বিতর্কিত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের অন্যতম কুশীলব প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ আইনের জালে ধরা পড়েছেন। গত বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএসের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে জুলাই হত্যা মামলায় পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। ঢাকা মহানগর আদালতের প্রধান পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
এর আগে আসামি খালেদ মামুনকে কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক কফিল উদ্দিন তার সাতদিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, আসামি শেখ মামুন খালেদের নির্দেশে অজ্ঞাতনামা ৫০০ থেকে ৭০০ জন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের সন্ত্রাসী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন ও নিপীড়নের জন্য দেশি অস্ত্রসহ বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বিভিন্ন দিক থেকে নির্বিচারে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে দেলোয়ার হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে লুটিয়ে পড়েন এবং পরে মারা যান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সন্দিগ্ধ আসামি মামুন মামলার ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে প্রাথমিক তদন্তে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। মামলার ঘটনায় মূল রহস্য উদ্ঘাটন ও সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে শেখ মামুন খালেদকে নিবিড়ভাবে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত শেষ পর্যন্ত পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। ২০২৫ সালের মে মাসেই তার ওপর বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। তিনি মিরপুরের নিজ বাসভবনেই অনেকটা গৃহবন্দি ও আত্মগোপনের মতো অবস্থায় ছিলেন।
তার গ্রেপ্তারের খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বস্তির জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে জনমনে স্বস্তি ফিরলেও বেরিয়ে আসছে গা শিউরে ওঠা সব তথ্য। এক-এগারোর বিতর্কিত ভূমিকা থেকে শুরু করে আওয়ামী আমলের চরম অনুগত গোয়েন্দাপ্রধান হয়ে ওঠা মামুন খালেদের জীবন যেন এক চাতুর্য আর বিশ্বাসঘাতকতার মহাকাব্য। তার বিরুদ্ধে ডিজিএফআইকে রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার বানানো, দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাদের ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে চাকরিচ্যুত করা এবং জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের শতকোটি টাকা লুটের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে উচ্ছেদের নায়ক এবং গোপন বন্দিশিবির ‘আয়নাঘর’ সৃষ্টির অন্যতম হোতা।
এক-এগারোর কুশীলব ও রাজনৈতিক ভোল বদলের ভেল্কিবাজি
মামুন খালেদ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে এমন এক ‘বহুরূপী’ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত, যিনি ক্ষমতার প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের খোলস বদলে ফেলতেন। বিতর্কিত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় মামুন খালেদ কর্নেল পদে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ডিজিএফআইয়ের ডাইরেক্টর (মিডিয়া) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেই বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন। ব্যবসায়ী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে হুমকি ও অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার মাধ্যমে তিনি অঢেল অর্থের মালিক হন।
