হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

সম্প্রীতি ও সহনশীলতার নতুন সংস্কৃতি

ইসমাঈল হোসাইন সোহেল

ছবি: সংগৃহীত

সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ হয়েছে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। হাতেগোনা কয়েকটি আসনের ভোটের ফল নিয়ে বিতর্ক হলেও এবার প্রার্থীদের মধ্যে জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও রাজনীতির জন্য বেশ ইতিবাচক। একই সঙ্গে পরাজিত প্রার্থীদের বাসায় মিষ্টি নিয়ে হাজির হওয়া, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পরাজিত প্রার্থীদের পরামর্শে ‘আগামীর বাংলাদেশ’ গড়ার প্রতিশ্রুতি—এগুলো রাজনীতিতে একটি সম্প্রীতির বার্তা বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এটিকে জুলাই বিপ্লবের পর দেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন তারা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সঠিক পথেই পরিচালিত হবে।

গত রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর বসুন্ধরায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তার বাসায় যান বিএনপি চেয়ারম্যান ও দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে যাওয়া তারেক রহমান। এ সময় জামায়াত আমির তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এছাড়া বাসাটিতে পৌঁছলে শিশুরা তারেক রহমানকে দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। এ সময় তারেক রহমানও শিশুদের হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। সাক্ষাৎটি অত্যন্ত হৃদ্যতা ও সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় বলে জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়। পাশাপাশি নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং বিরোধী দলের কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যেকোনো হামলা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন বলেও আশ্বস্ত করেন তারেক রহমান। একই দিনে রাজধানীর বেইলী রোডে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় যান তারেক রহমান। এছাড়া গতকাল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে তার বাসায় যান তিনি।

অন্যদিকে ঢাকা-১৪ আসনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান শাহীনবাগে ধানের শীষের প্রার্থী সানজিদা তুলির বাড়িতে গিয়ে তার মায়ের দোয়া নেন। গুমের শিকার বিএনপি নেতা সাজেদুল হক সুমন তুলির ভাই। সাক্ষাৎকালে তার মা হাজেরা খাতুন আরমানকে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, তার ছেলে সুমনকে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। আরমানও আগে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুমের শিকার হন এবং ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর মুক্তি পান।

পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ ধানের শীষ প্রতীকের পরাজিত প্রার্থী শহিদুল আলম তালুকদারের বাসায় গিয়ে দোয়া নিয়েছেন। ১৩ ফেব্রুয়ারির এ ঘটনায় এলাকায় ইতিবাচক আলোচনার সৃষ্টি হয়। এ সময় শহিদুল আলম নবনির্বাচিত এমপির মাথায় হাত রেখে দোয়া করেন। পরে শফিকুল ইসলাম মাসুদ তার গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দেন এবং একপর্যায়ে একই মালায় উভয়ই আবদ্ধ হন।

এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম আলোচিত প্রার্থী ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির। সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নাছির উদ্দিন চৌধুরীর কাছে পরাজিত হন তিনি। পরে নাছিরের বাসায় গিয়ে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে মিষ্টি মুখ করান এবং অভিনন্দন জানান। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যক্তিগত আইডি থেকে বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানান তিনি। পরাজিত প্রার্থীর কাছ থেকে এমন বিরল সম্মান পেয়ে নাছির চৌধুরী জানান, জীবনের শেষ নির্বাচনে যে সম্মান দেখানো হয়েছে, তা তিনি কখনো ভুলব না।

রাজশাহী-৩ আসনে বিএনপির বিজয়ী প্রার্থীর উদারতাও রাজনীতির মাঠে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পবায় জামায়াতের পরাজিত প্রার্থী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদের বাসায় গিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিএনপির শফিকুল হক মিলন। গত শনিবারের এ ঘটনায় পরাজিত ও বিজয়ী প্রার্থী দুজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। পরে ফুলেল শুভেচ্ছা বিনিময় ও একে অপরকে মিষ্টিমুখ করান। পাশাপাশি তারা রাজশাহী-৩ আসনে রাজনৈতিক সম্প্রীতি বজায় রাখার পাশাপাশি জনগণের প্রত্যাশা ও এলাকার উন্নয়নে একে অপরকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

শুধু আরমান, শফিকুল ইসলাম মাসুদ, শিশির মনির কিংবা শফিকুল হক মিলনই নন, এবারের নির্বাচনের পর এ ধরনের উদাহরণ প্রচুর। নির্বাচনের মাঠে কাদা ছোড়াছুড়ির পরও পরাজয় মেনে নিয়ে সম্প্রীতির বাণী ছড়িয়ে দিয়েছেন অনেক প্রার্থী। এর মধ্যে আসন সমঝোতায় বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিক ও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে বিজয়ের ঘটনা অন্যতম। নির্বাচনের আগে ও প্রচারের সময় বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হাসান মামুন ও নুরের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা গেলেও ভোটের ফল মেনে নিয়ে নুরকে শুভেচ্ছা জানান মামুন।

