হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য খুনিদের কাছে পৌঁছায় কীভাবে

জমির উদ্দিন, চট্টগ্রাম

রাউজানের চৌমুহনী বাজারে একটি ফার্মেসির সামনে বসে ছিলেন যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী ওরফে মাসুদ। কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটি অটোরিকশা এসে থামে। সেখান থেকে নেমে আসে কয়েকজন অস্ত্রধারী। মুহূর্তের মধ্যে গুলি। এরপর কাছ থেকে আরো গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। পুরো ঘটনা শেষ হয় দুই থেকে তিন মিনিটে। ফিল্মি স্টাইলের এ ঘটনাটি ঘটে ১৩ জুন দুপুরে।

সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়া এ হত্যাকাণ্ডের পর নতুন করে সামনে এসেছে একটি প্রশ্ন। মাসুদ কোথায় অবস্থান করছিলেন, সে তথ্য এত দ্রুত ও নির্ভুলভাবে খুনিদের কাছে পৌঁছাল কীভাবে? স্বজনদের প্রশ্ন—প্রশাসনের কেউ মোবাইল ট্র্যাকিং করে সন্ত্রাসীদের তথ্য দিচ্ছে না তো! তবে পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে স্থানীয় পর্যায়ে তথ্যদাতার কথা জানিয়েছে। প্রশাসনের কেউ তথ্য দিচ্ছে, সেটি কেউ বলেনি বলে জানান চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) সিরাজুল ইসলাম।

তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত খুনিদের ওপর ছায়া হিসেবে থাকা গডফাদারদের নির্মূল করা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত টার্গেট কিলিং চলতে থাকবে। এর আগে কোনোভাবেই এসব হত্যাকাণ্ড থামানো যাবে না বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম।

শুধু মাসুদ নন। গত প্রায় দুবছরে চট্টগ্রাম নগর ও রাউজানে সংঘটিত ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীদের এমন সময় ও এমন স্থানে আক্রমণ করা হয়েছে, যখন তাদের অবস্থান সম্পর্কে হামলাকারীদের সুনির্দিষ্ট ধারণা ছিল বলে মনে হয়। এ কারণে নিহতদের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে জোরালো হচ্ছে আরেকটি প্রশ্ন—খুনিদের হাতে কি আগে থেকেই পৌঁছে যাচ্ছিল ভুক্তভোগীদের অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্য।

পুলিশ ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাউজান ও চট্টগ্রাম শহর মিলে অন্তত ৩৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ঘটনায় নিহত হয়েছেন বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। ঘটনাগুলোর বিবরণ বিশ্লেষণ করলে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে। ভুক্তভোগীদের অনেককে হত্যা করা হয়েছে চলাচলের সময়, বাজারে অবস্থানকালে, নামাজে যাওয়ার পথে কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি থেকে ফেরার সময়।

পুলিশ জানায়, রাউজানের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমকে গুলি করা হয় জুমার নামাজে যাওয়ার পথে। বিএনপির অনুসারী ব্যবসায়ী আবদুল হাকিমকে হত্যা করা হয় চট্টগ্রাম শহরে ফেরার সময় চলন্ত গাড়ি থামিয়ে। যুবদলকর্মী আলমগীরকে আত্মীয়র বাড়ি থেকে ফেরার পথে প্রকাশ্যে গুলি করা হয়। প্রবাসফেরত বিএনপিকর্মী বাবলুকে হত্যা করা হয় নানাবাড়ি থেকে বাড়ি ফেরার সময়। যুবদলকর্মী মুজিবকে গুলি করা হয় বাজারে একটি চা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়। এছাড়া চট্টগ্রাম নগরে দুটি জোড়া খুন এবং তিনজন সন্ত্রাসী হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বজনদের প্রশ্ন—হামলাকারীরা কীভাবে এত নিখুঁতভাবে ভুক্তভোগীদের অবস্থান শনাক্ত করল।

