দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদ। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সেখানে গিয়ে আইন প্রণয়ন ও পরিবর্তনসহ জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলে থাকেন। ব্যাপক ব্যয়বহুল প্রতিটি অধিবেশনে সময় মেপে বক্তব্য রাখার সুযোগ পান সংসদ সদস্যরা। এক্ষেত্রে কার্যপ্রণালি-বিধিসহ নানা নিয়ম-কানুন মানতে হয় তাদের। তবে বিভিন্ন সময়ে অনেক এমপিকে চরম বেফাঁস ও অপ্রয়োজনীয় বক্তব্য দিতে শোনা গেছে।
বিগত বিভিন্ন সংসদের ধারাবাহিকতায় চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদেও এ চিত্র দেখা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে এই সংসদে সরকারি ও বিরোধীদলের কিছু এমপির বেফাঁস কথার যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। তাদের একের পর এক অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যে ব্যক্তিগত ও সংসদের মান-মর্যাদাহানির মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সময়। অথচ সময়স্বল্পতার কারণে জনগুরুত্বপূর্ণ অনেক ইস্যুতে কথা বলার সুযোগ হারাচ্ছেন তারা।
এবার অনেক এমপিই নতুন ও ব্যতিক্রমী এই সংসদে মন খুলে কথা বলার সুযোগ পাওয়ায় বেফাঁস কিছু কথা বেরিয়ে আসছে বলে কেউ কেউ মনে করছেন। তবে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এবারের সংসদ অনেক প্রাণবন্ত বলেও দাবি করছেন তারা। এ ক্ষেত্রে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন, এমপি ও সংসদের মান-মর্যাদা রক্ষায় বিতর্কিত বক্তব্য এড়িয়ে কার্যপ্রণালি বিধি মানাসহ প্রয়োজনীয় স্টাডি করে অধিবেশনে আসার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্রমতে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে জাতীয় সংসদকে চরম বিতর্কিত করা হয়। সে সময় সংসদের প্রতি সাধারণ মনুষের আস্থা অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নিয়ে তাই মানুষের নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি হয় । নানা কারণে ব্যতিক্রমধর্মী এই সংসদের যাত্রাটাও বেশ সফলভাবেই হয়েছে।
গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ভাষণে বলেছিলেন— জাতীয় সংসদকে তিনি সব যুক্তিতর্ক এবং জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চান।
অপরদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, নবগঠিত সংসদ একটি গতিশীল, প্রাণবন্ত ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, যা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করবে। তিনি বলেন, সংসদীয় আলোচনায় ব্যক্তিগত আক্রমণ বা চরিত্র হননের পরিবর্তে জনগণের কল্যাণমূলক বিষয়গুলো প্রাধান্য পাওয়া উচিত।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে সংসদকে প্রাণবন্ত রাখার চেষ্টা করেন। বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধী দলের সরব ভূমিকায় বেশ উত্তাপ ছড়িয়ে ৩০ এপ্রিল শেষ হয় প্রথম অধিবেশন।
তবে গত ৭ এপ্রিল শুরু হওয়া দ্বিতীয় অধিবেশনে (বাজেট অধিবেশন) এসে সেই উত্তাপের মাত্রা মোড় নিয়েছে ভিন্ন দিকে। এমপিদের নানা বক্তব্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হচ্ছে। বাজেটের ওপর বক্তৃতা দিতে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে সময় ব্যয় করছেন কেউ কেউ। তাদের আপত্তিকর কথাগুলো এক্সপাঞ্জ করতে হচ্ছে স্পিকারকে। এমনকি স্পিকারের বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ সংসদ অধিবেশনে প্রতি মিনিটে দুই লাখ ৭২ হাজার টাকা খরচ হয় বলে জানা গেছে।
