হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের প্রধান দুই ঘাঁটি কোতোয়ালি-পাঁচলাইশ

জমির উদ্দিন, চট্টগ্রাম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমসহ ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনামলে হত্যা ও নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর থেকে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় বারবার ঝটিকা মিছিল করে আসছে নিষিদ্ধ সংগঠনটি। মিছিলে নেতাকর্মীদের সংখ্যা ও সাংগঠনিক তৎপরতার হিসেবে কোতোয়ালি ও পাঁচলাইশ থানা এলাকায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছাত্রলীগ।

নগর পুলিশের রেকর্ড ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দুটি থানা এলাকাতেই সবচেয়ে বেশি মিছিল করেছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ। আর সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে এই দুই এলাকায়।

মহানগর পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে ছাত্রলীগ অন্তত ১৭ বার মিছিল করেছে। তবে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বিভিন্ন পেজের পোস্ট এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এখন পর্যন্ত অন্তত ২৮টি মিছিল করেছে।

থানাভিত্তিক পরিসংখ্যানে পাঁচলাইশ থানা এলাকায় এই পর্যন্ত ছয়টি মিছিল করেছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ। আর কোতোয়ালী থানায় পাঁচটি, ডবলমুরিংয়ে দুটি এবং খুলশী, চকবাজার ও বন্দর এলাকায় একটি করে মিছিল করেছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সর্বশেষ ১ জুন নগরের পাঁচলাইশ থানার জিইসি মোড় এলাকায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী নিয়ে মিছিল করে ছাত্রলীগ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কোতোয়ালী ও পাঁচলাইশ থানা এলাকায় ছাত্রলীগের ঘন ঘন তৎপরতার পেছনে মূলত তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, এই দুটি এলাকায় আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক সবচেয়ে মজবুত। দ্বিতীয়ত, এলাকা দুটিতে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ছাত্রাবাস থাকায় নেতাকর্মীদের আশ্রয় ও সমাবেশ সহজ। তৃতীয়ত, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও সরু অলিগলি পথ থাকায় নেতাকর্মীদের পক্ষে মিছিল করে দ্রুত সরে পড়া সম্ভব হয়।

গ্রেপ্তারের সংখ্যা ও ধরন বিশ্লেষণ করলেও কোতোয়ালী ও পাঁচলাইশ এগিয়ে। চলতি জুন মাসে সমন্বিত অভিযানে ৭০ জনের মধ্যে শুধু খুলশী থানা এলাকা থেকেই ১৩ জন এবং পাঁচলাইশ থানা এলাকা থেকে ছাত্রলীগের ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে, ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি জিইসি মোড়ের মিছিল থেকে চারজন গ্রেপ্তার এবং পুলিশের এক উপ-পরিদর্শককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এছাড়া, চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল কোতোয়ালী এলাকায় মিছিলের পর ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ জানায়, মিছিলগুলো এত দ্রুত শেষ হয়ে যায় যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জড়িতদের আটক করা সম্ভব হয় না। কোনো কোনো মিছিল মাত্র ১৫ সেকেন্ড থেকে তিন মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে যায়।

নগর পুলিশের (উত্তর) উপ-কমিশনার আমিরুল ইসলাম বলেন, সবচেয়ে বেশি অভিযান পরিচালনা আমি করেছি। সবচেয়ে গ্রেপ্তারও আমার জোনে বেশি। মূলত তারা (ছাত্রলীগের নেতাকর্মী) দূর-দূরান্ত থেকে এসে মিছিল করে চলে যায়। সর্বশেষ ৭০ জনের গ্রেপ্তারের মধ্যে ৬ জন এসেছে পার্বত্য অঞ্চলের খাগড়াছড়ির রামগড় থেকে। এছাড়া, ভাটিয়ারি ও পটিয়া থেকে এসে মিছিল করে দ্রুত ওই এলাকায় চলে যাওয়ারও প্রমাণ পাওয়া গেছে।

নগর পুলিশের (দক্ষিণের) উপ-কমিশনার হোসাইন মো. কবির ভূঁইয়া বলেন, আমরা নিষিদ্ধ সংগঠনের কাউকে মিছিল-সমাবেশ করার সুযোগ দেব না।

ছাত্রলীগের পুরাতন ঘাঁটি কোতোয়ালী

কোতোয়ালী থানা এলাকায় এ পর্যন্ত ছাত্রলীগের অন্তত পাঁচটি মিছিলের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রথম মিছিলটি ছিল ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের একেবারে প্রথম প্রকাশ্য উপস্থিতি। ২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে জামালখান এলাকায় চেরাগী পাহাড় মোড় থেকে শুরু হয়ে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে এসে শেষ হয় মিছিলটি। অর্ধ শতাধিক নেতাকর্মী ওই মিছিলে অংশ নেন, যাদের সবার মুখে মাস্ক পরা ছিল। একই রাতে আরেকটি মিছিল হয় খুলশীর জাকির হোসেন রোডে।

এরপর, ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর কোতোয়ালী থানার সিআরবি এলাকায় আরেকটি মিছিল হয়। ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর একই থানার গোলাম রসুল মার্কেটসংলগ্ন তিনপুলের মাথায় মিছিল হলে পুলিশ অভিযান চালায়; তবে সেদিন কাউকে আটক করেনি পুলিশ। সর্বশেষ চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল কোতোয়ালী থানাধীন রেলওয়ে বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের ঝটিকা মিছিল বের করা হয়। এরপর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

কোতোয়ালী থানা এলাকার জামালখান, চেরাগী পাহাড়, সিআরবি ও তিনপুলের মতো স্থানগুলো ঐতিহাসিকভাবেই নগরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের একাধিক কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের নেতার বাড়ি ও কার্যালয় এই এলাকায়। ফলে সাংগঠনিক যোগাযোগ ও নেতাকর্মীদের আনাগোনা এখানে তুলনামূলকভাবে সহজ বলে মনে করেন স্থানীয় রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

পাঁচলাইশে নতুন উদ্যমে ফিরছে ছাত্রলীগ

পাঁচলাইশ থানা এলাকায় ছাত্রলীগের অন্তত ছয়টি মিছিলের তথ্য পাওয়া গেছে, যা সংখ্যার বিচারে নগরের সব থানার মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালের ২৯ নভেম্বর চটেশ্বরী সড়কে মিছিল চলাকালে দুটি ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এ ঘটনার তথ্য গোপন করার অভিযোগে চকবাজার থানার চার পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়, যা নগর পুলিশ প্রশাসনে তাৎক্ষণিক প্রশ্ন তোলে।

২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সামনে মিছিল করতে গিয়ে তিনজন গ্রেপ্তার হন। এরপর ১৩ ডিসেম্বর পাঁচলাইশ ও বন্দর থানা এলাকায় একযোগে মিছিল হলে ‘অবৈধ তফসিল মানি না’ ও ‘শেখ হাসিনার কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’ স্লোগান দেওয়া হয়।

চলতি বছরের এপ্রিলে এসে পাঁচলাইশ এলাকায় তৎপরতা আরো বাড়ে। ২৪ এপ্রিল এমইএস কলেজ ছাত্রলীগের ব্যানারে মেডিকেল সেন্টার থেকে গোলপাহাড় পর্যন্ত মিছিল হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১ ও ২ জুন নগরীর ১৬টি থানায় অভিযান চালিয়ে ৭০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে পাঁচলাইশ থানা এলাকা থেকেই ছিলেন ৯ জন।

পাঁচলাইশ থানা এলাকায় এমইএস কলেজ, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড, বিভিন্ন স্কুল-কলেজের মতো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। শিক্ষার্থীদের বড় উপস্থিতি থাকায় এই এলাকা ছাত্র সংগঠনগুলোর জন্য স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।

কোতোয়ালী ও পাঁচলাইশের বাইরে অন্য থানাগুলোতেও ছাত্রলীগের মিছিলের তথ্য মিলেছে। খুলশী থানায় ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর নগর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের সামনের সড়কে মিছিল হয়। সবচেয়ে স্পর্ধার ঘটনা হিসেবে এটিই এখন পর্যন্ত আলোচিত।

বন্দর থানায় ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মিছিল হলে পরে পুলিশের এক এসআইকে কুপিয়ে জখম করা হয়। এ ঘটনায় ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বায়েজিদ বোস্তামী থানায় চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল কুয়াইশ অক্সিজেন সড়কে ছাত্রলীগের অর্ধ শতাধিক নেতাকর্মী মাথায় লাল টুপি পরে মিছিল করে। এ ঘটনায় আটজনকে আটক করে পুলিশ।

নীরব বিএনপি-জামায়াত

নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে গত বছর দেড়েকে চট্টগ্রামে একের পর এক ঝটিকা মিছিল করছে। তবে এসব কর্মসূচির বিরুদ্ধে মাঠে দৃশ্যমান কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি বিএনপি ও জামায়াত। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নগরীর রাজপথ কার্যত বিএনপি-জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে। তবু ছাত্রলীগের মিছিল প্রতিহত করতে তাদের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মসূচি বা অবস্থান দেখা যায়নি।

বিভিন্ন সময়ে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব দেখেও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে নীরব ভূমিকায় দেখা গেছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নিষ্ক্রিয়তা ছাত্রলীগকে পুনরায় সাংগঠনিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। তবে বিএনপি সরকার গঠনের আগে এনসিপি মাঠে কয়েকটি মিছিল করেছে। এছাড়া, ব্যক্তি উদ্যোগেও কেউ কেউ নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে মিছিল করেছে।

সর্বশেষ ২ জুন নগর ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সাইফের উদ্যোগে মিছিল বের করা হয়। জানতে চাইলে তিনি আমার দেশকে বলেন, আওয়ামী লীগ আমাকে তছনছ করে দিয়েছে। বাড়িঘরে গুলি করেছে। একদিনও বাড়িতে থাকতে পারিনি। তারা মিছিল করবে আমি বসে থাকব? তা হয় না।

রামগঞ্জে যুবকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

চমেক হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি

দুই দশকেও সংযোগ সড়ক না হওয়ায় কোনো কাজে আসছে না সেতু

সিঙ্গাপুরে কসমোর দুই জিমন্যাস্ট শিক্ষার্থীর স্বর্ণপদক

ট্রাকের পেছনে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় চালক নিহত

পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষ, যোগাযোগ বন্ধ

নোয়াখালীতে মাইকে ঘোষণা দিয়ে ছাত্রদলের ওপর আ.লীগের হামলা

রামগতিতে অস্ত্র ও নগদ টাকাসহ ৩ ডাকাত আটক

কুমিল্লায় যাত্রীবাহী বাসচাপায় নিহত ৩

ছাত্রলীগ-যুবলীগ ঠেকাতে এবার ছাত্রদল-শিবিরের বিক্ষোভ