গ্রেপ্তার, কারাবাস, জামিন—এরপর আবার পুরোনো অপরাধে জড়ানো। শীর্ষ সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের একটি অংশের ক্ষেত্রে এমন প্রবণতা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের তথ্য ও একাধিক ঘটনার বিবরণে উঠে এসেছে, একই অপরাধে বারবার গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্তির পর অনেকে ফের অপরাধে জড়াচ্ছেন। অথচ কারামুক্ত এসব ব্যক্তির ওপর নিয়মিত নজরদারি এবং অপরাধের হালনাগাদ তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা কার্যকর থাকার কথা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকায় অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হচ্ছে।
পুলিশ বলছে, দেশের বিভিন্ন থানা ও ইউনিটে মাসে গড়ে প্রায় ৭০ হাজার আসামি গ্রেপ্তার করা হয়। আবার আদালত থেকে জামিন পেয়ে কারাগার থেকে মুক্তি পান প্রায় সমান সংখ্যক আসামি।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, যথাযথভাবে জেল প্যারেড কার্যকর না হওয়া, পেশাদার অপরাধীদের সঠিক নজরদারিতে রাখার ব্যর্থতা, ক্রিমিনাল ডেটাবেজ হালনাগাদ না করা, ভিলেজ ক্রাইম নোটবুক (ভিসিএনবি) তৈরি না করা, অপরাধীদের হালনাগাদ রেকর্ড বা সার্ভিলেন্স লিস্ট তৈরি না করা, ভিজিট চার্ট অনুসরণ না করাসহ নানা কারণে সংঘবদ্ধ অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
তারা বলেন, অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়ে কিছু দিন পরই জামিন পেয়ে যায়। জামিন পেয়েই আবার ফের একই ধরনের অপরাধে জড়ায়। অপরাধীদের এই প্রবণতা দূর করতে কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল গঠন ও প্রত্যেক জেলায় এর শাখা করার পরিকল্পনা করেছিল পুলিশ। কিন্তু সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যায়নি।
জানা গেছে, ২০০১ সালের ২৫ ডিসেম্বর সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর কয়েকজন চব্বিশের ৫ আগস্টের পর জামিন পান। তাদের মধ্যে রয়েছেন সুব্রত বাইন, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন, মোহাম্মদপুরের ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, ফ্রিডম রাসু, টিটন, শেখ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলামসহ আরো কয়েকজন। জামিন পাওয়ার পর এসব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে বেশকিছু লোমহর্ষক অপরাধ ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গেও তাদের নাম এসেছে।
গত ১৯ জানুয়ারি সাভারের তেঁতুলঝোড়ায় জামিনে মুক্ত হয়ে রকিবুল ইসলাম ফয়সাল নামে এক ব্যক্তির মামলার সাক্ষীসহ পাঁচজনকে কুপিয়ে আহত করার অভিযোগ ওঠে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাভারের হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় শাহাবুদ্দিন নামে এক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি।
গত ২৪ জুলাই চট্টগ্রামের ফিশারিঘাট ভেড়া মার্কেট এলাকা থেকে মাদক কারবারি মাসুমা পারভীন শিমুকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে মাদক ও মানব পাচারসহ অন্তত পাঁচটি মামলা রয়েছে। এর আগেও তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। জামিনে বেরিয়ে ফের মাদক কারবারে জড়ান বলে জানায় পুলিশ।
এ বছরের জানুয়ারিতে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় চিত্ত চন্দ্র দাস, রবি চন্দ্র রাজবংশী, কহিনুর ইসলাম ও কাজী শরিফ নামে চারজনকে মাদক কারবারের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশ জানায়, এর আগেও কয়েক দফায় তাদেরকে মাদক দ্রব্য বিক্রির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
গত ২৭ আগস্ট ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে লিটন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে যুক্ত কর্মকর্তারা জানান, এর আগেও লিটনকে আরো পাঁচবার একই অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
পুলিশ সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১ মে থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত চার মাসে ১ লাখ ৯৫ হাজার ১৪৬ জন গ্রেপ্তার করেছে। প্রায় কাছাকাছি সংখ্যক আসামি এই সময়ের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে। যাদের অনেকেই জামিন পেয়ে সেই পুরোনো কারবারে ফিরে গেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যথাযথ নজরদারির অভাবে পেশাদার অপরাধীরা ফের পুরোনো অপরাধে জড়ায় বলে জানা গেছে।