সূত্র জানায়, মামুন খালেদ ১৯৯৪-৯৬ সময়কালে ডিজিএফআইয়ে জিএসও-২ (স্পেশাল অপারেশন) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মামুন খালেদ ওয়ান-ইলেভেন সরকারের আমলে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (সিআইবি) পরিচালক ছিলেন। ওই সময় তার ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। ওয়ান-ইলেভেনের সময়কালে গ্রেপ্তার হওয়া রাজনীতিবিদদের রিমান্ডের নামে জিজ্ঞাবাদসহ তাদের যেসব অডিও ভিডিও ছাড়া হতো, এই মামুন খালেদ তার নেপথ্যে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এক-এগারোর সরকারকে টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য ওই সময় তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএম আমিন এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারীকে বিভিন্ন প্রজেক্ট পেপার ও সিডি তৈরি করে দিতেন বলে শোনা যায়। এমনকি তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদকেও বিভিন্ন পরামর্শ দিতেন। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী (গত সোমবার গ্রেপ্তার হওয়া) এবং মইন ইউ আহমেদের আস্থাভাজন হয়ে তিনি পদোন্নতির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠেন। তবে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর নিজেকে ‘খাঁটি আওয়ামী লীগার’ হিসেবে জাহির করতে শুরু করেন। এমনকি নিজেকে তৎকালীন প্রভাবশালী আওয়ামী নেতা শেখ হেলালের মামাবাড়ি সূত্রের আত্মীয় বলে পরিচয় দিয়ে গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ পদে আসীন হওয়ার পথ পরিষ্কার করেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এক-এগারো সরকারের সময় সাবজেলে থাকা দুই নেত্রীরই (সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও পলাতক শেখ হাসিনা) আস্থা অর্জনের জন্য কৌশলী নাটক সাজিয়েছিলেন, যাতে যে কেউ ক্ষমতায় আসুক—তার পদোন্নতি নিশ্চিত থাকে।
আয়নাঘর ও ‘জঙ্গি নাটকের’ নেপথ্য নায়ক
শেখ হাসিনার শাসনামলে ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক থাকাকালীন মামুন খালেদ সংস্থাটিকে একটি নিপীড়ক ও খুনি বাহিনীতে পরিণত করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাকে ‘আয়নাঘর’ নামক গোপন বন্দিশালার অন্যতম হোতা বলা হয়। তার হাত ধরেই আয়নাঘর প্রতিষ্ঠা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই নয়, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে তিনি শতাধিক দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাকে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে মিথ্যা অভিযোগে চাকরিচ্যুত করেন ও জেলহাজতে পাঠান।
জানা গেছে, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে তার সেনানিবাসের দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে উচ্ছেদের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন এই মামুন খালেদ। ২০১২ সালে মেজর জিয়াকে গুম করার নেপথ্যে মামুন খালেদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদসহ বরেণ্য সাংবাদিক ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তার বিশেষ সখ্য এবং বিডিআর হত্যাকাণ্ডের সময় আগাম তথ্য জেনেও ব্যবস্থা না নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সেনা কর্মকর্তাদের আমানত লুট ও জলসিঁড়ি কেলেঙ্কারি
