ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসী হামলা
বিলাসবহুল ভবনের ছাদে হাঁটতে হাঁটতে ফোনে কথা বলছেন, ব্যাকগ্রাউন্ডে হিন্দি গানের মিউজিক বাজছে। কখনো পাঁচ তারকা হোটেলের লবিতে বৈঠক করছেন অন্যদের সঙ্গে কিংবা বিলাসি বারে বসে বিয়ার খাচ্ছেন। এমন হাজারো ছবি ও ভিডিও শেয়ার করা আছে নিজের ফেসবুক ওয়ালে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ফলোয়ারও কয়েক লাখ। নির্দিষ্ট পরিমাণ ফলোয়ার সংখ্যা পার হলে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফটোকার্ডও শেয়ার করেন ডেভিড ইমন। পুরো নাম মোবারক হোসেন ইমন। ফেসবুক ঘাঁটলে প্রথম দেখায় মনে হবে হিন্দি ছবির সেলিব্রেটি কোনো নায়ক। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশ হলে নিজেই শেয়ার করেন। অতিরঞ্জিত কিছু লেখা হলে প্রতিক্রিয়া জানান। সুদর্শন এই যুবকই এখন চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের নতুন আতঙ্ক। নগর পুলিশের ঘুমও কেড়ে নিয়েছেন তিনি। সবশেষ আলোচনায় এসেছেন গত সোমবার দুপুরে বাকুলিয়া এক্সেস রোডে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে।
রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে ডেভেলপার কোম্পানি, ইন্টারনেট, ডিশ ব্যবসা, গার্মেন্ট কিংবা খাতুনগঞ্জের আড়তদার—সবার কাছে যেন এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম ডেবিড ইমন। বিদেশি নম্বর থেকে ফোনে দাবি করা হয় চাঁদা, না দিলে বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি, পরিবারের সদস্যদের হেনস্তা, এমনকি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটাতেও পিছপা হচ্ছে না ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের সহযোগী সন্ত্রাসীরা। নগরজুড়ে সন্ত্রাসের এই আধিপত্য গড়ে তুলতে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি তাকে। সারোয়ার বাবলা, ঢাকাইয়া আকবরের মতো পথের কাঁটা সরাতে হত্যা করতে হয়েছে একাধিক প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসীকেও। পুলিশের খাতায় তিনি এখন টপ ওয়ান্টেড সন্ত্রাসী।
চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে ডেভিড ইমনের নাম আলোচিত হয় ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে। শুরুতে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের কয়েক সহযোগীর একজন হিসেবে নাম উঠে এলেও ধীরে ধীরে একক অস্তিত্বও জানান দেন তিনি। যদিও বড় সাজ্জাদের সহযোগী হিসেবেই এখনো পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন ডেভিড ইমন।
গত সোমবার দুপুরে নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোডে ডিডিএন নামের একটি ইন্টারনেট ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে ৩০-৩৫ জনের একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী। ওই ঘটনার পর ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে ডেভিড ইমনের একটি ফোলালাপ ফাঁস হয়। এতে ডেভিড ইমন পরিচয় দিয়ে ফোন করা ওই ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘আমাকে না চিনলে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেন, বড় সাজ্জাদ বাহিনীর ডেভিড ইমন ফোন করেছে বলেন, আমার ফোন নম্বর দেখান, তিনিই বলে দেবেন আমি কে। আরেকটু সময় থাকলে বাঁশখালীর সাবেক এমপি মোস্তাফিজুরের সঙ্গে কথা বলেন, তার বাড়ির সামনে কী হয়েছে জানা নেই আপনার? আপনি কি মোস্তফিজের থেকে বড় হয়ে গেছেন? ব্যবসা করতে চাইলে একবারে দুই কোটি টাকা ও প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে দেবেন। না হলে দুদিনের মধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে নেবেন, আমার পোলাপান ব্যবসা করবে।’
গত ২ জানুয়ারি সকালে নগরীর চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাবেক এমপি মোস্তাফিজুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল সন্ত্রাসীরা। এরপর ওই বাসার নিরাপত্তায় পুলিশের পাঁচ সদস্যকে নিয়োগ করা হয়। দুই মাসের মাথায় পুলিশ পাহারা থাকাবস্থায় ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৫টার দিকে ফের ওই বাসা লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা। কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে বড় সাজ্জাদের বাহিনী ওই হামলা চালায় বলে দাবি করে পুলিশ। পরে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে মোস্তাফিজ রেহাই পান বলে এলাকায় প্রচার হয়। তবে এ ব্যাপারে পুলিশ কিংবা মোস্তাফিজ কেউ পরে আর কথা বলেনি। সবশেষ ডেভিড ইমনের ফোনকলে ফের সামনে এলো মোস্তাফিজের বাসার ওই আলোচিত ঘটনা।
সিএমপি কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী জানান, বাকলিয়ায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় ডেভিড ইমনসহ জড়িত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে একাধিক টিম কাজ করছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হবে। আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের মালিক আগে থেকে চাঁদা দাবির বিষয়টি প্রশাসনকে জানাননি। এ কারণে আগে থেকে ওই প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তায় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডেভিড ইমন দাবি করেন, তিনি দুবাই আছেন। কিন্তু পুলিশের কাছে এমন কোনো রেকর্ড নেই। এমনও হতে পারে, তিনি দেশে থেকেই বিদেশে অবস্থানের কথা প্রচার করছেন সবাইকে বিভ্রান্ত করতে। এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কাজ করছে।