বরিশালের ছয় আসন
সব জল্পনা-কল্পনা ও হিসাবনিকাশ পেছনে ফেলে বরিশালের ছয়টি সংসদীয় আসনেই নিরঙ্কুশ বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থীরা। গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৩টায় বেসরকারিভাবে ছয়টি আসনের ফলাফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক খাইরুল আলম সুমন। এ সময় বিএনপির বিজয়ী প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। বরিশালের ছয় আসনেই বিএনপির বিজয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন নেতাকর্মীরা। এ বিজয়কে গণতন্ত্র ও জনগণের বিজয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি নেতারা।
সূত্র জানায়, বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনে ১২৯ ভোটকেন্দ্রের ফলাফলে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপন এক লাখ ৫৫২ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মো. কামরুল ইসলাম খান পেয়েছেন ৪৬ হাজার ২৬৩ ভোট। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান পেয়েছেন ৪৪ হাজার ১৮৮ ভোট। জহির উদ্দিন স্বপন ৫৪ হাজার ২৮৯ ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হন। এই আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে এক লাখ ১২ হাজার ২০৮ এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ৭৩ হাজার ৯৮৯টি। এ আসনে ভোটের হার ৬১ দশমিক ১১ ভাগ।
বরিশাল-২ (বানারীপাড়া-উজিরপুর) আসনে কেন্দ্রীয় বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু এক লাখ ৪১ হাজার ৬২২ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আবদুল মন্নান পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৮২ ভোট। সান্টু ৬৭ হাজার ৫৪০ ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। এই আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে এক লাখ ৩৪ হাজার ২৭৮ এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ৮০ হাজার ৯৬৬টি।
বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনটি বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত হলেও অভ্যন্তরীণ বিরোধ ছিল চরমে। বিএনপির দুই হেভিওয়েট প্রার্থী জয়নুল আবেদীন ও বেগম সেলিমা রহমানের বিরোধ মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ায় আসনটি হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত বিরোধ মিটিয়ে জয় ঘরে তুলে নিয়েছেন বিএনপির প্রার্থী জয়নুল আবেদীন। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী জয়নুল আবেদীন ৮০ হাজার ৯৩০ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের ঈগল প্রতীকের প্রার্থী, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া পেয়েছেন ৬১ হাজার ১৯২ ভোট। জয়নুল আবেদীন ১৮ হাজার ৭৩৮ ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। এখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে এক লাখ ২২ হাজার ৩০৫ এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ৪০ হাজার ৬৩৬টি।
বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. রাজিব আহসান প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েই এক লাখ ২৮ হাজার ৩২২ ভোট পেয়ে জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মো. আব্দুল জব্বার পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৬৮৪ ভোট। রাজিব ৫৩ হাজার ৬৩৮ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। এই আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে এক লাখ ৪৩ হাজার ৯০০ এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ৬৪ হাজার ৫১১টি।
বরিশাল-৫ (সদর ও মহানগর) আসনটি জেলার সবচেয়ে মর্যাদার আসন হিসেবে পরিচিত। এ আসনের ভোটকেন্দ্র ১৭৬টি কেন্দ্রের ফলাফলে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার এক লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মুফতি ফয়জুল করীম পেয়েছেন ৯৫ হাজার ৪৪ ভোট এবং মই প্রতীক নিয়ে বাসদের প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী পেয়েছেন ২২ হাজার ৪৮৬ ভোট। সরোয়ার ৪০ হাজার ১০২ ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হন। এখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে এক লাখ ৭৬ হাজার ৬৮৭ এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ৬৯ হাজার ৩৯৪টি।
বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আবুল হোসেন খান ৮২ হাজার ২১৭ ভোট পেয়ে বেসরকারিভবে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মো. মাহমুদুন্নবী পেয়েছেন ৫৫ হাজার ৯৮৮ ভোট। এ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম হাতপাখা প্রতীকে পেয়েছেন ২৯ হাজার ১৪৬ ভোট। আবুল হোসেন খান ২৬ হাজার ২২৯ ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হন। এখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে এক লাখ ১৫ হাজার ৭৪ এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ৪১ হাজার ৭০০টি।
বরিশাল জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক খাইরুল আলম সুমন ফলাফল প্রকাশে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ছয়টি আসন থেকে ফলাফল পাওয়ার পর চূড়ান্ত বার্তা প্রস্তুত করতে সময় লেগেছে। সবার সহযোগিতায় বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই নির্বাচন সম্পন্ন করতে পেরেছি। সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এদিকে বিএনপির ছয়টি আসনের সবকটিতে বিএনপির এ বিজয়কে জনগণ ও গণতন্ত্রের বড় বিজয় হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। তিনি বলেন, এ অঞ্চল যে বিএনপির ঘাঁটি, জনগণ তা ভোটের মাধ্যমে আবারও প্রমাণ করল।