পেশাদার ক্রিমিনালরা কেন নজরদারির বাইরে জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক একজন ডিআইজি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশের রেগুলেশন অনুযায়ী প্রতিটি থানায় পেশাদার অপরাধীদের ডেটাবেজ বা ক্রিমিনাল রেকর্ড অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সংরক্ষণ করার নিয়ম রয়েছে। পিআরবি রুলস ৩৯১ অনুযায়ী যাকে বলা হয় ভিসিএনবি বা ভিলেজ ক্রাইম নোটবুক। এটি পুলিশের অত্যন্ত গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ডকুমেন্টস। দুঃখজনক সত্য হলো, দীর্ঘ বছর ধরে দেশের থানাগুলোতে এই ক্রিমিনাল রেকর্ড বা ভিসিএনবি হালনাগাদ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। ফলে অনেক থানাতেই দাগি অপরাধীদের হালনাগাদ রেকর্ড (সার্ভিলেন্স লিস্ট) নেই।
তিনি বলেন, দাগি অপরাধীদের নিয়মিত তদারকির জন্য যে ‘ভিজিট চার্ট’ থাকার কথা, সেটাও বাস্তবে অনুপস্থিত। ফলে জামিনে বের হয়ে কিংবা জেল থেকে ছাড়া পেয়ে পেশাদার অপরাধীরা কোথায় কী করছে, পুলিশ তার কোনো খবরই রাখতে পারছে না। ফলে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং অপরাধীরা অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে। কারণ পুলিশি নজরদারির ভিত্তিটাই নড়বড়ে হয়ে আছে। অপরাধী যদি জানে যে সে পুলিশের ‘সার্ভেইল্যান্স’-এ নেই, তবে সে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করবেই।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, অপরাধীকে শুধু গ্রেপ্তার করলেই অপরাধ কমে না। ক্রাইম অ্যাগেনস্ট প্রপার্টি অর্থাৎ সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধ যেমন চুরি, ডাকাতি ও দস্যুতার মামলাগুলোর চার্জশিটভুক্ত আসামিরা বিচারে পার পেয়ে যাচ্ছে কি না বা দীর্ঘমেয়াদে জামিনে থাকছে কি না সেটাও নজরদারিতে রাখার মতো কোনো সমন্বিত ব্যবস্থা নেই। বিচারে শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া এবং চার্জশিট হওয়ার পরও বিচারিক প্রক্রিয়ার সঠিক তদারকি না থাকায় অপরাধীরা বারবার জামিনে এসে একই অপরাধে লিপ্ত হয়। এই অবস্থায় পুলিশের করণীয় হচ্ছে, ভিসিএনবিতে ফিরে যাওয়া। থানার ওসিদের নিজ হাতে ম্যানুয়ালি ভিসিএনবি লেখা বাধ্যতামূলক করার নির্দেশনায় ফিরে যাওয়া উচিত। সার্কেল অফিসার এবং জেলার পুলিশ সুপারকে ভিসিএনবি রক্ষণাবেক্ষণ ও দাগি অপরাধী নজরদারির বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করা উচিত।
তিনি আরো বলেন, চুরি ও ডাকাতির মতো প্রপার্টি ক্রাইমের চার্জশিটভুক্ত অপরাধীদের বিচারিক প্রক্রিয়া কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে, যাতে কোনো আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে অপরাধীরা পার না পায়। পুলিশের সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চাইতে অপরাধীদের প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারিতে রাখা এবং বিচারে শাস্তি নিশ্চিত করা সবচেয়ে বেশি জরুরি।
কার্যকর করতে হবে জেল প্যারেড
কারামুক্ত আসামিদের নজরদারিতে রাখার অন্যতম পদ্ধতি হচ্ছে জেল প্যারেড। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, জেল প্যারেডের উদ্দেশ্য হলো, কারাগারে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী, পলাতক বা নিয়মিত অপরাধীদের গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে পুলিশ হালনাগাদ তথ্য জানা, জেলখানার ভেতরের অপরাধী চক্র বা বাইরে পরিচালিত অপরাধী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা। বিচারাধীন বা সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের মামলার আপডেট এবং পুলিশ ও জেল কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় করা, পিআরবি বিধি অনুযায়ী বন্দিদের মুক্তির তারিখ বা আইনি অবস্থান তদারকি করা। এই জেল প্যারেড কার্যকরের মাধ্যমে পুলিশ জামিনে মুক্তিপাওয়া বন্দিদের নজরদারিতে রাখতে পারে।
পুলিশের বক্তব্য
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এআইজি কামারুম মুনিরা আমার দেশকে বলেন, সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের ক্ষেত্রে পুলিশ যথাযথভাবে জেল প্যারেড কার্যকর করছে। আর গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের আঙ্গুলের ছাপসহ বায়োমেট্রিক তথ্য রাখা হয়, যাতে পরবর্তীতে কোনো অপরাধে জড়াতে না পারে। একইসঙ্গে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া আসামিদের নজরদারির জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মুনতাসিরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, আমরা পর্যবেক্ষণে দেখেছি, ডাকাতি বা দস্যুতার মামলায় জামিন পাওয়া ব্যক্তিরা ফের দস্যুতা ও ডাকাতিতে জড়ায়। তাই ডাকাতি ও দস্যুতার মামলায় জামিন পাওয়া আসামিদের নজরদারিতে রাখি। কোনো এলাকায় ডাকাতি বা দস্যুতা সংঘটিত হলে আগে ওই এলাকা থেকে একই অপরাধে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদেরও তদন্ত এবং নজরদারির আওতায় আনা হয়।