জন্ম যেখানে আজন্ম পাপ (২)
‘নিজেরাই পুষ্টিকর খাবার খাইতে পারি না, বাচ্চাগো খাওয়ামু কেমনে?’ অনেকটা আক্ষেপের সঙ্গে কথাটা বলছিলেন রাজধানীর কারওয়ান বাজারসংলগ্ন রেললাইনের দুপাশে গড়ে ওঠা বস্তির ঝুপড়ি ঘরের বাসিন্দা লাবনি আক্তার (২০)। তিনি বলেন, ‘বাসাবাড়িতে কাম কইরা পাঁচ হাজার টাকা পাই। তিনবেলা ভাতের লগে খাওনের লাইগা শাক-ভাজিই ঠিকমতো জোটে না, বাচ্চাগো পুষ্টির খাওন দিমু কেমনে?’
মিরপুরের ঝিলপাড় বস্তিতে স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকেন ময়না বেগম। আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় ময়না বেগম জানান, বাজারে জিনিসপত্রের যে দাম, তাতে পুষ্টিকর খাবার খাওয়াটা তাদের কাছে স্বপ্নের মতো। তার স্বামী মকবুল মিয়া ভ্যান চালান। তিনিই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। মকবুল মিয়া বলেন, যা আয় করি, তা দিয়ে বাচ্চাদের পুষ্টিকর খাবার দিতে পারি না। মাসে একবার একবেলা মাংস আর দুবেলা মাছ জোটে। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোয় থাকে ডিম, শাক, আলুভর্তা বা ভাজি।
লাবনি আক্তার, ময়না বেগমের পরিবারের মতো রাজধানীর সব বস্তিবাসীর জীবনের চিত্র একই।
বারডেম হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ বলেন, ‘শিশুর জন্মের প্রথম দুই বছরেই ৯৫ শতাংশ মেধার বিকাশ ঘটে। পুষ্টিহীনতার কারণে বস্তির শিশুদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবার গর্ভাবস্থায় মায়েরা পুষ্টিকর খাবার না পাওয়ায় তারা বিভিন্ন জটিলতায় ভোগেন।
শামসুন্নাহার নাহিদ আরো বলেন, পুষ্টিহীনতার কারণে সাধারণ শিশুদের তুলনায় বস্তির শিশুরা শারীরিক এবং মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। ফলে তারা মানসিক ও শারীরিকভাবে অপরিপক্ব হয়ে বেড়ে উঠছে। পুষ্টিহীনতার কারণে তাদের পরিপূর্ণ কার্যক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে। বস্তিবাসীদের জীবনে আর্থিক সংকট ও সচেতনতার অভাবে পুষ্টিহীনতার শিকার এসব শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কমে যাচ্ছে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, যা সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশুর ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি বলেও মনে করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী, রাজধানীতে প্রায় পাঁচ হাজার বস্তিতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের বাস, যাদের প্রায় ১৬ লাখই শিশু। এসব শিশুর বেশিরভাগই পুষ্টিহীনতায় ভুগছে।
আইসিডিডিআর,বির জুলাই মাসে করা এ গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বস্তিতে বাস করা ৫০ শতাংশ শিশু স্বাভাবিকের তুলনায় খর্বাকৃতির হয়। এদের ২৭ শতাংশের উচ্চতা কম এবং ২০ শতাংশের ওজন কম। এ কর্মসূচিতে বস্তির ৭২১ জন সন্তানসম্ভবা নারী, চার হাজার ২০০ কিশোরী এবং দুই বছরের কম বয়সি প্রায় দুই হাজার ৫০০ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত পরিবারগুলো নিয়ে বিশ্লেষণে উঠে আসে, প্রতিটি পরিবারের গড় আয় ২১ হাজার টাকা থাকা সত্ত্বেও প্রতি চারটি পরিবারের মধ্যে একটি পরিবার খাদ্য সংকটে ভোগে, সেখানে দরকারি পুষ্টি চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) অন্যতম একটি লক্ষ্য পুষ্টি। সেখানে বলা আছে, আমাদের শিশুদের খর্বাকৃতি ৪০ শতাংশ কমিয়ে আনতে হবে। পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের মধ্যে কৃশকায় হওয়ার হার ৫ শতাংশের কম হতে হবে। বাংলাদেশে এটি এখন আছে ১১ শতাংশ। আর ১৫ শতাংশ হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সেটাকে ‘জরুরি অবস্থা’ বলেছে। আমরা তা থেকে খুব বেশি পিছিয়ে নেই। শিশুর জন্মের পর থেকে তিন মাসের মধ্যে খর্বাকৃতির প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। সারা বিশ্বের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ায় খর্বাকৃতির হার বেশি।