মাসুদের এক আত্মীয় (নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ করেননি) বলেন, বাজারে তিনি কতক্ষণ আগে এসেছেন, কোথায় বসে আছেন—এসব তথ্য না থাকলে বাইরে থেকে এসে কেউ এত কম সময়ে অভিযান চালিয়ে চলে যেতে পারে না।

নিহত যুবদল নেতার এক ভাইয়ের ভাষ্য, আমার ভাই বাড়ি থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরই সন্ত্রাসীরা হাজির হয়েছে। মনে হয়েছে, কেউ যেন তাদের নিয়মিত খবর দিচ্ছিল।

সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দুতে ‘লোকেশন’

অন্তত ২০টি হত্যাকাণ্ডের সময়কাল ও ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে হামলাকারীরা দীর্ঘ সময় ওঁৎ পেতে ছিল না। বরং নির্দিষ্ট মুহূর্তে ঘটনাস্থলে এসে হামলা চালিয়েছে এবং দ্রুত সরে গেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের টার্গেট কিলিংয়ে সাধারণত তিন ধরনের তথ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর তা হলো—টার্গেটের অবস্থান, চলাচলের রুট ও সময়সূচি। এসব তথ্য স্থানীয় সোর্স, ব্যক্তিগত নজরদারি কিংবা প্রযুক্তিগত উপায়ে সংগ্রহ করা হতে পারে। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে একের পর এক ঘটনায় অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্বজনরা।

চট্টগ্রামের বায়েজিদে সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডটি চমকে দেওয়ার মতো। গত ৮ মে চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়কের রৌফাবাদ থেকে আধা কিলোমিটার পশ্চিমে শহীদ মিনার এলাকার পাশে বাঁশবাড়িয়া বিহারি কলোনিতে বোনের বাড়িতে বেড়াতে আসেন হাসান রাজু নামে এক যুবক। তিনি এসেছিলেন রাউজান থেকে। দুদিনের মাথায় তার অবস্থান জানতে পারে সন্ত্রাসীরা। তারপর ওই সরু গলি দিয়ে কলোনিটির ৮০০ গজ ভেতরে গিয়ে অস্ত্রধারীরা হাসান রাজুকে হত্যা করে।

২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট রাত ৮টার দিকে বায়েজিদ থানাধীন অনন্যা আবাসিক এলাকা সংলগ্ন নাহার গার্ডেনের সামনে দুটি মোটরসাইকেলে আসা পাঁচ যুবক অটোরিকশার দুই যাত্রীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে ঘটনাস্থলে চট্টগ্রাম ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আনিস (৩৮) নিহত হন। তার সঙ্গে থাকা মাসুদ কায়ছার (৩২) নামে এক যুবলীগ কর্মীকেও গুলি হত্যা করা হয়। সুনির্দিষ্ট অবস্থান লক্ষ্য করে তাদের হত্যা করা হয় বলে জানায় পুলিশ। তবে তথ্য কারা দিয়েছিল, সে বিষয়টি পুলিশ উদঘাটন করতে পারেনি।

গত বছরের ২৯ মার্চ রাতে নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে প্রাইভেটকারে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে দুজনকে হত্যা করা হয়। নিহত বখতিয়ার হোসেন ও আবদুল্লাহ ছিলেন তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী’ সরোয়ার হোসেনের অনুসারী। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, চান্দগাঁওয়ের বাসিন্দা সরোয়ারের ডাকেই তারা অক্সিজেন এলাকা থেকে নতুন ব্রিজ বালুর টাল এলাকায় গিয়েছিলেন। ফেরার পথে শাহ আমানত সেতু এলাকা পার হওয়ার পরই পাঁচটি মোটরসাইকেলে আসা অস্ত্রধারীরা গাড়িটি অনুসরণ করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়।

আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে আসামি মো. সজীব জানায়, হত্যার আগে বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওয়াজেদিয়া এলাকায় চার ঘণ্টা ধরে বৈঠক করে পরিকল্পনা সাজানো হয়। সেখানেই ঠিক হয় গাড়িটি কোন পথ দিয়ে যাবে, কখন আক্রমণ করা হবে। নিহত বখতিয়ারের মা ফিরোজা বেগম সাজ্জাদ হোসেন এবং তার স্ত্রী তামান্না শারমিনকে হুকুমের আসামি করে বাকলিয়া থানায় মামলা করেন।

