ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন বিতর্কমুক্ত করতে প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানোর উদ্যোগ নেয় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অস্থায়ীভাবে এই ক্যামেরা লাগানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। চট্টগ্রামের প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ১১ ফেব্রুয়ারির আগেই ক্যামেরা লাগানোর কাজ সম্পন্ন হয়। নির্বাচনের তিন থেকে চার দিনের মধ্যে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান ক্যামেরাগুলো খুলেও নিয়ে গেছে। কিন্তু ১২ দিন পর বিদ্যালয়গুলোতে ১১ ফেব্রুয়ারি বিকাল থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গণনা পর্যন্ত প্রতিটি ক্যামেরার ফুটেজ পেনড্রাইভের মাধ্যমে ইসিতে পাঠানোর নির্দেশনা দিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। বিষয়টি নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইসি আর রিটার্নিং কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় নির্বাচনের রেকর্ড সংরক্ষণ করা যায়নি।
সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে ১ হাজার ৯৬৫টি ভোটকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ১০-২৫টি পর্যন্ত সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানোর উদ্যোগ নেয় ইসি। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অস্থায়ীভাবে এই ক্যামেরাগুলো লাগায় কেন্দ্রে কেন্দ্রে। তিন দিনের জন্য লাগানো ক্যামেরাগুলো নির্ধারিত সময়ের পর খুলে নিয়ে যায় প্রতিষ্ঠানগুলো। সে অনুযায়ী ১৪-১৬ তারিখের মধ্যে সবগুলো ক্যামেরা খুলে নেওয়া হয়। তবে যেসব বিদ্যালয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আগে থেকেই ক্যামেরা লাগানো ছিল, সেগুলো এখনো রয়েছে। কিন্তু ভোটের বুথ স্থাপন, গণনার কক্ষসহ অন্যান্য কাজের জন্য নির্ধারিত জায়গাগুলো ওই সব ক্যামেরার আওতায় ছিল না। আর তাই আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও অতিরিক্ত ক্যামেরা লাগানো হয় নির্বাচন কেন্দ্র করে।
ইসি সূত্র জানায়, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ইসির উপসচিব মনির হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠি আসে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রমাণস্বরূপ নির্বাচনের আগের দিন থেকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের সিসিটিভি ফুটেজ নিজ নিজ রিটার্নিং কর্মকর্তার অফিসে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইসির এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তাদের পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ জানানো হয়েছে।
ইসির এই চিঠির আলোকে ২৪ ফেব্রুয়ারি থানা নির্বাচন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে আরেকটি চিঠি ইস্যু করেন চট্টগ্রামের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়া উদ্দিন। সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের উদ্দেশ করে লেখা চিঠিতে দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের আওতাধীন ভোটকেন্দ্রগুলো থেকে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে রিটার্নিং কর্মকর্তার অফিসে জমা দেওয়ার উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা ওইদিনই প্রতিটি বিদ্যালয়ের (ভোটকেন্দ্র) প্রধানদের উদ্দেশ করে চিঠি ইস্যু করেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ পেনড্রাইভের মাধ্যমে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। কিন্তু তার আগেই সবগুলো ভোটকেন্দ্র থেকে অস্থায়ী ক্যামেরা খুলে নিয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকজন।
নির্বাচন উপলক্ষে প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের নিয়ে করা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ফুটেজ দিতে অপারগতা জানিয়ে এসএমএস করেছেন অসংখ্য প্রিসাইডিং কর্মকর্তা বা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। এমন ১১টি স্ক্রিনশট আমার দেশ-এর হাতে এসেছে। নির্বাচন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে ক্যামেরা খুলে নিয়ে যাওয়ায় ফুটেজ দিতে পারছেন না। রিটার্নিং কর্মকর্তার পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত আসতে দেরি হওয়ায় ফুটেজ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছেÑএমন বক্তব্য লিখিতভাবে জানাতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের।
চট্টগ্রামের হাবিব উল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন জানান, নির্বাচনের একদিন পর তার বিদ্যালয় থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা খুলে নেওয়ার কথা ছিল। কোম্পানির লোকরা তিনদিন পর খুলে নিয়ে গেছে। ফুটেজ বিষয়ে তার কিছুই জানা নেই। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার চিঠি পেয়ে তিনি হতভম্ব। বিষয়টি নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও জানিয়েছেন তিনি।
কিডস হেভেন কেজি অ্যান্ড হাই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রীনা আক্তার জানান, তিনি যেদিন চিঠি পেয়েছেন, তার আগেরদিন স্কুল থেকে ক্যামেরা খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কোন কোম্পানি ক্যামেরা লাগিয়েছিল, তাও তিনি জানেন না। ইসি থেকেই তাদের কাজের অর্ডার দেওয়া হয়েছিল। চিঠিটি একদিন আগে পেলে কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে ফুটেজ সংগ্রহ করা যেত। কিন্তু এখন আর সেটা সম্ভব নয়। বিষয়টি তিনি সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন। তিনি কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে ফুটেজ সংগ্রহ করার চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন।
চট্টগ্রামের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়া উদ্দিন জানান, নির্বাচনের আগের দিন ও নির্বাচনের দিনের ফুটেজ সংগ্রহ করতে হবেÑএই বিষয়টি সবাই জানেন। ইসির চিঠি কিংবা রিটার্নিং কর্মকর্তার চিঠি শুধু আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। কোনো কেন্দ্রের ফুটেজ পাওয়া না গেলে তা সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতা। আশা করি, সব কেন্দ্রের ফুটেজ পাওয়া সম্ভব হবে। এখন পর্যন্ত কোনো কেন্দ্রের ফুটেজ পাওয়া গেছে কি নাÑএমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচন কর্মকর্তারা মনিটরিং করছেন।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বশির আহমেদ জানান, ইসির নির্দেশনা মোতাবেক ফুটেজগুলো সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। ক্যামেরা লাগানো কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। সিদ্ধান্তটি আগে এলে বিষয়টি সহজ হতো। তবে পরে আসায় যে অসম্ভব হয়ে গেছে বিষয়টি তেমন নয়। হয়তো একটু কঠিন হবে। কিন্তু ফুটেজ পাওয়া যাবে বলেও জানান তিনি।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান জানান, যেকোনো নির্বাচন নিয়ে এক বছর পরও প্রশ্ন উঠতে পারে। আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। প্রথমবারের মতো সব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা করেছিল ইসি। কিন্তু বিষয়টির গুরুত্ব মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বোঝেননি। আর তাই নির্বাচনের পর ফুটেজ সংগ্রহের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটিতে চরম অবহেলা হয়েছে। এটা চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। সামান্য কারণে সুষ্ঠু একটি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে এর দায় কে নেবে? এ ঘটনায় ইসি ও প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।