হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

হাসিনার জালিয়াতির তিন নির্বাচন

হাসান আদিল

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমে নিজের অধীনে নির্বাচন করে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করেছিলেন। অভিনব কায়দায় জালিয়াতির মাধ্যমে আয়োজন করেন সর্বশেষ তিনটি সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে দলীয় যন্ত্রে পরিণত করে প্রহসনমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে হরণ করেছিলেন জনগণের ভোটাধিকার। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের মতে, বিগত তিনটি নির্বাচনে কারচুপির মাত্রা ও ব্যাপ্তি ছিল বিস্ময় সৃষ্টিকারী। ওই তিনটি নির্বাচনকে ‘সুপরিকল্পিত ও সাজানো নাটক’ হিসেবে অভিহিত করে জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন বলেছে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।

উচ্চ আদালতের রায়ের ‘অজুহাত’ দেখিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দলীয় সরকারের অধীনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেন শেখ হাসিনা। জনগণকে ধোঁকা দিতে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী কয়েকটি দলের প্রতিনিধিদের মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়ে নির্বাচনের সময়কালকে কথিত ‘নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার’ হিসেবে প্রচারণা চালানো হয়েছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচন বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো বর্জন করে। ওই নির্বাচনে নজিরবিহীনভাবে ১৫৩ আসনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটভুক্ত দলগুলোর প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। সেটি ‘বিনাভোটের নির্বাচন’ তকমা পায়।

নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুসারে, ওই নির্বাচনে ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ১৬৭ ভোটারের মধ্যে ১৫৩ আসনে চার কোটি ৮০ লাখ ২১ হাজার ৯৮৩ ভোটারের ভোট দেওয়ার সুযোগই ছিল না। ভোটার এলাকার প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার কারণে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনারও ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল না। বাকি ১৪৭ আসনের চার কোটি ৩৯ লাখ ৪৩ হাজার ১৮৪ ভোটারের মধ্যে ৬০ শতাংশ ভোটার ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। সেবার আওয়ামী লীগ, তাদের সহযোগীসহ মাত্র ১২টি দল অংশ নিয়ে সরকার গঠন করে। শেখ হাসিনা সরকারের আজ্ঞাবাহী তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের সিইসি ছিলেন কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। তার আমলে চারটি সিটি করপোরেশন ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোও ছিল বিতর্কিত। তবে তাতে তার অনুশোচনা দেখা যায়নি। বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া দোষের কিছু নয়, আইনে আছে। আর কেউ মাঠ ছেড়ে দিলে তো প্রতিপক্ষ গোল দেবেই। এটা রাজনীতির খেলা।’

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক হামলা-মামলাসহ বড় ধরনের ভোট জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। ওই নির্বাচনে ভোটের আগের রাতেই নৌকা প্রতীকে সিল মেরে ব্যালটবক্স ভর্তি করে রাখা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে অভিনব জালিয়াতির ওই ভোটটি ‘নিশি রাতের ভোট’ নামে দেশে-বিদেশে সর্বাধিক পরিচিতি পায়।

নির্বাচনে অনিয়মের বিষয়ে তখনকার কেএম নূরুল হুদা কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো কমিশন ঘটনার ধামাচাপা দেয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক না হওয়ায় নির্বাচনের ফলাফলও ছিল একতরফা। নির্বাচনে ২৯৯ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট পায় ২৮৮ আসন। অপরদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট পায় মাত্র আটটি আসন। ভোটের কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলেও অনেক অসঙ্গতি দেখা যায়, নির্বাচনে অস্বাভাবিক হারে ভোট পড়ে। ওই নির্বাচনে ১০৩ আসনের ২১৩ ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ে। অর্থাৎ এসব কেন্দ্রের আওতাভুক্ত এলাকায় মৃত ও প্রবাসীরাও ভোট দেন। এক হাজার ২০৫ কেন্দ্রে ভোট পড়ে ৯৬ থেকে ৯৯ শতাংশ, যা ছিল অস্বাভাবিক। ৭৫ আসনের ৫৮৭ কেন্দ্রের সব ভোট কেবল একজন করে প্রার্থী পেয়েছিল। অন্য কোনো প্রার্থী একটি ভোটও পাননি। এর মধ্যে ৫৮৬ কেন্দ্রের সব ভোট পেয়েছিল নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা।

