হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

বোরো মৌসুমের শুরুতেই বিভিন্ন স্থানে সার সংকট

গাজী শাহনেওয়াজ

আমার দেশ গ্রাফিক্স

বোরো মৌসুমের শুরুতেই দেশজুড়ে সার সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী সার না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। ডিলারের কাছে গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে অনেক কৃষককে। কোথাও কোথাও সার না পেয়ে ডিলারের গুদামে হামলার অভিযোগ উঠেছে। এর আগে আমন মৌসুমেও সারের সংকটে গুদাম লুটের ঘটনা ঘটেছিল।

বিশেষ করে এ মৌসুমে সারের চাহিদা বেশি থাকে। এই সংকট মোকাবিলায় নভেম্বরের বরাদ্দ অক্টোবরেই ছাড় করে কৃষি মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কৃষকরা যাতে চাহিদা অনুযায়ী সার পান, সেজন্যই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর বাইরে চলতি মাসেই সারের অতিরিক্ত বরাদ্দ ছাড় করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। তবে, বরাদ্দ সারও চাহিদার তুলনায় কম। আবার সব জেলায় অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এসব কারণে সারের সংকট সহজে কাটছে না বলে জানিয়েছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।

অথচ কৃষি মন্ত্রণালয় সব সময় দাবি করে আসছে, দেশে সারের কোনো ঘাটতি বা সংকট নেই; পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। এরপরও মাঠপর্যায়ে সংকট কাটছে না।

সরকারি হিসাবে, ইউরিয়া সারের মজুত রয়েছে ৮,৪২৭ টন, টিএসপি ৩,০৪১ টন, ডিএপি ৮,৭৭৬ টন এবং এমওপি ৯,৩৪৩ টন। সৌদি আরব, রাশিয়া, মরক্কো ও কানাডা থেকে সার আমদানি করা হচ্ছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এদিকে, সারের এত মজুতের পরও ইতোমধ্যে উত্তরাঞ্চলের জেলা লালমনিরহাট,

গাইবান্ধা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ অনেক এলাকায় সার সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ডিলারদের গুদামে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও সার মিলছে না। এই সংকটের সুযোগ নিয়ে রাতের অন্ধকারে সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে সার পাচার হচ্ছে। সম্প্রতি পুলিশের অভিযানে প্রায় ৩০১ বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে।

কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, সার বিতরণে অনিয়ম পেলে সঙ্গে সঙ্গে ডিলারশিপ বাতিল করা হবে এবং এর সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, সার সংগ্রহ, মজুত ও বিতরণে কোনো ধরনের অনিয়ম বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া হবে না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের খাদ্যপণ্য উৎপাদনের মোট চাহিদার অধিকাংশই পূরণ হয় বোরো মৌসুমের আবাদ থেকে। ধান ছাড়াও আলু, ভুট্টা, গম, মসুর, ছোলা, সরিষা ও শীতকালীন সবজি উৎপাদনে সারের চাহিদা বেশি থাকে। কিন্তু কৃষকের আবাদের বিপরীতে সারের বরাদ্দ সে তুলনায় বাড়ানো হচ্ছে না। অতীতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে খুবই সীমিত হারে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে, যা চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত।

কৃষিবিদ গোলাম মোস্তফা এ প্রসঙ্গে আমার দেশকে বলেন, দেশের কৃষি ব্যবস্থাপনা এখনো মান্ধাতার আমলের আদলে চলছে। গতানুগতিক নিয়মে মাসিক সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। কৃষিজমি না বাড়লেও নতুন নতুন ক্ষেত্র বাড়ায় সারের চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু মাঠের বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী সরকার সার বরাদ্দ দিচ্ছে না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের জামালপুর গ্রামের কৃষক আলামিন জানান, ডিওপি সার এবার এক বস্তাও পাননি তিনি। ইউরিয়া দিয়ে কৃষি আবাদ শেষ করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমান মানুষজন যখন সার আনতে যায়, তখন ডিলাররা বলেন, অমুক দিন আসেন। পরে কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার দিতে পারে না। শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, নাচোল ও সদরে সারের জন্য হাহাকার চলছে।

চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়ার অভিযোগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় এক সার ডিলারের গোডাউনে হামলা চালিয়ে সার নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন একদল কৃষক। গত ১২ অক্টোবর দুপুরে উপজেলার মেসার্স একতা এন্টারপ্রাইজের গোডাউনে এ ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

নাটোরের নলডাঙ্গায় চাহিদামতো সার না পেয়ে ক্ষোভ ও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। গত ৫ নভেম্বর সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ডিলারের দোকানে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পাওয়া এবং বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে সেখানে হাতাহাতি ও চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