সাধারণ সেনা অফিসাররা মামুন খালেদকে চেনেন তাদের অর্থ আত্মসাৎকারী হিসেবে। জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি দুর্নীতির বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, ‘আশিয়ান সিটি’র মাধ্যমে ওই প্রজেক্টের কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে নজরুল ইসলামের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। মামুন খালেদ সর্বমোট তিনটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন আশিয়ান সিটির সঙ্গে। তার মধ্যে দুটি চুক্তি হয় ২০১১ সালের ২০ মার্চ। অন্যটি একই বছরের ২৫ মে। এসব চুক্তিতে তার সহযোগিতায় ছিলেন সাবেক কয়েকজন জুনিয়র অফিসার।
মামুন খালেদ প্রথম চুক্তিতে অফিসারদের জন্য তিন হাজার বিঘা জমি কেনার চুক্তি করলেও ওই দিনই তা পরিবর্তন করে দুই হাজার ২০০ বিঘার চুক্তি করেন। বাকি ৮০০ বিঘা জমি নজরুল ইসলাম এবং মামুন খালেদ ভাগাভাগি করে নিতে চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ। পরে তারা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে আবার তৃতীয় চুক্তি করেন, যেখানে শুধুমাত্র দুই হাজার ২০০টি প্লটের কথা উল্লেখ আছে এবং অফিসারদের প্রত্যেককে পাঁচ কাঠা করে জমি দেওয়ার কথা আগে থাকলেও তিনি তাদের চার কাঠা করে দেওয়ার জন্য নতুন চুক্তি করেন। লাখ লাখ টাকা জমা দিলেও (নৌ ও বিমান বাহিনীর পাঁচ ১০৩ জন চাকরিরত, ৮৮৫ জন অবসরপ্রাপ্ত) হাজার হাজার সেনা কর্মকর্তার কয়েকশ কোটি টাকা লোকসান হয়। অফিসারদের জমা দেওয়া এক হাজার এক কোটি টাকারও বেশি দিয়ে তিনি নিজের শ্বশুর ও শ্যালকের নামে একাধিক কোম্পানি গড়ে তোলেন।
জানা গেছে, তিনি ‘সাবলাইম’ গ্রুপের অধীন সাবলাইম নেটওয়ার্ক, সাবলাইম আইটি, সাবলাইম বাংলাদেশসহ অন্তত সাতটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন লুটপাটের অর্থ দিয়ে। এছাড়া ‘গ্রিন রেড লিমিটেড’ নামে একটি ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে সরকারি বাসভবনকে ব্যবসার ঠিকানা বানিয়ে ২০০ কোটি টাকার ফ্লাইওভারের কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এরমধ্যে সাবলাইম নেটওয়ার্ক (রেজি. ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১২), সাবলাইম আইটি (রেজি. ২৭ মার্চ ২০১২), সাবলাইম বাংলাদেশ (রেজি. ২৮ মার্চ ২০১৩), সাবলাইম গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (রেজি. ১৯ ডিসেম্বর ২০১২), সাবলাইম বিজনেস (রেজি. ৮ ডিসেম্বর ২০১০), সাবলাইম রিসোর্স (রেজি. ৮ ডিসেম্বর ২০১০), সাবলাইম প্রোপার্টিজ (রেজি. ২৮ মার্চ ২০১১) উল্লেখযোগ্য। অর্থাৎ সবগুলো কোম্পানি তিনি ডিজিএফআইয়ে থাকাকালীন প্রতিষ্ঠা করেন।
জানা গেছে, মামুন খালেদ জলসিঁড়ি প্রজেক্টের একটি খরচের তালিকায় বায়বীয় কিছু খরচের কথা উল্লেখ করেন। এতে দেখা যায়, স্থানীয় প্রভাবশালীদের অর্থ দেওয়া বাবদ খরচ পাঁচ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ফসলের ক্ষতি বাবদ তিন কোটি ৫০ লাখ টাকা, মিডিয়া ব্যবস্থাপনা বাবদ পাঁচ কোটি ৫০ লাখ টাকা, অন্যান্য সংস্থার ব্যবস্থাপনায় তিন কোটি ৫০ লাখ টাকা, পরিকাঠামো খরচ ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা, স্থানীয় কর্মীদের বেতন ৪৮ লাখ টাকা, শান্তকরণের জন্য অর্থ পরিশোধ এক কোটি ৫৬ লাখ টাকা—সব মিলিয়ে ৫২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা খরচ দেখান।
