চট্টগ্রামের নন্দনকাননে পুলিশ সদস্যদের আটকে রেখে সাধারণ হিন্দু সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর জমি দখল করার অভিযোগ উঠেছে উগ্র সাম্প্রদায়িক সংগঠন ইসকনের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে নন্দনকানন লোকনাথ মন্দির কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে ইসকন সদস্যদের রাতভর দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
গত শুক্রবার গভীর রাতে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় ইসকনের হামলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন বলে জানা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
লোকনাথ ধাম কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, জাল কাগজের মাধ্যমে পাশের একটি পুরাতন বাড়ি দখলে নিয়ে পুরো এলাকাটিই দখলের পাঁয়তারা করছে ইসকন। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ঠুনকো অজুহাতে শুক্রবার রাতভর সংঘবদ্ধ তাণ্ডব চালায় ইসকন।
অন্যদিকে ইসকনের দাবি, তাদের প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে চলাচল ও ধর্মীয় কাজে বাধা দিচ্ছে লোকনাথ ধাম কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় সূত্র জানায়, শুক্রবার রাত ২টায় নগরের কোতোয়ালি থানাধীন নন্দনকানন এক নম্বর গলিতে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এলাকাটি সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত। নন্দনকাননের এক নম্বর গলিতে লোকনাথ ধামের পাশেই এনএন পাল ভবনে ইসকন মন্দিরের অবস্থান। ৯ বছর আগে এ এলাকার একটি ভবন দখলে নিয়ে মন্দির স্থাপন করে ইসকন। লোকনাথ ধাম পরিচালনা পরিষদের সদস্য সৌমেন পালিত নামের এক ব্যক্তির বসতঘর ইসকন মন্দির সংলগ্ন ভবনে। লোকনাথ ধামের চলাচলের পথ ব্যবহার করেই সৌমেন পালিতের পরিবার ও ইসকন মন্দিরের লোকজন যাতায়াত করেন। বেশ কিছুদিন ধরে সৌমেন পালিতের সঙ্গে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ চলছিল ইসকন মন্দিরের।
আসন্ন একটি ধর্মীয় উৎসব ঘিরে লোকনাথ মন্দিরের লোকজন সৌমেন পালিতকে তার ফেলে রাখা ইট-বালু রাস্তা থেকে সরিয়ে রাখতে বলেন। সে অনুযায়ী গত বৃহস্পতিবার তিনি নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নেন এবং খালি জায়গায় ঘর নির্মাণ শুরু করেন। কিন্তু ইসকন মন্দিরের লোকজন ওই জায়গাটি তাদের অংশ বলে দাবি করে কাজে বাধা দেয়।
এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরই জেরে শুক্রবার গভীর রাতে সংঘবদ্ধ হামলা চালান ইসকন সদস্যরা। এ সময় লোকনাথ মন্দির কর্তৃপক্ষ ও ইসকন সদস্যদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়। খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদেরও আটকে রাখে ইসকন সদস্যরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাতভর চলা সংঘর্ষে ইসকন সদস্যরা লোকনাথ মন্দিরের দিকে ইট-পাথর নিক্ষেপ করতে থাকে। এছাড়া লোকনাথ মন্দিরের প্রধান গেট বন্ধ করে পুলিশকেও ভেতরে প্রবেশে বাধা দেয় তারা। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে সাধারণ হিন্দুদের ওপর চলে ইসকনের নির্যাতন। এতে লোকনাথ মন্দিরের সাতজন আহত হন ও একজনকে কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। একই সঙ্গে সৌমেন পালিতের নির্মাণাধীন বসতঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় ইসকন সদস্যরা। প্রতিবেশীরা সৌমেনের পরিবারকে উদ্ধার করতে গেলে তাদেরও মারধর করা হয়।