গত দেড় দশকে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন সম্প্রীতির ঘটনাকে বিরল দৃষ্টান্ত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের ভোটবিহীন গত সাড়ে ১৫ বছরের সময়ে রাজনীতিতে এটি ছিল একেবারেই অনুপস্থিত।

রাজনীতিতে এ আমূল পরিবর্তন জুলাই বিপ্লবের ইতিবাচক ফল বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম সেলিম। তিনি বলেন, আমরা যে গণতন্ত্রের কথা বলি—এ গণতন্ত্রের মূল স্পিরিটই হচ্ছে অন্যের মতামতের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা দেখি—৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের একটা ধারা সূচিত হয়েছে। তিনি বলেন, এ দলগুলো কিন্তু আন্দোলনের মাঠেই ছিল। তাদের মধ্যে অনেক বাহাস হয়েছে, বিতর্ক হয়েছে, একে অন্যের সমালোচনা করছে; কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আমরা দেখলাম, ফলাফল ঘোষণার পর যারা বিজয়ী হয়েছেন ও বিজিত হয়েছেন তাদের মধ্যে ওই ধরনের হিংসাত্মক পন্থা বা পরাজয়ের বেদনা নিয়ে অন্যকে আক্রমণের বিষয়গুলো খুব একটা দেখা যায়নি। এটা দেশের রাজনীতিতে এক ধরনের ইতিবাচক ধারা। এ সহনশীল পরিবেশটা যদি বজায় থাকে, তাহলে আমরা দেশকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব। এটাই কিন্তু আমাদের দেশে অভাব ছিল।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, যেখানে গণতন্ত্র আছে, সেখানে রাজনীতিতে যতই মতবিরোধ থাকুক না কেন, তাদের একসঙ্গে কাজ করার একটা প্রবণতা থাকতে হয়। কারণ তারা যখন সংসদে আলোচনা করেন, তখন ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন না, ইস্যু নিয়ে কথা বলেন। এটা ভালো, এটা করব। তবে কেমন করে করব, সেটি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কাজেই তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত একটা সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক থাকাটা রাজনীতির সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচক। তারা এভাবে কাজ করবেন, এটা আমরা আশা করব।

রাজনীতির এ ধারা গুণগত কোনো পরিবর্তন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ আমার দেশকে বলেন, রাজনীতির এ বিষয়টি ঠিক পরিবর্তন কি না, তা বলা মুশকিল। তবে এটা বলতে পারি—তাৎক্ষণিকভাবে যা কিছু হচ্ছে এবং এটা যদি ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকে, এ ধরনের শুভেচ্ছা, সহনশীলতা ও হৃদ্যতা, তাহলে আমাদের রাজনীতিতে একটা সুস্থতা ফিরবে।

ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, আমরা আশা করব আগামী যে সংসদ গঠিত হবে, সে সংসদে ও সংসদের বাইরে সর্বত্র এ ধরনের একটা পরিবেশ থাকবে। কারণ গণতন্ত্রের মূলকথা হলো রুল অব মেজরিটি ইন দ্য কনসেন্ট অব মাইনরিটি, অর্থাৎ এটা সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন এবং সঙ্গে থাকতে হবে সংখ্যালঘিষ্ঠের সম্মতি। এ ভিত্তিতে যদি দেশ চলে, তাহলে দেশে কিছু ভালো কাজ হবে। দেশের ভবিষ্যৎ ভালো হবে। এখনকার যে সুবাতাস, সেটা কত দিন অব্যাহত থাকবে, সেটা সুনিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না, তবে যা হচ্ছে সেটা ভালো।

নতুন মন্ত্রী ও এমপিদের শপথ আজ

‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের প্রকৃত চিত্র

নতুন প্রধানমন্ত্রী উঠতে পারেন সরকারি বাসভবন যমুনায়

তরুণ ও নারী ভোটারের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মডেল ১২ ফেব্রুয়ারি

ভোট দিতে পেরে উচ্ছ্বসিত সবাই

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খোয়া যাওয়া অস্ত্র নিয়ে শঙ্কা

আপনার ভোট অন্য কেউ দিলে কী করবেন

দুটি ব্যালটই নিতে হবে, সিল না দিলেও ফেলতে হবে বাক্সে

নারী-তরুণরাই হবেন ভোটের ‘গেম চেঞ্জার’