অভিযোগ রয়েছে, মামুন খালেদ ডিজিএফআইয়ের পরিচালক থাকাকালীন জলসিঁড়ি প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত তৎকালীন কিউএমজি লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে (সাবেক সেনাপ্রধান) নাজেহাল করার লক্ষ্যে রূপগঞ্জে স্থানীয় লোকদের দিয়ে ২০১০ সালের ২৩ অক্টোবর একটি নাটক মঞ্চস্থ করেন, যার মাধ্যমে কিছু সেনাসদস্য স্থানীয়দের হাতে মার খান এবং স্থানীয় কিছু লোক নিহত হন। এর ফলে ওই প্রকল্প তখন কিছুটা স্থবির হয় এবং এ ব্যাপারে মামুন খালেদের চক্রান্তে সব দোষ তৎকালীন কিউএমজির ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হয়। ওই সুযোগকে ব্যবহার করে তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কিছু সেনা কর্মকর্তার যোগসাজশে ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে চাকরিচ্যুত করার পরিকল্পনা করেন মামুন খালেদ। মামুন খালেদের চক্রান্ত তখন সফল হয়নি। তবে কিউএমজি ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে তখন দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয় আওয়ামী লীগ সরকার।
শেয়ারবাজার ও চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য
মামুন খালেদের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির তথ্য আরো ভয়াবহ। এক-এগারোর সময় ‘জাগো বাংলাদেশ’ নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার নামে তিনি ব্যাপক চাঁদাবাজি করেন বলে অভিযোগ। বিএনপি নেতা একরামের অফিস থেকে জোরপূর্বক ৪০ লাখ টাকার শেয়ার লিখে নেওয়ার অভিযোগ আছে, যার বর্তমান মূল্য পাঁচ কোটি টাকার বেশি। তার বিও অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ওয়ান-ইলেভেনের মাত্র এক বছরে ১৭০ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ওবায়দুল করিমের ওরিয়ন ল্যাবরেটরিজ, ইউনাইটেড এয়ার ও মোসাদ্দেক আলীর বিভিন্ন কোম্পানির কোটি কোটি টাকার শেয়ার তিনি নিজের ও আত্মীয়দের নামে লিখে নিয়েছিলেন। সালমান এফ রহমানকে আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান বানানোর পুরস্কার হিসেবে তিনি ২৫ লাখ টাকার শেয়ার গ্রহণ করেছিলেন বলেও জানা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম চার বছরে শেয়ারবাজারে তার বার্ষিক টার্নওভার ছিল গড়ে ১৯০ কোটি টাকা।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মামুন খালেদকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে গত দেড় দশকের অনেক গুম, খুন এবং দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন সংক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা ও ভুক্তভোগী সেনা কর্মকর্তারা।
সাংবাদিক সৈয়দ আবদাল আহমদের ফেসবুক পোস্ট
‘দেশনত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে ৭০০ সাংবাদিকের বিবৃতি কেন অর্গানাইজ করলাম, এটাই ছিল অপরাধ’
ফেসবুক পোস্টে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বরেণ্য সাংবাদিক সৈয়দ আবদাল আহমদ উল্লেখ করেন, ‘লে. জেনারেল (অব.) মামুন খালেদ ব্রিগেডিয়ার হিসেবে ১/১১-এর সময় ডিজিএফআইয়ের মিডিয়া উইংয়ের দায়িত্বে থাকাকালীন আমাকে তার অফিসে ডেকে নিয়ে লে. কর্নেল গোলাম মাওলাকে দিয়ে অমানবিক নির্যাতন করিয়েছিলেন। চৈত্রের তীব্র গরমের মধ্যে একটি আলো-বাতাসহীন দম বন্ধ হওয়ার মতো ঘরে বন্দি করে রেখেছিলেন। আমার অপরাধ ছিল দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে গণমাধ্যমে ৭০০ সাংবাদিকের বিবৃতির উদ্যোগ কেন আমি নিয়েছিলাম? সে কথা সংক্ষেপে তুলে ধরছি’ :
