পাঁচ দফা বৈঠকেও সুরাহা হয়নি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মধ্যে চলা গৃহকরসংক্রান্ত বিরোধ। দফায় দফায় এ-সংক্রান্ত যৌথ জরিপ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি সংস্থা দুটি।
সবশেষ কমিটি গৃহকরের রেজল্যুশন পাঠাচ্ছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয়ই ঠিক করবে কত টাকা গৃহকর পরিশোধ করতে হবে বন্দর কর্তৃপক্ষকে। টাকার অঙ্কের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারলেও আপাতত রেজল্যুশন পাঠানোর সিদ্ধান্তে একমত হয়েছেন কমিটির সদস্যরা। কমিটিতে বন্দর ও চসিকের কর্মকর্তারা সদস্য হিসেবে রয়েছেন।
গতকাল সোমবার চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরোয়ার কামাল বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, গৃহকরের রেজল্যুশন তৈরি করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। চলতি সপ্তাহেই বন্দরের পক্ষ থেকে এটি পাঠানো হবে।
চসিক সূত্র জানায়, বন্দর-চসিকের কর বিরোধ মেটাতে গত বছরের আগস্টে গঠিত হয় পাঁচ সদস্যের যৌথ জরিপ কমিটি। জরিপ শেষে কমিটি বন্দরের প্রায় ১ কোটি ৭৩ লাখ বর্গফুট এলাকা গৃহকর আদায়ের সীমানা নির্ধারণ করেছে। সিটি করপোরেশন চিহ্নিত সীমানার জন্য বার্ষিক গৃহকর নির্ধারণ করেছে ২৬৪ কোটি ৩৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা। তবে এ টাকায় রাজি হয়নি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, জরিপ কমিটি এ নিয়ে পাঁচ দফা বৈঠক করে। এতে অংশ নেয় কমিটির আহ্বায়ক বন্দর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য (অর্থ) মাহবুবুল আলম তালুকদার। এছাড়া কমিটির সদস্য চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা, প্রধান ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা, কর কর্মকর্তা ও বন্দরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
সদস্যরা সর্বশেষ ২৪ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম বৈঠকে মিলিত হয়। দুপক্ষই তাদের সিদ্ধান্ত থেকে কাউকে ছাড় দেয়নি। অতীতে পরিশোধের অঙ্ক নিয়ে দরকষাকষি হয় দুই সংস্থার মধ্যে।
চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এসএম সরওয়ার কামাল আমার দেশকে বলেন, যৌথ কমিটির বৈঠকে আয়তন নিয়ে আমরা একমত হয়েছি। স্থাপনার বিপরীতে বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং, পোর্ট ডিউটি, বার্থিং-আনবার্থিং, পাইলোটেজ, টাগবোট ও লেট ফিসহ বিভিন্ন ভাড়া ও আয়ের ওপর ভিত্তি করে এবং বন্দরের সক্ষমতা বিবেচনা করে চসিক পৌরকর নির্ধারণ করা হয়েছে।
আমরা আয়তন অনুযায়ী ২৬৪ কোটি ৩৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা গৃহকর নির্ধারণ করেছি। কিন্তু বন্দরে কর্তৃপক্ষ এখনো সম্মত হননি। তারা কর পরিশোধ করবে না এটা বলেনি। কিন্তু আগের অঙ্ক নিয়ে নানারকম আলোচনা হয়েছে। তারা বলছে যে, ৩০ কোটি টাকার বেশি হলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হবে। এজন্য আমরা রেজুলেশন সেখানে পাঠাব। এর আগে বন্দরের কাছে চসিকের পাওনা ১৬০ কোটি টাকা বকেয়া থাকলে দফায় দফায় আলোচনার পর ১৪৫ কোটি টাকা পরিশোধ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
কমিটির আহ্বায়ক ও বন্দর পরিচালনা পর্ষদ সদস্য মাহবুবুল আলম তালুকদার বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত করিনি। আলোচনার মধ্যে আছি। বিধি মোতাবেক ভালো একটি অ্যামাউন্ট দেব সিটি করপোরেশনকে।
এ বিষয়ে কমিটির সদস্য ও সিটি করপোরেশনের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন বলেন, যৌথ জরিপের ভিত্তিতে বন্দরের যে সীমানা আমরা ঠিক করেছি, তার জন্য বার্ষিক আমরা গৃহকর নির্ধারণ করেছি ২৬৪ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী বন্দরের কাছে ১৬০ কোটি পাবে সিটি করপোরেশন। বিপরীতে তারা সব মিলিয়ে ১৪৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। এর থেকে কম পরিশোধের সুযোগ নেই। আপত্তি থাকলে তারা এ নিয়ে আপিল করতে পারে।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ৩৪০ কোটি ৮০ লাখ টাকা গৃহকর আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে চসিক। এখন পর্যন্ত আদায় হয়েছে ২৪৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
মূলত গত বছরের আগস্টে গৃহকর নিয়ে বন্দর ও চসিকের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পঞ্চবার্ষিক পুনর্মূল্যায়নের পর চসিক বন্দরের কাছে ১৬০ কোটি টাকা গৃহকর দাবি করে। তাতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আপত্তি জানায়। তাদের ভাষ্য ছিল, ২০২১-২২ অর্থবছরে নির্ধারণ করা হয়েছে বন্দরের বার্ষিক গৃহকর ৪৫ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরেও বলবৎ থাকবে। সে বিরোধ থেকেই জটিলতা দেখা দিলে গত বছরের আগস্টে দুই সংস্থার সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।