স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ইস্যুতে সোচ্চার হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোট। এ দুই বিষয় নিয়ে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা আজ সংসদ উত্তপ্ত করতে পারেন বলে আভাস পাওয়া গেছে। অধিবেশনের আগে বেলা ১১টায় বৈঠক করবেন বিরোধীদলীয় এমপিরা।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য বেশ কিছুদিন ধরে বক্তব্য-বিবৃতি ও জাতীয় সংসদে দাবি জানিয়ে আসছে জামায়াতসহ বিরোধীদলীয় জোট। সংসদেই বিষয়টির সমাধানের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। তবে সেখানে সমাধান না হলে প্রয়োজনে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে এ দাবি আদায়ের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
এর সঙ্গে নতুন ইস্যু যোগ হয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আভাস দেওয়া হলেও ঈদের আগে পর্যায়ক্রমে ১১ সিটি করপোরেশন এবং ৪২ জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ায় পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। গণতান্ত্রিক ধারা ভঙ্গ করে এসব প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্ব করতে চায় বলে মনে করছে বিরোধী দল। তাই এ ইস্যু নিয়েও সোচ্চার হবেন তারা। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবিতে সংসদ উত্তপ্ত করতে চায় জামায়াত জোট। যৌক্তিক কথা বলার সুযোগ না পেলে প্রয়োজনে ওয়াকআউটের প্রস্তুতি রয়েছে তাদের। রাজপথে আন্দোলনের চেয়ে সংসদকেই প্রাধান্য দিতে চায় বিরোধী দল। তবে বাধ্য করা হলে রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা বসে করণীয় ঠিক করবেন বলে জানা গেছে।
এদিকে, দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি দলীয় প্রস্তুতিও জোর গতিতে চলছে। এরই মধ্যে দলটি প্রার্থীও প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে।
এসব বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি গতকাল শনিবার আমার দেশকে বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে আমাদের দল ও দেশের মানুষ খুবই সিরিয়াস। তার প্রমাণ প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
এছাড়া দীর্ঘদিন স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়নি। এতদিন প্রশাসনিক প্রশাসক থাকলেও এখন দলীয় প্রশাসক বসেছে, যা আরো খারাপ। অথচ জুলাই বিপ্লবের অন্যতম স্লোগান ছিল দলীয়করণমুক্ত করতে হবে।
এর আগে গত ১৫ মার্চ সংসদ অধিবেশন শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছিলেন, জুলাই সনদের বিষয়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে সংকটের সমাধান আমরা সংসদেই করতে চাই। তবে সংসদে সমাধান না হলে প্রয়োজনে রাজপথে আন্দোলনে নামব। ঈদের দিন ও পরবর্তী একাধিক প্রেস ব্রিফিংয়েও তিনি সে কথার ধারাবাহিকতা রেখে বলেছেন, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। বিষয়টি আমরা সংসদে উত্থাপন করেছি, স্পিকার সেটি আমলে নিয়েছেন।
তিনি বলেন, সরকারি দল যত তাড়াতাড়ি সংবিধান সংস্কার বিষয়টি বুঝবে, সংকট তত তাড়াতাড়ি কাটবে। যদি না হয়, তাহলে বিশাল যে জনগোষ্ঠী (৭০ ভাগ মানুষ) এ আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে, তাদের সঙ্গে নিয়ে দাবি আদায় করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।
তিনি আরো বলেন, গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে গত ২৫ মার্চ জামায়াতের আলোচনা সভায় দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান সরকারি দলকে উদ্দেশ করে বলেন, সংসদ অধিবেশন বসামাত্র নোটিসের জন্য অপেক্ষা না করে জুলাই সনদের স্বাক্ষর অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়নের কথা ঘোষণা দিন। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। কিন্তু কোনো কালক্ষেপণ বা টালবাহানা আমরা মানব না। সংসদে সংস্কারের বিষয়ে সমাধান না হলে রাজপথ আমাদের পরিচিত।
এদিকে গত ১৪ মার্চ ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেছিলেন, জুলাই সনদ অনুযায়ী ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে তথা ১৫ মার্চ যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা না হয়, তাহলে তারা রাজপথে আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন। শীর্ষ নেতাদের বৈঠক থেকে আন্দোলনের রূপরেখা ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন ইস্যুতে ১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক থেকে সরকারের গত দেড় মাসের কার্যক্রম পর্যালোচনা ও করণীয় ঠিক করা হবে। আগামী সপ্তাহে এ বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এরই মধ্যে মাঠে নেমে গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা রমজানে গোলটেবিল বৈঠক করেছি। আগামী ২৪ এপ্রিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ ডাকা হয়েছে।
জালালুদ্দীন বলেন, যেভাবে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে ঢালাওভাবে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তার তীব্র নিন্দা জানিয়েছি। ১১ দলের পক্ষ থেকে দ্রুত স্থানীয় নির্বাচনের দাবি জোরদার করা হবে এবং এ নির্বাচনের জন্য দলগুলো আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের দাবি আদায়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। কাঙ্ক্ষিত জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বিএনপি সরকার টালবাহানা করছে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি। তিনি বলেন, আমরা মনে করি এটি জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। জুলাই আন্দোলনের চেতনার সঙ্গেও প্রতারণা। দেশের মানুষ কোনোভাবেই এ প্রতারণা মেনে নেবে না।
গত ২৬ মার্চ জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছিলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশে সংস্কারের লক্ষ্যে গণভোট হয়েছে। ওই গণভোটে অধিকাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে মত দিয়েছেন, সংস্কারের পক্ষে তাদের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। আমরা সে সংস্কার বাস্তবায়নের আহ্বান জানাই।
দুই ইস্যুতে সোচ্চার অবস্থান প্রসঙ্গে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জনগণের দাবি। সরকার প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে অত্যন্ত গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ করেছে।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ইস্যুতে সংসদে ও বাইরে দুই জায়গায়ই আমরা সোচ্চার হব। জনগণের আন্দোলনের ফসল জাতীয় সংসদ। সেখানে ন্যায়সংগত কথা বলা হবে। কথা বলার সুযোগ না দিলে প্রয়োজনে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা ওয়াকআউট করবেন। অতীতের রাজনৈতিক ধারা থেকে জামায়াত বের হতে চায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিচ্ছে জামায়াত। সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য দলীয়ভাবে জোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে কেন্দ্র থেকে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগে থেকেই অনেক জায়গার প্রাথমিকভাবে প্রার্থী বাছাই করে রাখা রয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে যোগ-বিয়োগ করে তা চূড়ান্ত করা হবে। সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ প্রায় সব পদে প্রার্থী ঠিক করা আছে।
সূত্রমতে, গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্য করে অংশ নেয় জামায়াত। তবে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন জোটগত নাকি এককভাবে হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ কারণে এখন এককভাবেই প্রার্থী ঠিক করছে জামায়াত। এছাড়া জোটের অন্য দলগুলো তাদের মতো করে নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির ধারাবাহিকতায় গত ১ মার্চ জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় নির্বাচনের জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে দায়িত্বশীলদের নির্দেশনা দেওয়া হয়।