‘১/১১-এর সেনা সমর্থিত জরুরি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। মিছিল-মিটিং ও লেখালেখি—সবকিছুর ওপর জরুরি আইনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ম্যাডাম খালেদা জিয়ার কারাবরণ মেনে নিতে পারছিলাম না। কী করা যায়? আমি একজন সাংবাদিক, শুধু লিখে প্রতিবাদ করতে পারি। সেটা যতটুকু পারি করছি। কিন্তু কোনো কাজে আসছে না। মাথায় এলো ম্যাডাম খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে সাংবাদিকদের স্বাক্ষর অভিযানসংবলিত বিবৃতির ব্যবস্থা করতে হবে। কাজটি করতে হবে খুব গোপনীয়তার সঙ্গে। কারণ অনেকের সংযোগ আছে আর্মিদের সঙ্গে। জানাজানি হয়ে গেলে পুরো পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে যাবে। আমার খুব বিশ্বস্ত দুজন সাংবাদিক নেতার সঙ্গে কথা বলে তাদের পরামর্শ নিয়ে কাজ শুরু করলাম। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে বিবৃতির খসড়া তৈরি করলাম। বিবৃতির খসড়া যায়যায়দিন সম্পাদক শ্রদ্ধেয় শফিক রেহমান ভাইকে দেখালে তিনি তাতে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নের অবদানের কথাও সংযোজন করলেন। প্রতিটি মিডিয়া অফিসে একজন করে বিশ্বস্ত সহকর্মীকে দায়িত্ব দিলাম স্বাক্ষর সংগ্রহ করার জন্য। আর আমি নিজে সম্পাদক ও একুশে পদক বিজয়ী সাংবাদিকদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করালাম। সম্পাদকসহ ৭০০ সাংবাদিক খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে স্বাক্ষর করলেন।
এরপর স্বাক্ষরযুক্ত কাগজগুলো ফটোকপি করে প্রতিটি অফিসের জন্য আলাদা আলাদা প্যাকেট করে সংবাদপত্র ও মিডিয়া হাউসগুলোতে পাঠালাম। সেখানে বার্তা প্রেরক হিসেবে আমার নাম লিখে স্বাক্ষর করলাম, যাতে কেউই সেটাকে ভুয়া না ভাবেন। কাজটি করেছিলাম খুব গোপনীয়তার সঙ্গে। ডিজিএফআই জেনে গেলে খবরটি ছাপার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করত। সেটা যাতে করতে না পারে সেজন্য খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করে ৭০০ সাংবাদিকের বিবৃতি বার্তা সম্পাদকদের কাছে পাঠালাম কিছুটা রাত করে। আমার এ কাজে সাহায্য করেন সহকর্মী আলাউদ্দিন আরিফ, মাহবুবুর রহমানসহ কয়েকজন সাংবাদিক সহকর্মী । মাহাবুব লন্ডনে ব্যারিস্টারি করে এখন সেখানে আইন পেশায় নিয়োজিত ।
এ বিবৃতির খবর ডিজিএফআই টের পায়নি। তাই গণমাধ্যমে খবর ছাপার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেনি। সংবাদপত্রে পরদিন খবরটি ডাবল কলাম ও সিঙ্গেল কলামে ছাপা হয়ে যায়। বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও খবরটি প্রচারিত হয়। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য সাংবাদিক সমাজ দাঁড়িয়ে গেছেন। চারদিকে সবাই খুশি। ডিজিএফআই বিপদে পড়ে যায়। বিশেষ করে মামুন খালেদ বিষয়টি জানতে পারেননি। ব্যর্থতার দায়ভার এসে পড়ে তার ওপর। জরুরি আইনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে এমন দুঃসাহসিক ঘটনা কীভাবে ঘটল? ৭০০ সাংবাদিকের এ বিবৃতিতে এক নম্বর স্বাক্ষরদাতা ছিলেন কিংবদন্তিতুল্য সাংবাদিক আতাউস সামাদ। এরপর শফিক রেহমান, আতিকুল আলম, রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।
পরদিন যা হবার তা-ই হলো। ডিজিএফআই থেকে আমাকে ডাকা হলো চিফ রিপোর্টারদের সঙ্গে একটি বৈঠকের কথা বলে। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, হয়তো জবাবদিহি করতে হবে। আমার সহকর্মী ও বন্ধু লে. রুশদকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যাই। রুশদকে বলা হলো কিছুক্ষণ পরে সভা হবে, আপনার থাকার দরকার নেই। তিনি চলে গেলেন। এরপর লে. কর্নেল গোলাম মাওলার অমানবিক নির্যাতনের শিকার হলাম। আমার বাবা একজন আলেমে দ্বীন ছিলেন। মসজিদের একজন খতিব ও পীর সাহেব হিসেবে সারাজীবন আদর্শ জীবনযাপন করেছেন, মানুষের কল্যাণ করে গেছেন। কিন্তু ওই আর্মি অফিসার আমার বাবাকে উদ্দেশ করে, এমন একজন আলেমে দ্বীনকে উদ্দেশ করে যে ভাষায় গালিগালাজ করেছিলেন, আমার তখন মনে হলো এর চেয়ে আমার মরণ হলো না