পুষ্টি কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরা এখনো উচ্চমাত্রার পুষ্টিহীনতার শিকার। প্রাক-বিদ্যালয়ের শিশুদের রয়েছে ভিটামিন-এ ও জিঙ্কের অভাব এবং নারীরা আয়োডিনস্বল্পতায় ভুগছেন। শহরের বস্তিতে পুষ্টি পরিস্থিতি খুব নাজুক। গ্রামের অবস্থাও খুব ভালো নয়। বস্তির অধিকাংশ শিশু খর্বকায়। শিক্ষা অধিদপ্তরের স্কুল হেলথ কর্মসূচি আরো জোরদার করা প্রয়োজন। স্কুলে মিড ডে মিল চালু করলে শিশুদের শাকসবজিসহ পুষ্টিকর খাবারে অভ্যস্ত করে তোলা সম্ভব।
ইউনিসেফের জরিপের তথ্যমতে, স্কুলগামীদের এখনো ১৮ শতাংশ রোগা-পাতলা। দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, কমেছে দারিদ্র্যও। তার পরও জনসংখ্যার বড় একটি অংশ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, তারা রোগা-পাতলা। সুস্থ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী তৈরিতে পুষ্টিহীনতা মারাত্মক চ্যালেঞ্জ, যা খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। এক সময় খাদ্য নিরাপত্তার অর্থ ছিল জনসংখ্যা অনুপাতে যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য মজুত থাকা। কিন্তু বর্তমানে জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের সংজ্ঞানুসারে খাদ্য নিরাপত্তা হলো দেশের সব মানুষের জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর, পছন্দমাফিক ও প্রয়োজনীয় খাবার যথেষ্ট পরিমাণে প্রাপ্তির নিশ্চয়তা। অর্থাৎ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধার নিশ্চয়তা। ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশ এক্ষেত্রে বেশ পিছিয়ে।
বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফের পরিসংখ্যান বলছে, বস্তিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯০ শতাংশই পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবারের বাসস্থান এক কক্ষবিশিষ্ট। ফলে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাও বাধাগ্রস্ত হয়।
এ বৈষম্য কেবলমাত্র পরিসংখ্যান নয়; এর পেছনে আছে অপুষ্টি, অনিরাপদ প্রসব ও নবজাতকের ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের সূচনা। এ অবস্থায় বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সমন্বিত পদ্ধতি; যেখানে পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, সচেতনতা ও সামাজিক সহায়তা একসঙ্গে কাজ করবে।
জাতীয় পুষ্টি পরিষদের মহাপরিচালক ডা. রিজওয়ানুর রহমান বলেন, পুষ্টিহীনতা এখানে এক নীরব সংকট। বস্তিবাসীর অন্তত ৫২ শতাংশ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। শিশুদের প্রায় অর্ধেকই খর্বাকৃতির, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাহত করে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে নারীরা, বিশেষ করে সন্তানসম্ভবা মা ও কিশোরীরা। অথচ শহরে যেখানে ৫৩ শতাংশ নারী অন্তত চারবার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে প্রসবপূর্ব সেবা পান, বস্তিতে এ হার নেমে আসে ৪০ শতাংশে।
তিনি আরো বলেন, আমরা অনেক দিন ধরেই বস্তির শিশুদের পুষ্টি-সংকট সমাধানের চেষ্টা করছি। সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ, ন্যাশনাল নিউট্রিশন সার্ভিস এবং স্থানীয় সরকারের আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রজেক্টের মাধ্যমে মায়েদের পুষ্টি বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।
তিনি জানান, মাল্টিসেক্টরিয়াল আরবান নিউট্রিশন স্ট্র্যাটেজি (মুনস) অনুমোদন পেলে বস্তির শিশুদের পুরোপুরি পুষ্টি কর্মসূচির আওতায় আনা সম্ভব হবে।