কুমিল্লা নগরী ও আশপাশের জনপদে যেন এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা চলছে। যেখানে উঠছে পাঁচতলা ভবন, সেখানেই ঝুলছে হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকের সাইনবোর্ড। চিকিৎসাসেবার নামে একের পর এক গড়ে উঠছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। তবে বাহ্যিক চাকচিক্য আর রঙিন বিজ্ঞাপনের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ বাস্তবতা। প্রয়োজনীয় অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও মানসম্মত চিকিৎসা ব্যবস্থার তোয়াক্কা না করেই পরিচালিত হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ।
স্বাস্থ্যসেবার আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা যে প্রতিষ্ঠানগুলোর, সেখানেই মিলছে অব্যবস্থাপনা আর অনিয়মের দীর্ঘ ছায়া। কোথাও নেই পর্যাপ্ত অবকাঠামো, কোথাও নেই আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, আবার কোথাও দক্ষ জনবলের চরম সংকট। নামের পাশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরিচয় থাকলেও বাস্তবে রোগীর সেবায় নিয়োজিত থাকেন অনভিজ্ঞ কিংবা স্বল্প দক্ষ কর্মীরা। ফলে ভুল রোগ নির্ণয়, চিকিৎসাগত অবহেলা এবং অপারেশনজনিত জটিলতা দিন দিন বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।
সবচেয়ে করুণ চিত্র দেখা যায় মাতৃস্বাস্থ্যসেবায়। যে মায়ের কোল আলো করে নতুন প্রাণ পৃথিবীতে আসার কথা, সেই মা-ই অনেক সময় ফিরছেন না সুস্থভাবে। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও চিকিৎসা মানদণ্ড উপেক্ষা করে পরিচালিত অস্ত্রোপচার, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান এবং পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণের অভাবে ঝুঁকিতে পড়ছেন অসংখ্য প্রসূতি। মাতৃত্বের আনন্দ অনেক পরিবারের জন্য পরিণত হচ্ছে উৎকণ্ঠা আর কান্নার গল্পে। একই সঙ্গে সাধারণ রোগীরাও ভুল চিকিৎসার কারণে ভোগ করছেন দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতায়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য। বাসস্ট্যান্ড, বাজার, সড়ক দুর্ঘটনাস্থল কিংবা বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রের আশপাশে ওত পেতে থাকে এক শ্রেণির দালাল। রোগীর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে নানা প্রলোভন দেখিয়ে তারা নিয়ে যায় নির্দিষ্ট হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকে। চিকিৎসার প্রয়োজন আর সময়ের চাপের কারণে অনেক পরিবার না বুঝেই পা দেয় সেই ফাঁদে। পরে চিকিৎসার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও অনেক সময় আর ফিরে আসার সুযোগ থাকে না।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কার্যকর তদারকি ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাবেই বাড়ছে এসব অনিয়ম। অনুমোদনহীন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত মানদণ্ড নিশ্চিতকরণ এবং দালালচক্র নির্মূলে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
কুমিল্লা জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লায় হাসপাতাল রয়েছে ২০১টি, ডেন্টাল ক্লিনিক ১২টি, ব্ল্যাড ব্যাংক ০২টি এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার ২৬৮টিসহ মোট ৪৮৩টি হাসপাতাল ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এলাকায় রয়েছে ১৩২টি । শুধু নগরীর ভেতরে কাগজ-কলমে ১৩২টি বলা হলেও বাস্তবে রয়েছে তিন শতাধিক। পুরো জেলায় রয়েছে ৭ শতাধিক হাসপাতাল ও ক্লিনিক।
এর মধ্যে অনিয়ম করায় সততা স্পেশালাইজড হাসপাতাল এবং কুমিল্লা আলিফ হাসপাতালকে জরিমানা করা হয়েছে। নগরীর বাদুরতলা এলাকায় এইচআর হসপিটাল বন্ধ করার কিছুদিনের মধ্যেই আবার চালু করা হয় ।
গত বছরের ১৪ এপ্রিল বিদেশি ইনজেকশনের কথা বলে ৩৪ হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে রোগীকে ৬ হাজার টাকা মূল্যের দেশি কোম্পানির ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল নগরের ঝাউতলা এলাকায় অবস্থিত মুন হাসপাতালে । সে সময় হাসপাতালটির কনসালটেশন বিভাগের সব কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মাসুক আলতাফ চৌধুরী বলেন, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এমনকি নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন কুমিল্লায়। একদিকে যাতায়াতের সুবিধা, অন্যদিকে কুমিল্লায় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল রয়েছে। একই সঙ্গে তিনটি প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ থাকায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়া যায় অনায়াসে। এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছে ক্লিনিক ও হাসপাতাল ব্যবসা। লাইসেন্স, পরিবেশে ছাড়পত্র এমনকি সিটি করপোরেশনের ব্যবসার লাইসেন্সেরও তোয়াক্কা করছে না এরা। তদারকি নেই সিভিল সার্জন কার্যালয়ের। আবার ধরতে গেলে বাধা আসে রাজনৈতিক ও চিকিৎসক সমাজের পক্ষ থেকে। সব মিলিয়ে কুমিল্লায় সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার হাল নাজুক।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কুমিল্লার উপ-পরিচালক মোসাব্বির হোসেন মুহাম্মদ রাজীব বলেন, আমাদের অধিদপ্তর থেকে তিনশ হাসপাতাল ও ক্লিনিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, বাকিগুলো অনুমোদনহীন।
জনবল সংকটের কারণে প্রতিনিয়ত অভিযান করা যাচ্ছে না । গত মাসে ৬টি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে ।
গত পাঁচ বছরে কুমিল্লায় ভুল চিকিৎসায় কতজন মারা গেছে তার সঠিক কোনো তথ্য দিতে পারেননি কুমিল্লা সিভিল সার্জন কার্যালয়। ব্যাঙের ছাতার মতো নগরীতে হাসপাতাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে স্বীকার করে কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশির আমার দেশকে বলেন, হাসপাতালের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে ছাড়পত্র নিতে হয় । অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্র দেওয়ার পরই আমরা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসক থাকলেই অনুমতি প্রদান করি । অনুমোদনহীন হাসপাতাল ক্লিনিকগুলোতে প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়ে জরিমানা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।