তীব্র প্রশাসনিক স্থবিরতা ও সীমাহীন অনিয়মে গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট (নিমকো)। অতীতে প্রখ্যাত মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও দক্ষ প্রশাসকদের পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানটির সুনাম দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও এখন সেটা নিম্নমুখী। দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও সৃজনশীল মানবসম্পদ তৈরির এই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে চরম অদূরদর্শিতা, অপেশাদারিত্ব ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে।
প্রশিক্ষণার্থী, প্রশিক্ষক ও অংশীজনদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এবং একের পর এক নীতিবহির্ভূত সিদ্ধান্তের ফলে জাতীয় প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে।
নিমকোর একাধিক কর্মকর্তা ও প্রশিক্ষণে যুক্ত আন্তর্জাতিক একটি প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষক প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান বেহাল অবস্থা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু চাকরি হারানোর ভয়ে পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করেছেন তারা।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ওই সংস্থার জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষক আমার দেশকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক অবস্থা খুবই খারাপ। তাদের ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সব স্তরেই চরম বিশৃঙ্খলা। প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য উন্নতমানের যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার হয় না। অযত্ন আর অবহেলায় সেসব যন্ত্রপাতি ধ্বংসের পথে।’
একই কথা বলেছেন নিমকোর প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা এখন বেশ খারাপ। প্রশিক্ষণার্থী সংকট ছাড়াও বিশৃঙ্খল অবস্থার কারণে কর্মীদের মধ্যেও আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে।
প্রতিষ্ঠানটির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়াধীন নিমকোর মূল চালিকাশক্তি হলো প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। তবে বর্তমান প্রশাসনের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে এই কার্যক্রমে মারাত্মক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
আমার দেশ-এর হাতে আসা নিমকোর একাধিক নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিগত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৫০ শতাংশ অনুমোদিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে। দপ্তর বা মাঠপর্যায় থেকে প্রশিক্ষণার্থী না পাওয়ার ঠুনকো অজুহাত দেখিয়ে এবং পেশাগত অদক্ষতা ঢাকতে মন্ত্রণালয়ে ভুল বার্তা পাঠিয়ে কোর্স সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে।
নিমকোর মূল কাজ গণমাধ্যমকর্মীদের সৃজনশীল প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত ‘টোটাল কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট’ সেশন চালুর নামে প্রতিষ্ঠানটি থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিয়াম, নাডা বা পিএটিসির মতো ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে এসব বিষয় পড়ানোর কথা থাকলেও নিমকোর মহাপরিচালক (ডিজি) নিজেই অনুমোদনকারী হিসেবে সব কোর্সে ক্লাস নিয়ে মোটা অঙ্কের সম্মানী তুলেছেন।
আমার দেশ-এর হাতে আসা নথিতে দেখা গেছে, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের ডিজি মুহম্মদ হিরুজ্জামান ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, কর্মশালা/সেমিনার এবং অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ বাবদ প্রায় ছয় লাখ টাকা সম্মানী নিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সাংবাদিকদের জন্য বরাদ্দকৃত ও অনুমোদিত ৫০ লাখ টাকার পুরস্কারের বাজেটও বাদ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে প্রকাশনা এবং সফটওয়্যারসংক্রান্ত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্পের সব কার্যক্রম।
তারা জানান, এ কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিমকো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। মনোনীত প্রশিক্ষণার্থীরাও লিখিতভাবে অংশ নিতে অপারগতা প্রকাশ করছেন। লজিস্টিক ও বাজেট সংকটের কারণে ফাইনাল পরীক্ষার প্রোডাকশন শুটিং পর্যন্ত ব্যাহত হচ্ছে। গুণী প্রশিক্ষকরা তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
খোলা জায়গায় শুটিংভ্যান-যন্ত্রপাতি
প্রতিষ্ঠানের ভৌত সম্পদ ও মূল্যবান যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণে চরম উদাসীনতা ও অবহেলার প্রমাণ মিলেছে। কোরিয়ান অনুদানে এসআইবিই-নিমকো প্রকল্পের আওতায় স্টুডিও যন্ত্রপাতি, মিডিয়া অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং একটি আধুনিক শুটিংভ্যানসহ কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি অনুদান হিসেবে পাওয়া যায়। গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর কোরিয়ান প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে শুটিংভ্যানটি হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত ভ্যানটি বিআরটিএর নিবন্ধন করা হয়নি।
যথাযথ উদ্যোগের অভাবে আরো অনুদান সংগ্রহের যোগাযোগ মুখ থুবড়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।
সরেজমিন দেখা গেছে, কোটি টাকা মূল্যের আধুনিক ভ্যানটি এক দিনের জন্যও ব্যবহার না করে মূল গেটের পাশে খোলা আকাশের নিচে অযত্নে ফেলে রাখা হয়েছে, যা প্রায় নষ্ট হওয়ার উপক্রম। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ সাবস্টেশন ও লিফট অকেজো থাকায় প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রায়ই মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে।
সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে যুক্ত আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সঙ্গে সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে প্রশিক্ষণ ও প্রশাসন সম্পর্কে যথাযথ অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা নেইÑএমন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ায় বড় ধরনের যোগাযোগ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভীতি ছড়াতে গত দুই মাসে অন্তত ২০টি কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিস দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির ডিজিকে বার্তা পাঠানো হলেও সাড়া মেলেনি।