পরে বিশৃঙ্খলা ও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে দ্রুত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, বর্তমান বোরো ও রবি মৌসুমে জমিতে সারের চাহিদা তুঙ্গে। অথচ ডিলারের দোকানে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় এবং অনিয়মের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে তাদের। অনেকেই ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও সার পাননি, ফলে ব্যাহত হচ্ছে চাষাবাদ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ডিএইর উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ডিলারদের কাছ থেকে কৃষকরা সার নিয়ে যাচ্ছেন। এই সার তো অন্য কোথাও যাচ্ছে না। এক মাস পর যে ফসলের জন্য সার প্রয়োজন অনেক কৃষক এখন নিয়ে মজুত করার চেষ্টা করছেন। এ কারণে সার পাচ্ছে না এমন অভিযোগ উঠতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কৃষি উদ্যোক্তা অভিযোগ করেন, কৃষি কর্মকর্তাদের পরস্পর যোগসাজশে চাঁপাইনবাবগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে সারের সিন্ডিকেট চলে আসছে। এক্ষেত্রে প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে থাকে।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে সংকট দেখিয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে বিসিআইসি ডিলারদের বিরুদ্ধে। নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দিলে স্লিপ ছাড়াই সার মিলছে বলে অভিযোগ করেন কৃষকরা। এ বিষয়ে অভিযুক্ত ডিলার ও সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তারা সদুত্তর দিতে পারেননি।

মহাসড়ক অবরোধ কৃষকদের

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ার অভিযোগে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কৃষকরা। স্থানীয় কৃষক এনামুল হোসেন বলেন, আমার সারের চাহিদা ১০ বস্তা, দেওয়া হচ্ছে তিন বস্তা। খুচরা বাজারেও সার পাওয়া যাচ্ছে না। এখন আমরা চরম বিপদে পড়েছি।

তিনি বলেন, সরকারে কাছে আমাদের দাবি, রবি মৌসুমে যাতে সারের জন্য আমাদের ফসলের ক্ষতি না হয়, সেটা নিশ্চিত করেন। তিনি চার বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছেন বলে জানান।

হাতীবান্ধা বাজারের বিএডিসির ডিলার মেসার্স মিশু ট্রেডার্সের মালিক জরিপ উদ্দীন বলেন, যেসব কৃষক সার পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করছেন, ওগুলো ভুয়া। প্রকৃত একজন কৃষক সার পায়নি এই অভিযোগ কেউ দিতে পারবে না।

লালমনিরহাট ডিএইর উপপরিচালক ড. সাইখুল আরিফিন আমার দেশকে বলেন, সারের সমস্যা নেই। স্থানীয় দুজন ব্যক্তির (মেম্বার পদপ্রার্থী) মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে এবং আন্দোলন চাঙা করার জন্য কৃষকদের ব্যবহার করছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের একত্র করে সারের জন্য লাইনে দাঁড় করিয়ে দেন।

এদিকে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে সাগরপথে মিয়ানমারে পাচারের সময় ৩০১ বস্তা ইউরিয়া সারসহ দুটি ডাম্প ট্রাক জব্দ করেছে জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ। ১ নভেম্বর ভোরে ইছাখালী ইউনিয়নের মুহুরী প্রজেক্ট এলাকায় অভিযান চালিয়ে মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার সারের আনুমানিক বাজারমূল্য ৩ লাখ ৭৬ হাজার ২৫০ টাকা।

২৯ জেলায় হয়নি অতিরিক্ত বরাদ্দ

কৃষির এই ভরা মৌসুমে সারের সংকট কাটাতে চলতি মাসে কিছু জেলায় কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বলে জানা গেছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে মাত্র ৩৫টি জেলাকে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব জেলায় মোট ৭৯ হাজার ৪০০ টন সার বরাদ্দ করা হয়। তবে দেশের ২৯টি জেলা এ বরাদ্দের সুবিধা পাচ্ছে না। অতিরিক্ত বরাদ্দ না পাওয়া ২৯টি জেলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নাটোর, নওগাঁ, বাগেরহাট, শরীয়তপুর এবং সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলো।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা নিজ নিজ এলাকার ফসলের আবাদ ও চাহিদা অনুযায়ী অতিরিক্ত সারের চাহিদাপত্র তৈরি করে পাঠিয়েছিলেন। তবে বরাদ্দ বণ্টনে বৈষম্যের অভিযোগ ওঠায় বঞ্চিত জেলা ও উপজেলার কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। যদিও চাকরিগত জটিলতার আশঙ্কায় এ নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে চাননি।

চলতি নভেম্বরে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়ার পরও পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি বলে কয়েকটি জেলার কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

ডিএইর সার ব্যবস্থাপনা শাখার উপপরিচালক আমিনুল ইসলাম অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও কোন কোন জেলায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বা হয়নি, সে বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।

৬১০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি সশস্ত্র তিন সংগঠনের

আইসিজেতে রোহিঙ্গা গণহত্যার রায় ১৯ নভেম্বর

স্থানীয় ভোট ঘিরে দূরত্ব জামায়াত-এনসিপির

বেপরোয়া এমপিপুত্রকে ঘিরে চলছে তদন্ত

পরিবর্তন আসছে জামায়াতের দলীয় কাঠামোতে

অভিশংসনের মুখে পড়তে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

কারখানা ভাঙচুরের ভিডিও করায় পেটায় হামলাকারীরা

বিমানের অব্যবস্থাপনা নিয়ে সংসদীয় কমিটির ক্ষোভ

পাহাড় অস্থিতিশীল করার নীলনকশা

দেশকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা ছিল হাফিজের