হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

পর্যটন দিবস আজ: সম্ভাবনা থাকলেও বিকাশ ঘটেনি

কবিতা

ছবি: সংগৃহীত

‘ডিজিটাল এজেন্ডা এবং ট্যুরিজম পুনর্গঠনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’—এ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আজ দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব পর্যটন দিবস। বিপুল প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে পর্যটন খাত এখনো কাঙ্ক্ষিত বিকাশ লাভ করেনি। দুর্বল অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা সংকট, অপর্যাপ্ত বাজেট, আন্তর্জাতিক প্রচারের ঘাটতি এবং নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়াকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

পর্যটন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সম্ভাবনা অনেক। কিন্তু সরকারের পর্যাপ্ত সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে দীর্ঘদিন ধরেই এ খাত অবহেলিত। পর্যটনবান্ধব পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় বিদেশি পর্যটকরাও বাংলাদেশে আসতে যথেষ্ট উৎসাহিত হচ্ছেন না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটনশিল্পের মৌলিক বিকাশ চার স্তম্ভের ওপর নির্ভরশীল। এগুলো হলো—প্রতিবেশ সংরক্ষণ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। বাংলাদেশে এই চার ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশের রয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর সুন্দরবন, কক্সবাজার, সিলেটের চা-বাগান, পার্বত্য চট্টগ্রামের নয়নাভিরাম পাহাড়, হাওরকন্যা সুনামগঞ্জসহ অসংখ্য আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য। কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেট, সাজেক, বান্দরবান, কুয়াকাটা ও সেন্টমার্টিন ইতোমধ্যে দেশের পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ পর্যটনেরও উল্লেখযোগ্য বিস্তার ঘটেছে।

বিশ্ব পর্যটন দিবস সামনে রেখে বাংলাদেশ আবারও পর্যটন খাত নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখছে। জাতীয় সংসদে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, দেশের ১,৪৯৮টি পর্যটন কেন্দ্র চিহ্নিত করে একটি সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। একইসঙ্গে জাতীয় পর্যটন নীতিমালা-২০২৬ প্রণয়ন, ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট প্রস্তুত এবং কমিউনিটি ও সাংস্কৃতিক পর্যটনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পর্যটন বোর্ডের প্রধান নির্বাহী ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী আমার দেশকে বলেন, পর্যটনের একটি মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে কাজ চলছে। চলতি বছরই এটি শেষ হবে। ১৯ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। বর্তমানে জিডিপিতে পর্যটনের অবদান প্রায় তিন শতাংশ। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর তা আট থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে ট্যুর অপারেটরদের মতে, পর্যটন নিয়ে বাংলাদেশের পরিকল্পনার অভাব কখনো ছিল না; সংকট ছিল বাস্তবায়নে। বর্তমানে আলোচিত ১,৪৯৮ পর্যটন কেন্দ্রের ধারণাটিও নতুন নয়।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইপিই গ্লোবাল ২০১৯ সালে যে দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিল, সেখানেও ১,৪৯৮ পর্যটন স্থানের মূল্যায়ন করা হয়েছিল। ওই পরিকল্পনায় ছিল ৫১টি পর্যটন ক্লাস্টার, ১৪টি থিম, দুই শতাধিক প্রকল্প এবং ১০০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ পরিকল্পনা।

ওই মহাপরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল ২০৪১ সালের মধ্যে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পর্যটনকে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাতে উন্নীত করা। কিন্তু ছয় বছর পরও সে মহাপরিকল্পনা কাঙ্ক্ষিত বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া, নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে পরিকল্পনার বড় অংশ কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো পরিকল্পনা কেবল পর্যটন কেন্দ্রের সংখ্যা কিংবা প্রকল্পের আকারের কারণে সফল হয় না। এর সফলতা নির্ভর করে বাস্তবায়ন কাঠামো, নেতৃত্ব, জবাবদিহি ও সমন্বয়ের ওপর।

একক কর্তৃত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের অভাব

পর্যটন খাতের সঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, পর্যটন করপোরেশন, ট্যুরিজম বোর্ড, স্থানীয় সরকার, সড়ক ও জনপথ, বন ও পরিবেশ বিভাগসহ একাধিক সংস্থা জড়িত। কিন্তু পুরো পর্যটন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য একক কর্তৃত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান না থাকায় সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্বের সফল পর্যটন গন্তব্যগুলোর উদাহরণ দিয়ে তারা বলছেন, সেখানে একজন পর্যটক সহজে, দ্রুত ও স্বাচ্ছন্দ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন। বিমানবন্দর, মহাসড়ক, রেলপথ, নৌপথ, গণপরিবহন, ডিজিটাল তথ্যসেবা ও পর্যটন নির্দেশনা একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশেও কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেট, পার্বত্য অঞ্চল ও উপকূলীয় পর্যটন এলাকাগুলোকে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। রাজধানী থেকে পর্যটন গন্তব্যে পৌঁছানো সহজ না হলে পর্যটন অর্থনীতির পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

নিরাপত্তা ও প্রচারে ঘাটতি

পর্যটন বিকাশে নিরাপত্তাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর একটি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। পর্যটন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা, সড়ক নিরাপত্তা, জরুরি চিকিৎসা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং নারী ও বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে প্রতারণা, ছিনতাই ও চুরির মতো ঘটনা বন্ধ করে পর্যটকবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক প্রচারের ঘাটতিকেও বাংলাদেশের পর্যটন খাতের অন্যতম দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচার বাড়ানো এবং কার্যকর ব্র্যান্ডিংয়ের প্রয়োজন রয়েছে।

