কোটি ৪০ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। সেক্ষেত্রে সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব হয় প্রায় ৫৭ লাখ ৩১ হাজার ২২৫ টাকা। ফলে মাত্র একটি প্লটেই সম্ভাব্য রাজস্বের পার্থক্য দাঁড়াচ্ছে ৪৭ লাখ ৫৬ হাজার ৭৫২ টাকা।

ভূমি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানী, জেলা সদর, পৌরসভা ও উপজেলা শহরের বিপুল পরিমাণ জমির বর্তমান ব্যবহার বহু আগেই বদলে গেছে। কৃষিজমি, নাল, ডোবা বা পতিত জমির একটি বড় অংশ এখন আবাসিক, বাণিজ্যিক কিংবা শিল্প স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু খতিয়ানে এখনো বহাল রয়েছে কয়েক দশক আগের পুরোনো শ্রেণি। দেশের একটি বড় অংশে এখনো এসএ (স্টেট অ্যাকুইজিশন) ও আরএস (রিভিশনাল সার্ভে) খতিয়ানের তথ্যের ওপর নির্ভর করে ভূমি ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হচ্ছে, যার অনেকগুলোই ৪০ থেকে ১০০ বছরের পুরোনো। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, একই জমির জন্য ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) আদায় করা হচ্ছে তার বর্তমান ব্যবহার বা শ্রেণি অনুযায়ী। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের একটি দপ্তর যখন জমির বর্তমান ব্যবহার সম্পর্কে অবগত, তখন নিবন্ধনের সময় (সাব-রেজিস্ট্রি অফিস) সেই তথ্য কেন বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না?

ভূমি খাত-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি বলছেন, পুরোনো রেকর্ডীয় শ্রেণি ব্যবহার করে নিবন্ধন সম্পন্ন হলে করের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই সাময়িক আর্থিকভাবে লাভবান হন। তবে এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য হলো, দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, বিধি ও সরকারি নির্দেশনা অনুসারেই কাজ করা হয়। কোনো অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্তসাপেক্ষ।

ভূমি প্রশাসন বিষয়ে কর্মরত একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, ভূমি উন্নয়ন করের তথ্যভান্ডারে জমির ব্যবহারভিত্তিক সঠিক শ্রেণি ইতোমধ্যে সংরক্ষিত রয়েছে। নিবন্ধন ব্যবস্থার সঙ্গে সে তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে (ডিজিটালি) সংযুক্ত করা গেলে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে।

অন্য একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, ভূমির শ্রেণি হালনাগাদ না হওয়ার কারণে রাষ্ট্র শুধু বিপুল পরিমাণ রাজস্বই হারাচ্ছে না, একইসঙ্গে একটি অস্বচ্ছ ও দুর্নীতিপরায়ণ ব্যবস্থাও টিকে থাকছে।

ভূমি-সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, ভূমির প্রকৃত ব্যবহার একরকম আর সরকারি রেকর্ডে আরেকরকম—এই বৈপরীত্যের সুযোগে রাষ্ট্র প্রতিবছর ঠিক কত কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ কোনো হিসাব কারো কাছে নেই। তবে জোয়ারসাহারার একটি মাত্র পাঁচ কাঠার প্লটের হিসাবই বলে দিচ্ছে এ ব্যবধান ও ফাঁকির চিত্রটি কত ভয়াবহ। এখন সচেতন মহলের প্রশ্ন—পুরোনো রেকর্ডের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব লুটের এই চক্র কবে ভাঙবে?

ব্রিটিশ রাজনীতি ও অর্থনীতিকে যেভাবে পঙ্গু করেছে ব্রেক্সিট

তারেক রহমানকে নিয়ে মালয়েশিয়া সরকারের ভিডিও ‘আমার বন্ধু মহাজাদু জানে’

তিস্তায় পানির চাপে বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত

পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা

হামের মধ্যেই চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু, ছড়িয়েছে ৫৮ জেলায়

সংসদে এমপিদের বেফাঁস কথার প্রতিযোগিতা

ইলিয়াস আলী গুমের নেতৃত্ব দেন জিয়াউল

আপৎকালীনের চেয়েও বেশি খাদ্য মজুত গুদামে

উন্নয়ন প্রকল্প বিশ্বব্যাংকের, চাঁদা দিতে হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের

গতিশীল ইন্টারনেট সরবরাহে ফাইবার লাইন আন্ডারগ্রাউন্ডে নেওয়ার পরিকল্পনা