সংসদ অধিবেশনে এমপিদের বেফাঁস কথা প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্থার কমিশনের প্রধান ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জাতীয় সংসদে সদস্যরা যে ধরনের নিম্নমানের কথাবার্তা বলেন, তা মর্যাদাহানিকর। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার বার্তা দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রস্থল জাতীয় সংসদে যারা নির্বাচিত হয়ে আসেন, তারা যদি সে ধরনের আচরণ না করেন, তাহলে নিজেদের মর্যাদাহানির পাশাপাশি সংসদকেও নেতিবাচক ধারণায় ফেলবেন। এটা পরিবর্তন হওয়া দরকার। সংসদের পদের গুরুত্ব বিবেচনা করে তাদের সে ধরনের আচরণ করা উচিত। সংসদে বক্তব্যের ক্ষেত্রে কার্যপ্রণালী-বিধি মানাসহ স্টাডি করে আসার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদার আরো বলেন, নির্বাচিতদের অনেকেই সংসদীয় কাজে আগ্রহী নন। তারা স্থানীয় উন্নয়ন কাজে আগ্রহী, যা সংবিধান পরিপন্থী। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ভিন্ন। তাই ভবিষ্যতে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার ব্যাপারেও মনে রাখতে হবে যে, যারা আইন প্রণয়ন ও নীতি-নির্ধারণী কাজে আগ্রহীদের যেন মনোনয়ন দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব আছে। আর এটা খেয়াল রাখলে দক্ষ ও সংসদীয় কাজে আগ্রহীরাই মনোনয়নের সুযোগ পাবেন।
মামুনুল হককে নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য এক্সপাঞ্জ
সূত্রমতে, গত ১৮ জুন বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে অপ্রাসঙ্গিকভাবে পতিত আওয়ামী লীগ আমলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের রিসোর্টে যাওয়ার একটি ঘটনা তুলে ধরেন ঢাকা-১ আসনের সরকারদলীয় এমপি খোন্দকার আবু আশফাক। তিনি তার ‘মুতা বিয়ে’ সম্পর্কে জানতে চান। সংসদের বাইরের এক ব্যক্তিকে নিয়ে এ ধরনের বক্তব্যের একপর্যায়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রধানমন্ত্রী ইশারা দিলে তিনি প্রসঙ্গ পরিবর্তন করেন। যদিও এ নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের বিতর্ক ও অনুরোধের পর বক্তব্যটি এক্সপাঞ্জ করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
এ সময় এমপি আশফাককে স্পিকার বলেন, অপ্রাসঙ্গিক কোনো বিষয় বক্তব্যে না আনাই ভালো। তবে তিনি মুতা বিয়ে সম্পর্কে যে বর্ণনা দেন তা নিয়ে নতুন বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এ প্রসঙ্গে বিরোধী দলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের স্পিকারকে উদ্দেশ করে বলেন, মামুনুল হকের বিষয়ে যে তথ্য দিয়েছেন, এটা একেবারেই ভুল তথ্য। উনি মুতা বিয়ে করেননি। উনি বিয়ে করেছিলেন, এটা স্টাবলিশ। বিয়ে করা জায়েজ। বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার অনুরোধ করেন তিনি।
একইভাবে বক্তব্যটি এক্সপাঞ্জ করার অনুরোধ করেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম। তখন স্পিকার বলেন, মাওলানা মামুনুল হকের এ বিষয়টি সংসদের কার্যবিবরণীতে আসার প্রয়োজন নেই। তাছাড়া এখনো কিন্তু তিনি (মামুনুল হক) তার অবস্থান পরিষ্কার করেননি। একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনের অন্ধকার অংশ এখানে আলোচিত হোক চাই না।
এদিকে সংসদে মামুনুল হককে নিয়ে বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায় তার দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। এই বক্তব্যের প্রতিবাদে দলটি রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশও করে।
নিজের বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করলেন স্পিকার
মামুনুল হকের ‘কথিত পরকীয়া’ বিষয়ে সংসদে বিএনপির এমপি আবু আশফাকের দেওয়া বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনের ‘অন্ধকার অংশ’ নিয়ে নিজের মন্তব্যও কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে এ কথা বলেন স্পিকার।
তিনি বলেন, যেহেতু যার পক্ষে সংসদে এসে আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ নেই, তার সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করা অনুচিত। তাই আবু আশফাকের বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করেছি।
তিনি বলেন, আমারও একটি বক্তব্য উল্লেখ করেছিলাম— বলেছিলাম কোনো ব্যক্তির জীবনের অন্ধকার অধ্যায় সম্পর্কে আমার বক্তব্যে এসেছিল। সে অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায়, এটিকেও এক্সপাঞ্জ করা হলো।
ভবিষ্যতে বাজেট বক্তব্যসহ অন্যান্য বক্তৃতায় সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে স্পিকার বলেন, যার পক্ষে এখানে এসে নিজেকে ডিফেন্ড করা সম্ভব নয়, তার উদ্দেশে কোনো বিরূপ মন্তব্য আপনারা করবেন না, এটাই আশা করি।
বাবাকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা দাবি নিয়ে বিতর্ক
বাজেট অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে নিজের জীবিত বাবাকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বলে উল্লেখ করেন নীলফামারী–৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনে জামায়াতের এমপি আব্দুল মুনতাকিম। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার পর ওই বক্তব্যের জন্য ভুল স্বীকার করেন তিনি। বক্তব্য সংশোধনের জন্য তিনি স্পিকারকে চিঠিও দেন বলে জানা গেছে।
গত ১৪ জুন বক্তব্যে আব্দুল মুনতাকিম দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধে তার পরিবারের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আছে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা, আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা (বাবা–চাচা) সাত ভাই, চারজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা ১৯ জন, ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। আমি জুলাই যোদ্ধা।’ এ নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের পর সৈয়দপুর উপজেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল— এটা এমপির ‘স্লিপ অব টাং’। বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখাই ভালো।
ঋণখেলাপি নিয়ে বক্তব্য এক্সপাঞ্জ দাবি
গত ১৮ জুন প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে স্বতন্ত্র এমপি রুমিন ফারহানার বক্তব্যে এবারের সংসদকে ‘ঋণ খেলাপির সংসদ’ আখ্যা দেওয়া নিয়ে সরকারি ও বিরোধীদলের সদস্যদের মাঝে বেশ বিতর্ক হয়। সরকারি দলের সদস্য ফজলুল হক মিলন দাবি করেন, এখানে (সংসদে) কেউ ঋণখেলাপি নেই। শব্দটি এক্সপাঞ্জ করা হোক। তখন ডেপুটি স্পিকার বলেন, বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও একইভাবে বলেন, এখানে কেউ ঋণখেলাপি না, তবে ঋণগ্রস্ত হতে পারেন। এ সময় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, সার্বভৌম সংসদে ঋণখেলাপিদের ঋণখেলাপি বলতে না পারলে কোথায় বলবেন? পরে রুমিন ফারহানা তার বক্তব্যের পক্ষে ফের যুক্তি তুলে ধরেন।
ওয়াশিং মেশিন-ওভেন চাওয়া নিয়ে বিতর্ক
গত ১৭ জুন বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্যদের বরাদ্দ দেওয়া ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও পর্দা দেওয়ার দাবি জানান চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের জামায়াতের এমপি মিজানুর রহমান। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পরদিন সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দেওয়া বক্তব্যে এমপি মিজানুর রহমানকে মাইক্রোওভেন দিতে চান বিজেপির এমপি আন্দালিভ রহমান পার্থ। একই সঙ্গে তিনি ওই সদস্যের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ওয়াশিং মেশিন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পর্দা দেওয়ার অনুরোধও জানান। এ নিয়েও বিতর্ক বাড়ে।
পার্থের এই বক্তব্যের পর পাল্টা প্রশ্ন রেখে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘ওনার কাছে চাইছে নাকি?’ আমাদের মানসিকতাগুলো এমন হওয়া উচিত, এখানে দাঁড়িয়ে কারও সম্মানে আঘাত করব না।
পার্থের বক্তব্যের বিষয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বিষয়টি পয়েন্ট অব অর্ডারের মধ্যে পড়ে না। বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক না বাড়ানোরও আহ্বান জানান তিনি।
স্পিকার আরো বলেন, বাজেট আলোচনায় অনেক বিষয়ে বক্তব্য রাখা যায়। একজন সদস্য তার সুবিধা-অসুবিধার কথা বলেছেন। তিনি নিজের জন্য চাননি। তবে এটা সংসদে না বললেও হতো। কিন্তু এটা বলে বিরোধী দলের ওই সদস্য কোনো গর্হিত অপরাধ করেননি।
চেয়ার নিয়ে অভিযোগ
১৭ জুন পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষের চেয়ার নিয়ে অভিযোগ করেন বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিন ফারুক। তিনি বলেন, চেয়ারগুলোর পেছনের পিন খোলা থাকায় সংসদ সদস্যদের হাত কেটে যাচ্ছে। চেয়ারগুলোর ওজন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, এখানে ৩০০টির বেশি চেয়ার আছে। এ চেয়ারগুলোর পেছনে গ্যাপ তিন ইঞ্চি। যখন এখানে বসা হয়, তখন গ্যাপটা পূরণের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। অনেক তরুণ এমপিও বসতে পারেন না। তবে সংসদে এ ধরনের প্রসঙ্গে আলোচনা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বেশ সমালোচনা করতে দেখা যায়।