পর্যটন অর্থনীতিও গড়তে হবে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যটন কেন্দ্র উন্নয়ন এবং পর্যটন অর্থনীতি এক বিষয় নয়। একটি নতুন রিসোর্ট নির্মাণ কিংবা সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর মাধ্যমে নিজে থেকেই পর্যটন অর্থনীতি তৈরি হয় না।

প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো, কত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হলো, কত নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হলো, স্থানীয় জনগণের আয় কত বাড়ল এবং কত বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশকে ভ্রমণ গন্তব্য হিসেবে বেছে নিলেন।

এ কারণে একটি স্বতন্ত্র পর্যটন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, পর্যটন কেবল পরিবহন খাত নয়। এটি অর্থনীতি, সংস্কৃতি, পরিবেশ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক বিপণনের সমন্বিত ক্ষেত্রও।

কাগুজে নীতিমালা, দুর্বল অবকাঠামো

বাংলাদেশে পর্যটন নিয়ে নীতিমালা প্রণয়নের ইতিহাস কিন্তু পুরোনো। ১৯৯২ সালে জাতীয় পর্যটন নীতিমালা তৈরি করা হয় এবং ২০১০ সালে তা হালনাগাদ করা হয়। ওই নীতিমালায় কক্সবাজার, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকা ঢেলে সাজানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এর বড় অংশে চোখে পড়ার মতো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।

পর্যটন অবকাঠামোও এখনো অত্যন্ত দুর্বল। যোগাযোগ ব্যবস্থায় কিছু উন্নতি হলেও অনেক পর্যটন এলাকায় রাস্তা সরু ও বিপজ্জনক। পর্যাপ্ত আধুনিক হোটেল ও মোটেলেরও অভাব রয়েছে।

বিদেশি পর্যটক আগমনে ওঠানামা

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিদেশি পর্যটক আগমনের পরিসংখ্যানে ওঠানামা রয়েছে।

২০২০ সালে বাংলাদেশে এসেছেন এক লাখ ৮১ হাজার ৫১৮ বিদেশি পর্যটক। ২০২১ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় এক লাখ ৩৫ হাজার ১৮৬ জনে। ২০২২ সালে বেড়ে হয় পাঁচ লাখ ২৯ হাজার ২৬৮ জন। ২০২৩ সালে বিদেশি পর্যটক এসেছেন ছয় লাখ ৫৫ হাজার ৪৫১ জন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ছয় লাখ ৬০ হাজার। তবে ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় পাঁচ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫ জনে।

অন্যদিকে প্রতি বছর প্রায় তিন কোটি অভ্যন্তরীণ পর্যটক দেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে ভ্রমণ করেন।

‘সদিচ্ছার অভাবেই উন্নতি হচ্ছে না’

অ্যাভিয়েশন ও পর্যটন বিশেষজ্ঞ ওয়াহিদুল আলম আমার দেশকে বলেন, সরকারের সদিচ্ছার অভাবে পর্যটন সেক্টরের উন্নতি হচ্ছে না। সব সময়ই এ সেক্টরটি অবহেলিত। নীতিমালা থাকলেও কার্যকর প্রয়োগ নেই। এ খাতের বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণও খুবই কম।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের পর্যটন খাতের বড় সমস্যা হলো ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব। এর সঙ্গে রয়েছে ভিসা জটিলতা। বাংলাদেশের হোটেল, মোটেল ও অন্যান্য পর্যটন ব্যয়ও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বেশি। ফলে বিদেশি পর্যটকরা আকৃষ্ট হন না।

ওয়াহিদুল আলম বলেন, বাংলাদেশের সরকারি নীতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি দেশের পর্যটন খাতের ব্র্যান্ডিং প্রয়োজন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নেতিবাচক বিষয় নিয়ে যে কথাবার্তা বিদেশে প্রচারিত হয়, সেটিও বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে।

পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের সামনে পর্যটন খাতকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে। তবে নতুন পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন নিরাপদ ও সহজ যোগাযোগ, আধুনিক অবকাঠামো, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, কার্যকর প্রচার এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনা।

তাদের মতে, বাংলাদেশের পর্যটনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন নতুন পরিকল্পনা তৈরি নয়; বরং বিদ্যমান ও প্রস্তাবিত পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের পথে নেওয়া। পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন, অবকাঠামো থেকে অর্থনৈতিক সুফল এবং সম্ভাবনা থেকে দৃশ্যমান ফলাফলে পৌঁছাতে পারলেই পর্যটন খাত দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ-ভারত বৈরিতার বড় কারণ শেখ হাসিনা

দেশে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়লেও তৈরির গতি মন্থর

সামিটের নেতৃত্বে সাবমেরিন ক্যাবলের অবৈধ কনসোর্টিয়াম

অনিয়মে ডুবছে জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট

দখলবাজিতে বিলীনের পথে ধূপখোলা মাঠ

বিরোধী দল ছাড়াই সংবিধান সংশোধনের পথে সরকার

যাত্রাবাড়ীতে ব্যাপক চাঁদাবাজি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি

পর্যালোচনায় বিতর্কিত পিডি ও কর্মকর্তাদের ‘আমলনামা’

অভিযুক্তকেই প্রমাণ করতে হবে পাচার করা অর্থ বৈধ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সর্বত্র