একসময় গ্রামবাংলার অতি পরিচিত পেশা ছিল করাতি পেশা। করাতিদের গাছ কাটার দৃশ্য দেখতে শত শত লোক ভিড় জমাত। করাত টানার সময় গানের সুর আর ছন্দে কর্মব্যস্ততার সেই মুহূর্ত এখন আর চোখে পড়ে না। কালের বিবর্তনে ও জীবিকার তাগিদে পেশা পরিবর্তনের কারণে ঐতিহ্যবাহী করাতি সম্প্রদায় আজ বিলুপ্তির পথে।
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে একসময় করাতি সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস ছিল। শুষ্ক মৌসুম এলেই তারা দল বেঁধে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বড় বড় গাছ কেটে কাঠের রুয়া, তক্তা, খুঁটি ইত্যাদি তৈরি করতেন। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে গাছ কাটার কাজই ছিল তাদের প্রধান জীবিকা। কাঁধে করাত, হাতে কুড়াল, দা ও মোটা দড়ি নিয়ে তারা হাঁকডাক দিয়ে বলতেন—গাছ চিরাবেন গাছ! তখন অপেক্ষায় থাকা গৃহস্থরা তাদের দিয়ে গাছ কাটিয়ে চিরিয়ে নিতেন।
আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে এখন যান্ত্রিক স মিল গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। ফলে করাতি পেশার চাহিদা কমে গেছে। বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অনেকেই এখন অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন।
নব্বইয়রে দশকের আগেও করাতিদের কাজ দেখতে পাড়ার পাড়ায় মানুষ ভিড় জমাত। গানের তালে তালে করাত টানার দৃশ্য ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। করাতিরা সাধারণত সকালে গুড়-দিয়ে চিড়ামুড়ি, পান্তাভাত বা লাল আটার রুটি খেয়ে কাজে নেমে পড়তেন। একটি দলে চার থেকে পাঁচজন গাছ কাটার কাজে নিয়োজিত থাকতেন, আর একজন রান্নার দায়িত্ব পালন করতেন। এভাবেই পুরো মৌসুম কাজ করতেন তারা।
তৎকালীন করাতিরা মাটিতে গর্ত করে বা কাঠের কাঠামো তৈরি করে করাত চালাতেন। এই পদ্ধতিতে গাছ কাটতে ওপরে ও নিচে দুই থেকে ছয়জন লোকের প্রয়োজন হতো। বড় করাত দিয়ে গাছ চিরে বিভিন্ন সাইজের কাঠ তৈরি করা হতো, যা দিয়ে ঘরের খুঁটি, তক্তা, আদল ও রুয়া বানানো হতো। কাঠের আকার ও পরিমাণ অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণ করা হতো।
সরেজমিনে উপজেলার ভোলাকোট ইউনিয়ন ও ভাদুর ইউনিয়নের বশির উল্যা, শামসুল আলম, আনিছুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন প্রবীণের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে ৩৫ থেকে ৪০ বছর আগে ঘর নির্মাণের জন্য বড় গাছ কেটে করাতিদের দিয়ে কাঠ প্রস্তুত করা হতো। তখন বিভিন্ন গ্রামে একাধিক করাতি দল কাজ করত এবং তারা এলাকায় বেশ পরিচিত ছিলেন।
রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাশিদ বিন এনাম বলেন, করাতি পেশা এ দেশের মানুষের অতি প্রাচীন একটি ঐতিহ্যবাহী পেশা। কালের বিবর্তনের পেশাটি হারিয়ে যেতে বসেছে। উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পেশাটিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতো। এ পেশার লোকেরা যদি পৃষ্ঠপোষকতার জন্য আমার কাছে আসে আমি তাদের যথাযথভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করব।