পর্দা নিয়ে ‘আপত্তিকর’ বক্তব্য
জামায়াতের সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক নিয়ে সরকারদলীয় এমপি মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্য নিয়ে সংসদে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়ায়। এমনকি বিষয়টিকে ফরজ বিধানের অবমাননা আখ্যায়িত করে সংসদের বাইরেও ধর্মীয় দলগুলো তীব্র প্রতিবাদ করে।
গত ১৪ জুন মনিরুল হক চৌধুরী তার বক্তব্যের একপর্যায়ে বিরোধীদলীয় নারী এমপিদের ইঙ্গিত করে বলেন, ‘…কিন্তু বুঝলাম না তো কারা আপনারা?’ তার এমন মন্তব্যে বিরোধী দলের সব সংসদ সদস্য সংসদে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করলে সংসদ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিষয়টি নিয়ে কয়েক মিনিটের জন্য সংসদের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে।
এ সময় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে মনিরুল হক চৌধুরীর মন্তব্যটি এক্সপাঞ্জ করলে উত্তেজনা প্রশমিত হয়। পরে অবশ্য বিরোধীদলীয় হুইপ নাহিদ ইসলাম পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বলেন, সংসদে বিরোধী দলের নারী এমপিদের পোশাক নিয়ে যে ধরনের কথা বললেন, তা অমার্জনীয় অপরাধ। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে এই বক্তব্য একটি বর্ণবাদী আচরণ।
পরে মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, এ পরিস্থিতি আমি প্রত্যাশা করিনি। যদি আমার কোনো বক্তব্যে আকার-ইঙ্গিতে কারো লেগে থাকে, তাহলে অবশ্যই এক্সপাঞ্জ করার অনুরোধ করব। আমার মনে হয় ওনারা ভুল বুঝেছেন।
ইংরেজি-বাংলা মিশ্রিত বক্তব্য
গত ১৬ জুন বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য জীবা আমিন খান বাংলা ও ইংরেজির মিশ্রণে একটি বক্তব্য দেন। দেশের কাঁচা রাস্তা ও ভাঙাচোরা সড়ক নিয়ে বিরোধী দলের এক সদস্যের সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সিক্সটিন হানড্রেড মাইল অফ কাঁচা রাস্তা। দ্য রাস্তাস আর ভেরি ভেরি ব্যাড সিচুয়েশন, দিস ইজ ডিউ টু দুর্নীতি। দ্যাট ইউ হ্যাভ সিন, ফ্রম দ্য প্রিভিয়াস রিজিম।’ তার এই ব্যাকরণগতভাবে ভুল ও মিশ্র ভাষারীতির ১১ মিনিটের বক্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মাঝে ব্যাপক হাস্যরসের সৃষ্টি হয়।
চানাচুরের পুষ্টিগুণ নিয়ে বক্তব্য
চানাচুরের পুষ্টিগুণ তুলে ধরেছেন গাইবান্ধা-৪ আসনের এমপি মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন। গত ১৪ জুন বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি চানাচুরের পুষ্টিগুণ বর্ণনা করেন। তিনি মূলত, বিরোধী দলকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘উজিরে খামাখা একজন ছিলেন, তার সঙ্গে টকশো করতে গিয়ে শুনলাম আট লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকার ছায়া বাজেট করেছেন।’
বাজেট নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে মোহাম্মদ শামীম কায়সার বলেন, বাজেটে চানাচুরের পুষ্টিগুণ জানা সম্পর্কে একটা কমিটি যদি করার জন্য বরাদ্দ রাখা হতো, তাহলে খুব ভালো হতো। চানাচুরের ডিব্বা না চানাচুরের পুষ্টিগুণ। আমি দেখলাম যে, নরমাল গুণ যদি আমরা একটু সার্চ করে থাকি তাহলেই পেয়ে যাচ্ছি চানাচুরের কিছু পুষ্টিগুণ আছে। যে কেউ খুঁজলে পাবেন, ক্যালরি প্রায় ৫০০-৫৫০ কিলোক্যালরি, ফ্যাট আছে ৩৫ গ্রাম, প্রোটিন ১০ গ্রাম, ফাইবার ৫ গ্রাম। সোডিয়াম ৮০০ মিলিগ্রাম, প্রতি ১০০ গ্রাম চানাচুরের মধ্যে।
তিনি বলেন, ‘এটা বলার কারণ হলো বাজেটটা নাকি চানাচুরের মতো খেতে ভালো লাগে কিন্তু কোনো পুষ্টিগুণ নেই। তো বিষয়টা আসলে এরকম নয়।’
এর আগে প্রস্তাবিত বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, এই বাজেট দেখতে সুন্দর এবং সাময়িকভাবে আকর্ষণীয় বা খেতে ভালো হলেও এতে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের মতো প্রয়োজনীয় কোনো ‘পুষ্টিগুণ’ নেই।