‘ঢাকাইয়া আকবর’ হত্যা

বায়েজিদ এলাকার ইট-বালু ব্যবসায়ী আলী আকবর ওরফে ‘ঢাকাইয়া আকবর’ গত বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হন। দুদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এ হত্যাকাণ্ডে পুলিশের একটি সূত্র প্রাথমিকভাবে যে বিষয়টি উল্লেখ করেছে, তা স্বজনদের আশঙ্কাকেই সমর্থন করে। এক তরুণীর মাধ্যমে আকবরকে নির্দিষ্ট স্থানে ডেকে নেওয়া হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিল অস্ত্রধারীরা।

আকবরের স্ত্রী রূপালী বেগম ১১ জনের বিরুদ্ধে পতেঙ্গা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় মোবারক হোসেন ওরফে ইমনকে, যিনি বাকলিয়া জোড়া খুনের মামলারও আসামি। নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক ও আধিপত্যের বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়।

রূপালী বেগম বলেন, হয় আকবরের অবস্থান সন্ত্রাসীরা জানত, নতুবা অন্য কেউ আকবরের অবস্থান সন্ত্রাসীদের জানিয়েছিল।

প্রযুক্তিগত নজরদারি, নাকি স্থানীয় তথ্যদাতা

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা ও প্রযুক্তিবিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোবাইল ফোনের টাওয়ার ডেটা, কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) কিংবা অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। তবে এসব তথ্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে এবং আইনগত অনুমোদন ছাড়া ব্যবহারের সুযোগ নেই। তবে অনুসন্ধানে একটি সূত্র দাবি করেছে, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে একটি অসাধু চক্র অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্য পাচার করছে। যদিও এ দাবি স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

একটি বিশেষ সংস্থায় কাজ করা কর্নেল পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, যখন ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের ঘটনা ঘটে এবং হামলাকারীরা বারবার টার্গেটের অবস্থান সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য পায়, তখন তথ্য ফাঁসের সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এটি তদন্তের বিষয়। প্রমাণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

তার মতে, শুধু হামলাকারীদের শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; হত্যার আগে তথ্যপ্রবাহের উৎসও খুঁজে বের করতে হবে। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, হত্যাকাণ্ড তদন্তে শুধু অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার করলেই প্রকৃত চিত্র বের হবে না।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) সিরাজুল ইসলাম বলেন, এ পর্যন্ত যতজনের জবানবন্দি নিয়েছি বা ডেটা বিশ্লেষণ করেছি, কেউ স্বীকার করেনি যে, প্রশাসনের কেউ তথ্য দিচ্ছে। তবে তারা এটি স্বীকার করেছে যে, হত্যার আগে তাদের তথ্য দিত স্থানীয় সোর্সরা।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়েছে। তবে প্রশাসনের কেউ লোকেশন ট্র্যাক করে তথ্য সরবরাহ করছে—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এ ধরনের কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া গেলে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। কোনো ব্যক্তি জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় ঝুলছিলেন কুলছুমা

মেঘনায় আঞ্চলিক সড়কে কিশোরীর লাশ উদ্ধার

হোমনায় সাংবাদিককে মিথ্যা মামলা ও হাতকড়া পরানোর প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন

কুমিল্লায় প্রেমিকের বাড়িতে বিয়ের দাবিতে তরুণীর ১২ দিনের অনশন

বালতি দিয়ে জিআরের চাল বিতরণ, স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

মিয়ানমারের মর্টারশেলের বিকট শব্দে কাঁপছে সীমান্তের বাড়িঘর

কুমিল্লায় স্কুলছাত্র গুলিবিদ্ধের ঘটনায় ২৫ মামলার আসামি গ্রেপ্তার

ফেনীতে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় দুজনের মৃত্যু

যুবদল নেতার বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ বিএনপি নেতার

ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীকে ৬০০ কেজি আম উপহার পাঠাল সরকার