এ ঘটনা নিয়ে গতকাল শনিবার দুপুরে লোকনাথ মন্দির কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় হিন্দুরা সংবাদ সম্মেলন করেন। এ সময় নন্দনকানন পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী রাকেশ দাশ বলেন, শুক্রবার রাতে আমি সৌমিন পালিতের পরিবারকে রক্ষা করতে গেলে আমাকে মারধর করে অবরুদ্ধ করে রাখে। এক পর্যায়ে আমাকে ইসকনের টি-শার্ট পরিয়ে দেওয়া হয়। আমরা ৯৯৯ কল করলেও পুলিশকে দেড় ঘণ্টা ধরে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ইসকনের লোকজন পরিকল্পিতভাবে শুক্রবার সকাল থেকে বহিরাগত লোক আনতে থাকে। রাতেই তারা ৩০০-৪০০ বহিরাগত নিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালায়। ফিল্মি স্টাইলে মাস্ক পরিধান করে চালানো হামলায় বিদ্যুৎ ও সিসিটিভি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। আমাদের ছয়-সাতজনকে পিটিয়ে আহত করা হয়। অনেকের ফোন কেড়ে নিয়ে ভিডিও ডিলিট করে দেয়। তারা যতই ধর্মের কথা বলুক না কেন, তারা কোনো ধর্মীয় সংগঠন হতে পারে না।
সংবাদ সম্মেলনে রাকেশ আরো বলেন, একজন তথাকথিত ‘প্রভু’ রড দিয়ে আমাকে হত্যা করতে আসে। তারা পুরো এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেবে বলে হুমকি দিয়ে আমাকে এলাকা ছাড়তে বলে। এ ঘটনায় লোকনাথ মন্দির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান রতন কুমার বিশ্বাস, রাহুল বিশ্বাস, মিল্টন বিশ্বাস, সৌমিন পালিতসহ কয়েকজন নারীও আহত হন।
আহত রতন বিশ্বাস বলেন, ইসকন এখানে সম্পূর্ণ অবৈধ। তারা ভারতী পালের কাছ থেকে প্রথমে একটি ছোট রুমে ঠাকুর বসিয়ে কার্যক্রম শুরু করে। পরে সেটি সম্প্রসারণ করে বড় আকারে। তাদের সব কাগজপত্র জাল।
স্থানীয় কৃষ্ণা দাস বলেন, ২০২১ সালে তারা শেফালি দাসের বাড়ি দখল করে। ২০১৮ সালে আমাকে মারধর করে এবং আমার বাড়ি ভাঙচুর করে। একইভাবে তারা তিনটি পরিবারকে পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছে। এখন সৌমেন পালিতকে কীভাবে উচ্ছেদ করা যায়, সে চেষ্টা করছে। তাদের সব কর্মকাণ্ড জঙ্গিদের মতো। গত ৯ বছর ধরে তারা আমাদের ওপর জুলুম অব্যাহত রেখেছে।
সৌমেন পালিতের স্ত্রী রুম্পা পালিত জানান, আমাদের পৈতৃক জমিতে যুগের পর যুগ বসবাস করে আসছি। কিন্তু ইসকন এখানে দখলযজ্ঞ চালাচ্ছে। পুলিশ পুরো ঘটনা শুধু দর্শকের মতো দেখেছে। তারা আমাদের উদ্ধারেও এগিয়ে আসেনি।
তিনি আরো বলেন, ইসকনের কারণে আমাদের জীবন এখন হুমকিতে। তারা আমার বসতঘর ভেঙে ঠাকুরের ছবি স্থাপন করেছে। এটি কোনো ধর্মীয় নিয়ম হতে পারে না। আমার একটি প্রতিবন্ধী ছেলে আছে। তারা আমাদের ওপর সীমাহীন নির্যাতন চালাচ্ছে।
এদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে ইসকন বাংলাদেশের মিডিয়া সম্পাদক স্বতন্ত্র গৌরাঙ্গ দাস ব্রম্মচারী বলেন, সৌমেন পালিত আমাদের জমিতে স্থাপনা নির্মাণ করছিলেন। ভারতী পাল আমাদের জমিটি আশির দশকে দানপত্র করে দিয়েছেন। আমাদের একটাই চলাচলের পথ। সেই পথকে লোকনাথ মন্দিরের লোকজন দিনদিন সংকীর্ণ করে ফেলছে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গেলে তাদের হামলায় আমাদের কয়েকজন আহত হয়েছেন। আমাদের বেকারির গ্লাস ভাঙচুর করা হয়েছে। আমরা কাউকে মারধর করিনি।
নন্দনকানন মন্দিরের অধ্যক্ষ ও ইসকন মন্দিরের সভাপতি গদাধর দাস ব্রম্মচারী বলেন, সৌমেন পালিত ছিলেন ভারতী পালের ভাড়াটে। আমরা তার কাছ থেকে ভাড়া আদায় করি না। কিন্তু আমাদের ভক্তদের আসা-যাওয়াতে তারা নানাভাবে বাধা দিচ্ছে। এছাড়া সৌমেন পালিত আমাদের আঙিনা দখল করে ঘর নির্মাণ করছিলেন। তাই আমরা সেটি সরিয়ে দিয়েছি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুক্রবার রাত সংঘর্ষ হয়।
এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ওসি আফতাব উদ্দিন বলেন, দুই পক্ষকে আমরা ডেকেছি সমাধানের জন্য। কী কারণে ঘটনাটি ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।