‘অশ্লীল’ উপমা দেওয়া বক্তব্য এক্সপাঞ্জ
গত ১৬ জুন নীলফামারী-১ আসনে জামায়াতের এমপি মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার তার বাজেট নিয়ে আলোচনায় উদাহরণ হিসেবে চালুনি ও সুচের কথোপকথন তুলে ধরেন। এতে কিছু অংশকে ‘অরুচিকর ও অশ্লীল’ উল্লেখ করে তা কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ করার নির্দেশ দেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে সংসদের রীতিনীতি মেনে চলার বিষয়ে সংসদ সদস্যদের সতর্ক করেন তিনি।
মুক্তিযোদ্ধাদের জামায়াত করা নিয়ে বক্তব্য
এর আগে প্রথম অধিবেশনে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক ছড়ায়। তিনি বলেছিলেন— মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য জামায়াত করতে পারে না, যদি কেউ করে সেটা ‘ডাবল অপরাধ’।
এই বক্তব্য নিয়ে সংসদে উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ কাউকে নিবৃত্ত করতে পারছিলেন না। তিনি একপর্যায়ে দাঁড়িয়ে যান। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে স্পিকার সরকারি ও বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, সারা জাতি দেখছে। সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে। সংসদ যদি বিধি মোতাবেক না চলে, তাহলে এই সংসদ আর থাকবে না।
সদস্যদের কর্মকাণ্ডে শিশুরাও লজ্জা পাবে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, যারা এরই মধ্যে দাদা হয়ে গিয়েছেন, তাদের নাতিরা হয়তো এখানে গ্যালারিতে বসে দেখছেন। তারা কী ভাববে এ সম্পর্কে?
এছাড়া চলতি ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম ও চলতি অধিবেশনে দেশের জাতীয় ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুর পাশাপাশি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সরকারি ও বিরোধীদলীয় সিনিয়র সদস্যদের নানা বিতর্কিত বক্তব্যে সংসদে ও বাইরে উত্তাপ ছড়াচ্ছে বলে জানা গেছে।
সরকারি ও বিরোধীদলীয় এমপিদের মন্তব্য
সংসদে বেফাঁস ও বিতর্কিত কথাবার্তা প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় হুইপ ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান আমার দেশকে বলেন, সংসদকে প্রাণবন্ত ও কার্যকর রাখার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু তারা অপ্রাসঙ্গিক ও অতিরিক্ত কথা বলে সংসদে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করছে। অনেক সময় অতিরিক্ত দলীয় কর্মসূচি নিয়ে সংসদে হাজির হচ্ছে। যেমন ব্যাংকলুটকারী এস আলমের পক্ষে তারা বক্তব্য দিয়েছেন। আমরা সংসদকে সুষ্ঠু ও সচল রাখার দাবি জানাই।
বিভিন্ন বক্তব্য এক্সপাঞ্জ হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারি দলের এমপিদের অনেক বক্তব্য এক্সপাঞ্জ হচ্ছে। আমাদেরও এ ধরনের কথা বলা উচিত না। আমাদের এমপিরা সংসদে তাদের এলাকার উন্নয়ন ও প্রয়োজনে কথা বলছেন। আগামীতে যাতে আরো সংযত ভাষায় প্রয়োজনীয় কথা বলতে পারেন, সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।
সরকারদলীয় সিনিয়র সংসদ সদস্য ও বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, এবার অনেকে প্রথমবারের মতো সংসদে এসেছেন। তারা মনের থেকে কথা বলতে গিয়ে হয়তো অপ্রয়োজনীয় কথা এসে যায়। তবে আগের সংসদগুলোতে আরো বেশি অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা হতো।
তিনি বলেন, এবারের সংসদের চিত্র ভিন্ন। আশা করি, এই সংসদ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সফল হবে। সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী কথা বলার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এ বিষয়ে স্পিকার সবাইকে সতর্ক করছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সূত্রমতে, জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে এমপিদের বক্তৃতাকালে কিছু নির্দেশনা মানার কথা বলা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে— বিচারাধীন কোনো বিষয় উল্লেখ না করা, কোনো আক্রমণাত্মক, কটু বা অশ্লীল ভাষা ব্যবহার না করা ইত্যাদি। এসব নির্দেশনা মানলে এমপিদের বক্তব্য আরো বিতর্কমুক্ত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।