হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

নীতিগত সহায়তা চায় বিমান ও পর্যটন খাত

কবিতা

বিএনপি সরকার গঠনের পর যখন প্রথম জাতীয় বাজেট পেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন বাংলাদেশের বিমান চলাচল ও পর্যটনশিল্প শুধু নামমাত্র বরাদ্দের বাইরে গিয়ে সুসংহত নীতি কাঠামোর দাবি জানাচ্ছে, যা তাদের মতে কয়েক দশক ধরে অনুপস্থিত।

সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি সুসংহত নীতিকাঠামো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দুটি খাতকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম।

বিমান চলাচল খাতের নেতারা যেখানে প্রতিযোগিতা বাড়াতে ও বিমান ভাড়া কমাতে জেট ফুয়েল, বিমান লিজ এবং এয়ারলাইন পরিচালনার ওপর করছাড়ের দাবি জানাচ্ছেন, সেখানে পর্যটন উদ্যোক্তারা এই খাতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে উন্মোচন করতে বহু প্রতীক্ষিত জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, বৃহত্তর বিনিয়োগ প্রণোদনা এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার কথা বলছেন।

পর্যটন উদ্যোক্তা এবং নীতি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন অঙ্গীকারের একটি পরীক্ষা। এই ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক বিমান চলাচল হাব এবং বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বিমান চলাচল শিল্পের বড় উদ্বেগ হলো খরচ। যাত্রী সংখ্যায় ধারাবাহিক বৃদ্ধি এবং বিমানবন্দরে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ সত্ত্বেও, বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালকরা দাবি করেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সর্বোচ্চ কর আরোপিত বিমান চলাচল বাজার হিসেবে রয়ে গেছে, যা স্থানীয় বিমান সংস্থাগুলোর প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে সীমিত করে এবং বিমানভাড়া উচ্চ রাখে।

অ্যাভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) মহাসচিব ও নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, জেট ফুয়েলের প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি বিমান সংস্থাগুলোর কার্যক্রম এবং টিকিটের মূল্যকে প্রভাবিত করে।

তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশেও জেট ফুয়েলের ওপর করের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

শিল্প খাতের হিসাব অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ বিমান সংস্থাগুলোর জন্য জ্বালানি-সংক্রান্ত কর ও শুল্ক এখনো অন্যতম বৃহত্তম পরিচালন ব্যয় হিসেবে রয়ে গেছে। তাই বিমান সংস্থাগুলো সরকারকে জেট ফুয়েলের ওপর ভ্যাট ছাড়, বিমান লিজ ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর কর হ্রাস এবং বিমান চলাচল-সংক্রান্ত শুল্ক শিথিল করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে।

বিমান শিল্প খাতের নেতারা যুক্তি দেখান যে, এই ধরনের পদক্ষেপ পরিচালন ব্যয় কমাবে, যাত্রীদের চাহিদা বাড়াবে এবং বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার জন্য বাংলাদেশি বিমান সংস্থাগুলোর সক্ষমতা জোরদার করবে, যারা বর্তমানে দেশের আন্তর্জাতিক যাত্রীদের সিংহভাগ বহন করে।

বিমান খাত দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিমান চলাচল অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের কার্যক্রম শুরুর জন্য বাজেটীয় সহায়তাও চাইছে।

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে হলে কর্মী নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা অবকাঠামো এবং পরিচালন প্রস্তুতির দিকে অবিলম্বে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘অবকাঠামো নির্মাণ করা এক জিনিস, আর তা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা অন্য জিনিস। প্রশিক্ষিত জনবল এবং সঠিক ব্যবস্থা ছাড়া নতুন টার্মিনালের সুফল পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব নয়।’

সরকারের হাব তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করার জন্য শিল্প সংশ্লিষ্টরা বিমানবন্দর আধুনিকীকরণ, কার্গো লজিস্টিকস, ডিজিটাল অ্যাভিয়েশন সিস্টেম এবং নেভিগেশন অবকাঠামোতে আরো বেশি বিনিয়োগের আহ্বান জানাচ্ছেন।

অপেক্ষার অবসান চায় পর্যটন খাত

বিমান চলাচল খাত যেখানে কর ছাড় চাইছে, সেখানে পর্যটন সংশ্লিষ্টরা আরো মৌলিক কিছু দাবির বাস্তবায়ন চাচ্ছে। পর্যটন খাতের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা। এই শিল্পের নেতারা বলছেন, পরপর সরকারগুলো পর্যটন উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করলেও পরিকল্পনাগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং আর্থিক প্রতিশ্রুতি দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে পর্যটন ক্লাস্টার, ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়ন, কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন এবং উপকূলীয় পর্যটনের সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে কক্সবাজারের সাবরাংয়ে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন উন্নয়নও অন্তর্ভুক্ত।

পর্যটন পরিচালনাকারীরা এখন বাজেটে এই প্রতিশ্রুতিগুলোর প্রতিফলন দেখতে চান। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ রফিউজ্জামান বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে পর্যটন-সম্পর্কিত সরঞ্জাম, পর্যটক যানবাহন এবং আতিথেয়তা অবকাঠামোতে করছাড় দেওয়া উচিত।

তিনি বিদেশি পর্যটকদের জন্য প্রবেশগম্যতা উন্নত করতে অভ্যন্তরীণ পর্যটনের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ এবং একটি ইলেকট্রনিক ভিসা ব্যবস্থা চালুরও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমরা দেশে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করি, অথচ অন্যান্য খাতের তুলনায় পর্যটন খাত খুবই সীমিত প্রণোদনা পায়।

ন্যায্য অংশ পাওয়ার প্রত্যাশা

পর্যটন নেতারাও মনে করেন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য অবদান থাকা সত্ত্বেও ঐতিহাসিকভাবে এই খাতটি বিমান চলাচলের তুলনায় কম মনোযোগ পেয়েছে।

টোয়াবের পরিচালক ড. মো. তাসলিম আমিন (শোভন) বলেন, পূর্ববর্তী বাজেটগুলোয় বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন খাতের সিংহভাগ সম্পদ বিমান চলাচল-সম্পর্কিত প্রকল্পগুলোয় বরাদ্দ করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, পর্যটন খাতের জন্য আরো বেশি মনোযোগ এবং উন্নয়ন তহবিলের একটি বৃহত্তর অংশ প্রয়োজন। শুধু বরাদ্দই যথেষ্ট নয়; বাস্তবায়ন এবং নেতৃত্বই সাফল্য নির্ধারণ করবে।

তিনি বলেন, পর্যটন শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। এটি পরিবহন, অবকাঠামো, নিরাপত্তা, পরিবেশ, সংস্কৃতি এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরশীল। সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া অগ্রগতি সীমিত থাকবে।

একটি যুগান্তকারী বাজেট

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে অবস্থিত, যা একে এমন এক ভৌগোলিক সুবিধা দিয়েছে যাকে বিমান চলাচল পরিকল্পনাবিদরা দীর্ঘদিন ধরে হাব উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে দেখে আসছেন। একই সঙ্গে, ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক ভ্রমণ চাহিদা পর্যটন প্রসারের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে।

তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সতর্ক করে দিয়েছে যে, শুধু ভৌগোলিক অবস্থানই প্রবৃদ্ধি এনে দেবে না। বিমান চলাচল খাত চায় কর সংস্কার, পরিচালনগত প্রস্তুতি এবং অবকাঠামোগত সহায়তা। পর্যটনশিল্প চায় বিনিয়োগ প্রণোদনা, নীতি বাস্তবায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার।

উভয় খাতের জন্যই ২০২৬-২৭ সালের বাজেটকে বরাদ্দের পরিমাণ দিয়ে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সংকেত এটি দিতে পারছে কি না, তা দিয়েই বিচার করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপি সরকারের সামনে প্রশ্নটি খুবই সহজ—তারা কি নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলোকে পরিমাপযোগ্য কর্মকাণ্ডে রূপান্তর করতে পারবে? বাংলাদেশের বিমান চলাচল ও পর্যটনশিল্পের জন্য এর উত্তর হয়তো শুরু হতে পারে প্রথম বাজেট থেকেই।

৭৯ হাজার ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’

রাডার ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম মানছে না এয়ারলাইনসগুলো

এ বছরও হচ্ছে না স্থানীয় সরকারের তিন নির্বাচন

গঠিত হচ্ছে সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ও দুর্ঘটনার কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ

মাত্র ছয় কার্যদিবসে রামিসা হত্যার রায়

অনিয়ম ঢাকতে সার্ভারে ত্রুটির দোহাই লেবার কাউন্সেলরের

নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় বারবার আগুন, বাড়ছে উদ্বেগ

ক্রসফায়ার-গুমের আড়ালে খুনিরা কি বেঁচে যাচ্ছে

অনিয়মে জড়িত বিটিআরসির এক ডজন কর্মকর্তা

প্রাথমিকেই নিভে যায় বস্তিবাসী শিশুদের শিক্ষার আলো