কেন? আমি ওই অফিসারকে বাবার পরিচয় দেওয়া সত্ত্বেও তিনি কর্ণপাত করেননি, গালি অব্যাহতই রেখেছিলেন। তেমনি সেদিন স্কুল থেকে ছেলেকে বাসায় নেওয়ার দায়িত্ব ছিল আমার। কিন্তু ডিজিএফআইয়ের অফিসে আটক থাকায় বাসায় বা স্কুলে খবর দিতে পারিনি। ফলে স্কুল কর্তৃপক্ষ ছুটির কয়েক ঘণ্টা পর ছেলেটিকে বাড়ি পৌঁছায়। অফিস এবং আমার বাসা থেকে আমার খোঁজ শুরু হলে লে. রুশদ ভাই সাংবাদিকদের জানান এবং ডিজিএফআই অফিসে যোগাযোগ করেন। এরই মধ্যে বিষয়টি সাংবাদিকদের মধ্যে জানাজানি হওয়ার পর তারা রাতে প্রেস ক্লাব থেকে বিক্ষোভ মিছিল করার সিদ্ধান্ত নেন, এ খবর পেয়ে ডিজিএফআই রাতে অবশেষে আমাকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।’
‘এত বছর পর আজ সেই মামুন খালেদ তাদের সেই ঘৃণ্য অপকর্মের জন্য ধরা পড়েছেন, খবরটি দেখে খুব ভালো লাগছে। পাপের জন্য কিছুটা হলেও প্রায়শ্চিত্ত করুন মামুন খালেদ।’
আদালতে যা বললেন মামুন খালেদ
গতকাল শুনানির সময় মামুন খালেদ আদালতে দাবি করেছেন, আসিয়ানের নজরুলের ১৫০০ কোটি টাকা উদ্ধারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, আমি শুধু সেই উদ্ধার প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলাম।
আয়নাঘর প্রসঙ্গে জেনারেল মামুন বলেন, ‘আমার মেয়াদে কোনো অভিযোগ ছিল না এবং এ বিষয়ে একাধিকবার শুনানিতে অংশ নিয়েছি’।
যে মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সে মামলা সম্পর্কে ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান বলেন, ‘মামলার ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তিনি বলেন, অবসর নেওয়ার পর আমি দীর্ঘ সময় ধরে সিভিলিয়ান হিসেবে জীবন যাপন করছি। আমি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হইনি।’
মামুন আরো বলেন, ‘এক-এগারোর সময় আমি কুমিল্লায় কর্মরত ছিলাম। সে সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জামিনের ব্যাপারে আমি সরাসরি ভূমিকা পালন করেছি।’
মামুনের পক্ষে আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীন ও নজরুল ইসলাম রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন। তারা বলেন, মামলার এজাহারে মামুন খালেদের নাম নেই এবং ঘটনার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। ২০১৬ সালে তিনি অবসরে গিয়েছেন এবং একজন পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে তিনি শুধু দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাষ্ট্রপক্ষে মহানগর পিপি ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। তিনি বলেন, আসামি মামুন খালেদ এক-এগারোর অন্যতম কুশীলব ছিলেন। পরবর্তীকালে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতে সহযোগিতা করায় পুরস্কারস্বরূপ তাকে ডিজিএফআইয়ের প্রধান করা হয়। জেনালে মামুনের সময়কালেই আয়নাঘর তৈরি করা হয়। যেখানে সাধারণ মানুষকে নির্যাতন ও পুড়িয়ে মারার মতো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।
পিপি আরো অভিযোগ করেন, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাসা থেকে এক কাপড়ে বের করে দেওয়ার নেপথ্যে ছিলেন এই মামুন খালেদ। তার নির্দেশেই গত ১৯ জুলাই মিরপুরে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো হয়, যাতে দেলোয়ার নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। এছাড়া জলসিঁড়ি প্রকল্পের কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথাও তোলেন পিপি। যে কারণে ইতোমধ্যে আদালত তার স্ত্রীসহ বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয় বলে জানান পিপি ওমর ফারুক ফারুকী।