পচনশীল কৃষিপণ্য সংরক্ষণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এক হাজার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গুদাম (কোল্ডস্টোরেজ) নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, টমেটোসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন-পরবর্তী অপচয় কমানো এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় নাকি প্রকল্প ছাড়াই দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে—তা নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দিয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের অধীনে না গিয়ে সরাসরি বাজেট বরাদ্দ বা জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই কোল্ডস্টোরেজগুলো স্থাপন করা হবে। সম্প্রতি ঈদুল আজহার আগে কৃষি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ওই বৈঠকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালক কৃষিবিদ আবদুর রহিমকে এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যোগাযোগ করা হলে ডিএইর মহাপরিচালক আবদুর রহিম বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেন। আমার দেশকে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে কোনো প্রকল্প ছাড়াই জরুরি ভিত্তিতে এক হাজার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গুদাম ঘর তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমি দপ্তরের অধীনস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে এ বিষয়ে দ্রুত করণীয় নির্ধারণ করব। তিনি আরো জানান, দেশে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় সংরক্ষণাগার বা গুদামের সংখ্যা অত্যন্ত কম। ফলে পচনশীল সব উৎপাদিত পণ্য দীর্ঘ সময় টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। এই বাস্তবতায় সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই বিশেষ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আদেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে চার হাজার পেঁয়াজ সংরক্ষণের মেশিন কেনার প্রস্তুতিও চলছে।
কৃষিখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রতি বছর বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়লেও সেই অনুপাতে গড়ে ওঠেনি সংরক্ষণ অবকাঠামো। বিশেষ করে আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও মৌসুমি সবজির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কোল্ডস্টোরেজ না থাকায় বাজারে একসঙ্গে সরবরাহ বেড়ে যায়। এতে দাম কমে যায় এবং উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হয় কৃষকদের।
ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, দেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৯০ লাখ টন। এর বিপরীতে বিদ্যমান হিমাগারগুলোর ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৫ লাখ টন। সরকারি হিসাবে, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে মোট উৎপাদিত আলুর প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কেবল আলুই নয়, পেঁয়াজ ও অন্যান্য পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এই ঘাটতি মেটাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আগ্রহে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেয়। ‘আলুর বহুমুখী ব্যবহার, সংরক্ষণ ও বিপণন উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় রংপুর বিভাগসহ দেশের ১৬টি জেলায় ৪৫০টি ‘অহিমায়িত মডেল ঘর’ তৈরি করা হয়। সরকারি খরচে একেকটি ঘর নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় দেড় লাখ টাকা। গত অর্থবছর শুধু রংপুর জেলাতেই ৭৫টি অহিমায়িত মডেল ঘরের মধ্যে ৪৫টিতে আলু সংরক্ষণের পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় এই অহিমায়িত মডেল ঘরগুলো চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। ফলে এক হাজার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নতুন গুদাম ঘর ও চার হাজার পেঁয়াজ সংরক্ষণ মেশিন দ্রুত স্থাপন করা সম্ভব হলে তা দেশের কৃষি অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হতে পারে।