হুদা কমিশন জনমতের বিরোধিতার পরও সংসদ নির্বাচনে ইভিএম চালু করে। ওই সময় তড়িঘড়ি করে ইভিএম কেনার নামে তিন হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়। ওই কমিশন হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের অজুহাত দেখিয়ে একতরফাভাবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করেছিল।

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হাসিনা সরকারের অধীনে তৃতীয় নির্বাচনটি ‘আমি-ডামি ভোটের’ খেতাব পেয়েছিল। কৃত্রিমভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ আনতে আওয়ামী লীগ তার শরিক দল ও বিদ্রোহীদের দিয়ে এই নির্বাচন আয়োজন করে। সে সময় ৪৪ নিবন্ধিত দলের মধ্যে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল ২৮ দল। বিএনপিসহ ১৬ দল ওই নির্বাচন বর্জন করে। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর বেশিরভাগই ছিল নামসর্বস্ব ও আওয়ামী সরকারের আজ্ঞাবহ। বড় বড় দলগুলোর বর্জনের ‍মুখে আওয়ামী লীগের দলীয় ও একই দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচন হয়।

আওয়ামী লীগ দলীয় গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে কৃত্রিমভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ আনতে তার জোটসঙ্গী এবং সহযোগীদের জন্য দলের সবাইকে নির্বাচনের প্রার্থী হওয়ার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। তখন নির্বাচনটা হয়ে ওঠে নৌকা প্রতীক এবং নৌকা প্রতীক ছাড়া ভিন্ন কোনো প্রতীকে আওয়ামী লীগ, তার জোট এবং সহযোগীদের পাতানো খেলায়, যা আইনের দৃষ্টিতে কোনো নির্বাচনই ছিল না।

নির্বাচনে ভোটের হার নিয়েও বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়। ভোটের দিন বেলা ৩টা পর্যন্ত ২৭ দশমিক ১৫ ভাগ ভোট পড়ে বলে জানানো হলেও ১ ঘণ্টার ব্যবধানে ভোটের হার ৪০ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়। অবশ্য ভোটের হার ঘোষণার সময় সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল প্রথমে ২৮ শতাংশ ভোট পড়ার কথা বলে পরে তা সংশোধন করে ৪০ শতাংশের কথা বলেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২২৪ আসনে জয়লাভ করে। বাংলাদেশের সব রেকর্ড ভেঙে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৬২ আসনে জয়ী হয়। স্বতন্ত্রদের সবাই ছিল আওয়ামী লীগ সমর্থিত।

ওই তিন বিতর্কিত নির্বাচনের বিষয়ে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন তার প্রতিবেদনে বলেছে, তিনটি নির্বাচনে যে মাত্রায় এবং ব্যাপ্তিতে কারচুপি হয়েছে সেটা এই দেশের তো বটেই, বৈশ্বিক মানদণ্ডেও বিস্ময় সৃষ্টিকারী, যার পরিণতিও হয়ে দাঁড়ায় প্রলয়ঙ্কারী।

গত তিনটি নির্বাচনের অনিয়ম তদন্তে গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তে অভিনব পরিকল্পনায় ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা হয়েছিল। ওইসব নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গী ছিল তৎকালীন তিন নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, পুলিশ এবং সশস্ত্র বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার একাংশ। ওই সময় কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে ওঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, আওয়ামী লীগের অধীনে ওই তিনটি নির্বাচন আয়োজন করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। নির্বাচনি কৌশল নির্ধারণ এবং নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও সশস্ত্র বাহিনী মনোনীত একটি অংশকে ব্যবহার করা হয়।

বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য থাকবে বিশেষ নিরাপত্তা

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে মিলবে যেসব সুফল

৪৩ জেলায় ৭০০০ কিমি ঘুরে নির্বাচনি প্রচার জামায়াত আমিরের

১৯ দিনে তারেক রহমানের ৪৩ জনসভা

ভোট ডাকাতির পথপ্রদর্শক শেখ মুজিব

ঘরে বসেই যেভাবে জানবেন ভোটকেন্দ্র ও বুথের তথ্য

দুবার সংসদ নির্বাচন হয়েছিল যে বছর

কেমন ছিল ১২টি সংসদ নির্বাচন

ফল প্রকাশে নানা প্রস্তুতি ইসির স্বচ্ছতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম