তদন্তে মন্ত্রণালয়ের টিম
ভুয়া রেজুলেশন তৈরি করে একদিনেই সভাপতি নির্বাচন, স্বেচ্ছাচারিতা ও আর্থিক দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শারফুদ্দীনের বিরুদ্ধে। একজন বিদ্যোৎসাহী সদস্যের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে দুই সদস্যের একটি তদন্ত টিম কলেজ পরিদর্শন করেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, কলেজ পরিচালনা পরিষদের নিয়মনীতি উপেক্ষা করে অধ্যক্ষ একক সিদ্ধান্তে এক দিনের ব্যবধানে নোটিশ জারি করেন এবং গভর্নিং বডির সদস্যদের সভায় উপস্থিতি ছাড়াই জাল স্বাক্ষর সংযোজন করে একটি ভুয়া রেজুলেশন তৈরি করেন। এর মাধ্যমে গভর্নিং বডির গুরুত্বপূর্ণ সভাপতি পদে নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কোনো বৈধ সভা আহ্বান বা সদস্যদের উপস্থিতি ছাড়াই এ ধরনের স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ ফজলুল আজিম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণে পদত্যাগ করেন। পরদিন ২১ নভেম্বর অধ্যক্ষ এককভাবে গভর্নিং বডির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে দেখান। বিধিমালা অনুযায়ী সভা আহ্বানের নোটিশ দেওয়ার অন্তত ৭ দিন পর সভা হওয়ার কথা থাকলেও তা মানা হয়নি। তথাকথিত ওই সভায় ২৪২ নম্বর রেজুলেশন দেখানো হলেও একই নম্বর পূর্ববর্তী বৈধ সভাতেও ব্যবহৃত হয়েছিল, যা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া রেজুলেশনে ব্যবহৃত স্বাক্ষর ও সিলমোহরেও অসংগতি পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে একাধিক গভর্নিং বডির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের অনেকেই ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন না। কয়েকজন সদস্য দাবি করেন, তাদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। বিষয়টি রহস্যজনক বলে তারা উল্লেখ করেন। দাতা সদস্য আবু তাহের বিটু বলেন, আমি এমন কোনো সভায় উপস্থিত ছিলাম না এবং এ ধরনের রেজুলেশন সম্পর্কে কিছুই জানি না।
গভর্নিং বডির শিক্ষক প্রতিনিধি প্রভাষক ফারজানা বেগম বলেন, আমি ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ন্যাশনাল একাডেমি ফর এডুকেশনাল ম্যানেজমেন্টে প্রশিক্ষণে ছিলাম। ২১ নভেম্বরের মিটিং সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। পরে অধ্যক্ষ স্যার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে ঢাকায় গেলে আমার কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে যান।
একইভাবে গভর্নিং বডির আরেক শিক্ষক প্রতিনিধি সহকারী অধ্যাপক আবদুল হাদী বলেন, ২১ নভেম্বর কলেজ ক্যাম্পাসে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পরীক্ষা ছিল। আমি হলের দায়িত্বে ছিলাম। ওই দিন কলেজ ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের সভা হয়নি। কয়েকদিন পর পিয়নের মাধ্যমে অধ্যক্ষ আমার বাড়িতে ২১ তারিখের একটি রেজুলেশনে স্বাক্ষর করার জন্য পাঠান। আমি যেহেতু এমন কোনো সভা সম্পর্কে জানতাম না এবং উপস্থিত ছিলাম না, তাই স্বাক্ষর করিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই সভায় যাকে হিতৈষী সদস্য হিসেবে দেখানো হয়েছে, বিধি অনুযায়ী তার ৫০ হাজার টাকা কলেজ তহবিলে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এমন কোনো জমার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি নির্বাচনের যে রেজুলেশন করা হয়েছে, সেদিন অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শারফুদ্দীন নিজেই ছুটিতে ছিলেন। সে সময় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন সহকারী অধ্যাপক শাহওয়ালী উল্যাহ। কিন্তু একই দিনে অধ্যক্ষের কার্যালয় থেকে সভাপতি নির্বাচনের রেজুলেশন তৈরি করে নতুন সভাপতি অনুমোদন করায় জালিয়াতির সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে।
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শাহওয়ালী উল্যাহর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অধ্যক্ষ ছুটিতে থাকায় আমি দায়িত্বে ছিলাম। ২১ নভেম্বর উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পরীক্ষা ছিল, যা আমি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে পরিচালনা করেছি। শিক্ষক প্রতিনিধি সহকারী অধ্যাপক আবদুল হাদীও পরীক্ষার হলে দায়িত্বে ছিলেন। আমরা দুজনই শিক্ষক প্রতিনিধি সদস্য হয়েও ২১ তারিখের যে মিটিংয়ের কথা বলা হচ্ছে, সে বিষয়ে অবগত নই। ঘটনাটি তদন্তাধীন, তাই বিস্তারিত কিছু বলা এই মুহূর্তে সমীচীন নয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে যথাযথ তদন্ত করছে।
কলেজের ইসলাম শিক্ষা বিভাগের প্রভাষক মো. আবুল হাসান বলেন, আমি এনটিআরসির নিবন্ধনের মাধ্যমে হাতিয়া কলেজে নিয়োগ পেয়েছি। আমার কাগজপত্রে অসংগতি আছে বলে অধ্যক্ষ স্যার আমার কাছে ২ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা না দেওয়ায় আমাকে বিভিন্ন অজুহাতে চারবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রণালয়ের অডিট টিম পরিদর্শনে এলে অধ্যক্ষ তা কাজে লাগিয়ে শিক্ষকদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায় করতেন। কেউ টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাকে বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার ভয় দেখিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হতো। এ বিষয়ে একাধিক কল রেকর্ড রয়েছে, যা প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে। এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা লঙ্ঘন করে জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে জুনিয়রদের পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনায় কলেজের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এদিকে, অভিযোগের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত টিম ইতোমধ্যে কলেজে গিয়ে নথিপত্র যাচাই-বাছাই, সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং প্রমাণাদি সংগ্রহ করেছে।
তদন্ত টিমের সদস্য, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সহকারী পরিচালক (গবেষণা ও উদ্ভাবন) মো. আবদুল মান্নান জানান, তদন্ত কার্যক্রম মাত্র শেষ হয়েছে। অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এখনো কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি হয়নি। অফিসিয়াল নির্দেশনা অনুযায়ী যথাযথ নিয়ম মেনে প্রতিবেদন তৈরি ও জমা দেওয়া হবে। প্রতিবেদনে কোনো ব্যক্তিগত পক্ষপাত থাকবে না; সংগৃহীত তথ্য, নথিপত্র ও প্রমাণের ভিত্তিতেই প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। তদন্তে পাওয়া সব তথ্যই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
অভিযোগের বিষয়ে হাতিয়া কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শারফুদ্দিন বলেন, সকল নিয়ম মেনেই কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছে। একটি পক্ষ কলেজের সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে। কলেজের একজন বিদ্যোৎসাহী সদস্য অবান্তর বিষয় নিয়ে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দিয়েছেন। তার প্রেক্ষিতে মাউশি থেকে তদন্ত টিম এসে সবকিছু পরিদর্শন করেছে। আমার কলেজে কোনো সমস্যা নেই; কলেজ সুন্দরভাবে পরিচালিত হচ্ছে।