নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানুষের বিবেক, মানবিকতা ও মূল্যবোধের জাগরণ। কেবল শিক্ষক, কর্মকর্তা বা অভিভাবক হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবেও প্রত্যেকের দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের এই যুগে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার মানবতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধেই নিহিত।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা শনিবার চট্টগ্রাম কলেজ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে স্কাউটিংয়ের ভূমিকা’ শীর্ষক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের উদ্বুদ্ধকরণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ স্কাউটস, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন জেলার আয়োজনে অনুষ্ঠিত সভায় জেলা প্রশাসক বলেন, বর্তমান সমাজে মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতার মধ্যে ছুটছে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতার দৌড়ে আমরা নৈতিকতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হারিয়ে ফেলছি। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পদ-পদবি নয়, তার মানবিক সত্তা।
তিনি বলেন, সূর্যের যদি তাপ না থাকে, চাঁদের যদি আলো না থাকে, সমুদ্রের যদি গর্জন না থাকে, তাহলে যেমন তাদের মূল্য থাকে না, তেমনি মানুষের যদি মানবিকতা না থাকে, তাহলে মানুষ হিসেবে তারও কোনো মূল্য থাকে না।
রবার্ট ব্যাডেন-পাওয়েলের স্কাউট আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরে জাহিদুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে দায়িত্বশীল ও বিবেকবান মানুষ তৈরির লক্ষ্য থেকেই স্কাউটিংয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল। আজও সেই দর্শন সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আইনস্টাইনের একটি বিখ্যাত উক্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, পৃথিবী খারাপ মানুষের কারণে নয়, বরং ভালো মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করলে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়।
জেলা প্রশাসক বলেন, আমরা শিক্ষক, কর্মকর্তা, অভিভাবক বা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু আমরা কি কখনো ভাবি, মানুষ হিসেবেও আমাদের কিছু দায়িত্ব আছে? মানুষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো অন্য মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
তিনি বলেন, শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধু সনদ বা ডিগ্রি অর্জন নয়; বরং বড়দের সম্মান করা, ছোটদের ভালোবাসা, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজের জন্য দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা।
শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আজকের শিক্ষার্থীরা শুধু বই থেকে শিক্ষা নেয় না; তারা তাদের শিক্ষকদের জীবনাচরণও অনুসরণ করে। আমরা কি আমাদের সন্তানদের সামনে এমন একজন মানুষকে দাঁড় করাতে পারি, যাকে দেখে বলতে পারব—তুমি তার মতো হও?
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ দেশের মানুষ উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, আমাদের কোনো বড় খনিজ সম্পদ নেই। আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ এই দেশের মানুষ। ১৮ কোটি মানুষের ৩৬ কোটি হাতই বাংলাদেশের প্রকৃত শক্তি। এই মানবসম্পদকে দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক ও নৈতিকভাবে গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
মেধা পাচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের বহু মেধাবী তরুণ উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে সেখানেই স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দেশে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে তরুণরা নিজেদের মেধা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে উৎসাহিত হবে।
প্রযুক্তির প্রসঙ্গ টেনে জাহিদুল ইসলাম বলেন, মানুষ তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে প্রযুক্তি একসময় মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তির তথ্য মানুষের সাক্ষ্যের চেয়েও বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় মানুষের বিবেক, সততা ও নৈতিকতাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি বলেন, প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিতে না চাইলে আমাদের বিবেককে জাগ্রত করতে হবে। প্রযুক্তির এই যুগে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার মানবতায়, তার মূল্যবোধে এবং তার দায়িত্ববোধে।
মাদক ও সামাজিক অপরাধের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, কেবল আইন প্রয়োগ করে সমাজ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। সামাজিক প্রতিরোধ, জনসচেতনতা এবং নৈতিক শিক্ষার বিকাশ ছাড়া মাদকসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
তিনি আরও বলেন, আমরা যদি প্রত্যেকে নিজেদের দায়িত্বের জায়গা থেকে সৎভাবে কাজ করি, মানবিকতা ও বিবেককে জাগ্রত করি, তাহলে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরী, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুল আজিজ এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফিরোজ আহমদ।
বাংলাদেশ স্কাউটস, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন জেলার সম্পাদক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান স্বাগত বক্তব্য দেন। সংগঠনের সহ-সভাপতি সিদ্দিক আহমদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শরীফ উদ্দিন।
অনুষ্ঠান শেষে স্কাউটিংয়ে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনি স্কাউট গ্রুপ, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মহিলা কামিল মাদ্রাসা এবং এয়াকুব আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
এএস