সন্ধ্যা নামলেই সীমান্তজুড়ে আতঙ্ক
সন্ধ্যা নামার আগেই নাফ নদীর তীরে নেমে আসে এক ধরনের স্তব্ধতা। ব্যবসায়ীরা গুটিয়ে নেন দোকানপাট, জেলেরা নৌকা টেনে তোলেন ডাঙায়, মায়েরা শিশুদের ডেকে নেন ঘরে। কারণ, কেউ জানেন না— আজ রাতেও ওপার থেকে বোমার শব্দ ভেসে আসবে কি না। কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তবর্তী জনপদে এখন প্রতিটি রাত যেন অনিশ্চয়তার প্রহর গোনার নাম।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত যত তীব্র হচ্ছে, তার অভিঘাত ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায়। যুদ্ধবিমানের হামলার আওয়াজ, নাফ নদীতে জেলে অপহরণ, স্থলমাইনে প্রাণহানি এবং নতুন করে রোহিঙ্গা ঢলের শঙ্কাÑএসব এখন সীমান্তের মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
মিয়ানমারে জান্তা সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এখন দেশের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ এলাকায় সীমাবদ্ধ। বাকিটা বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন ও গণতন্ত্রপন্থি পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবে রয়েছে।
সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির তথ্যানুযায়ী, এক হাজারের বেশি সশস্ত্র গোষ্ঠী বিভিন্ন মাত্রায় এ সংঘাতে জড়িত। ফলে মিয়ানমার এখন বিশ্বের অন্যতম জটিল ও খণ্ডিত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। একটি নদী, যে আর নিজের নয়
শাহপরীর দ্বীপের নুর হোসেনের বয়স হয়েছে। কিন্তু নাফ নদীর সঙ্গে তার সম্পর্ক তিন প্রজন্মের। তার বাবা এই নদীতে মাছ ধরতেন, তিনি নিজে ধরেন, এখন তার ছেলেও শিখছে জাল ফেলা। অথচ সেই চেনা নদী এখন যেন আর নিজের নেই। তিনি বলেন, রাতে বোমার শব্দে ঘুম ভাঙে, দিনে অস্ত্রধারীদের ভয়ে পানিতে নামতে বুক কাঁপে। আগে চিন্তা ছিল মাছ পাব কি না, এখন চিন্তা ফিরতে পারব কি না।
এই ভয় নিছক কল্পনা নয়। বিজিবির তথ্যানুযায়ী, গত দুই বছরে নাফ নদী থেকে চার শতাধিক বাংলাদেশি জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। তাদের মধ্যে আড়াই শতাধিক বিভিন্ন সময় ফিরে এলেও এখনো ১৭২ জেলে এবং ৩২টি ট্রলার আটকে রয়েছে রাখাইনের কোথাও। সবশেষ গত ১৫ জুন শাহপরীর দ্বীপসংলগ্ন মোহনা থেকে দুটি ট্রলারসহ সাত জেলেকে তুলে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। এর আগে ১৮ মে, ৩০ এপ্রিল ও ২৮ মার্চও একই ধরনের ঘটনা ঘটে।
নাফ নদীতে দৃশ্যমান কোনো সীমারেখা না থাকায় জোয়ারভাটার স্রোত কিংবা মাছের পিছু ছুটতে গিয়ে অনেক সময় অজান্তেই মিয়ানমারের জলসীমায় ঢুকে পড়েন বাংলাদেশি জেলেরা। আর সে সুযোগেই তাদের আটক করে আরাকান আর্মির সদস্যরা।
শাহপরীর দ্বীপের মৎস্য ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক সম্প্রতি হারিয়েছেন তার দুটি ট্রলার। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, একেকটি ট্রলার বানাতে লাখ লাখ টাকা লাগে। সে ট্রলার আর জেলেসহ যদি এভাবে ধরে নিয়ে যায়, তাহলে ব্যবসা করব কীভাবে?
জালিয়াপাড়ার বাসিন্দা ছৈয়দ আলম আবার মনে করিয়ে দেন সেই রাতের কথা, যে রাতে কয়েকটি প্রচণ্ড বিস্ফোরণের পর সীমান্তের ওপারে দাউদাউ আগুনের শিখা জ্বলে উঠতে দেখা গিয়েছিল। বিষয়টি এলাকাজুড়ে নতুন আতঙ্কের জন্ম দিয়েছিল।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরীর কথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে সীমান্তের জীবনযাত্রার বদলে যাওয়া ছন্দ। তিনি বলেন, দিনে যেমন আতঙ্ক, রাতে তার চেয়েও বেশি। বিমান হামলা, মর্টার শেল আর গোলাগুলির শব্দে এপারের ঘরবাড়িও কেঁপে ওঠে। আমরা সীমান্তের মানুষের নিরাপত্তা চাই।
প্রশাসনও পরিস্থিতির গুরুত্ব স্বীকার করছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ. মান্নান জানান, বিস্ফোরণের শব্দ ও কম্পন তারাও অনুভব করছেন। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গুলি বা মর্টার শেল এসে পড়ার মতো বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি নাফ নদী ও আশপাশের এলাকায় টহল জোরদার করেছে এবং কোস্ট গার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা এ নজরদারি চালাচ্ছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও উদ্বেগ
সীমান্তের এ অস্থিরতা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোয়। উখিয়ার একটি ক্যাম্পে থাকা আব্দুল করিমের স্বজনরা এখনো রাখাইনে রয়েছেন। তিনি বলেন, ওপারে থাকা আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। যতটুকু খবর পাই, বুঝি তারা ভালো নেই।
২০১৭ সালে শিশু অবস্থায় রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা সালেহা খাতুনের কথায় ফুটে ওঠে উদ্বেগ ও মানবিকতার মিশ্র অনুভূতি। তিনি বলেন, ক্যাম্পে এমনিতেই গাদাগাদি অবস্থা। খাবার, চিকিৎসা আর লেখাপড়াÑসবকিছুতেই সংকট। নতুন করে মানুষ এলে চাপ আরো বাড়বে। তবু তারা তো আমাদেরই ভাইবোন। বিপদে পড়লে ফিরিয়ে দেব কীভাবে?
সীমানাহীন এক যুদ্ধ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান মনে করেন, রাখাইনে আরাকান আর্মি ও জান্তা বাহিনীÑউভয়েই অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন করে সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তার ভাষায়, এ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এর কোনো সীমানা-সচেতনতা নেই। ফলে বিমান হামলার আওয়াজ, মাটির কম্পন, এমনকি ভুলবশত ছোড়া গোলাও সীমান্ত অতিক্রম করে এপারে চলে আসার ঝুঁকি নিছক কল্পনা নয়, বাস্তব।
বাংলাদেশের জন্য তাই এটি কেবল প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ২৭১ কিলোমিটার সীমান্তের নিরাপত্তা, নাফ নদীনির্ভর হাজারো জেলে পরিবারের জীবিকা এবং আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। নদীর ওপারে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, সীমান্তের এপারের রাতগুলোও ততই ডুবে যাচ্ছে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর নিদ্রাহীন প্রতীক্ষায়।
[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন টেকনাফ ও উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি]