কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে থাকা রোহিঙ্গাদের মাঝ থেকে প্রথম ধাপে এক লাখ ৮০ হাজার জনকে ফিরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে মিয়ানমার জান্তা সরকার।
দেশটির এই ঘোষণার পর আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মাঝে মাতৃভূমিতে ফেরার আশা জাগলেও তারা আবার শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তাদের মাঝে আনন্দ উচ্ছাস দেখা গেলেও কিভাবে মাতৃভূমিতে ফিরবেন, ফিরতে পারলেও তারা কোথায় ফিরবেন তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
রোহিঙ্গাদের মতে, মিয়ানমার সরকার তাদের ফেরত নেয়ার কথা বললেও আরাকান রাজ্য এখন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দখলে। সেখানে রোহিঙ্গাদের কিভাবে ফিরিয়ে নেয়া হবে! তবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিজেদের দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে জটিল সমীকরণ দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা কলিম উল্লাহ বলেন, দীর্ঘদিন পর এমন একটা খুশির খবর পেলাম। আমরা দ্রুত আরাকানে ফিরে যেতে চাই।
তার মতে, আরাকান আমাদের দেশ। আমাদের চিরস্থায়ী বসবাস সেখানে। আমরা সম্মানজনক ভাবে ফিরতে চাই।
উখিয়ার ১৪ নম্বর রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা আহমদ উল্লাহ জানান, আমরা ফিরতে পারলে খুশি হবো। কিন্তু কোথায় ফিরবো তা জানি না।
তিনি বলেন, আরাকান রাজ্য এখন বিদ্রোহীদের দখলে। মিয়ানমার সরকার আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে? যতদূর জেনেছি, আমাদের বসতভিটা দখল করে নেয়া হয়েছে।
উখিয়া-টেকনাফ শিবিরে বসবাসকারি রোহিঙ্গারা মনে করছেন, এই মুহূর্তে মিয়ানমারের জান্তা সরকার যতই ঘোষণা দিক না কেন, তারা (জান্তা সরকার) কোন ভাবেই প্রত্যাবাসন করতে পারবে না।
কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের শেড মাঝি হামিদ হোসেন জানান, ২০১৭ সালে তাদের বিতাড়িত করে জান্তা সরকার আবার বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেছিল রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে। এতদিন সুযোগ থাকা সত্ত্বেও না নিয়ে এখন ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলে দেশবাসি ও বিশ্বের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
উখিয়া উপজেলার রোহিঙ্গা শিবির এলাকার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজ হবে না। কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে এই প্রক্রিয়াটি চালাতে হবে।
বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক মুন্সী ফয়েজ আহমদ জানান, রোহিঙ্গা ইস্যুতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে এখনই কোন উপসংহারে পৌঁছানো উচিত হবে না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। রাখাইনের পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল, যেখানে নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সম্প্রতি জাতিসংঘের মহাসচিবও বলেছেন, রাখাইনে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই প্রত্যাবাসনের কথা বিবেচনা করা হবে। এখন সেখানে রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য বাড়িঘর নেই।
তিনি বলেন, যেসব এলাকায় রোহিঙ্গাদের বসতি ছিল, সেসব এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে? কখন, কীভাবে, কার ক্লিয়ারেন্সে তা সম্ভব হবে এসবই অনিশ্চিত।
প্রসঙ্গত, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা ঢলের শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালের ২৫ অগাস্ট। এরপর কয়েক মাসের মধ্যে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়। আগে থেকে ওই এলাকার ক্যাম্পে বসবাস করছিল আরও প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা।