কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে (কুসিক) গত ১৪ বছরে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন না হওয়ায় ক্ষুব্ধ নগরবাসী। উন্নয়নের পরিবর্তে হয়েছে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য। লুটপাট করা হয়েছে হাজার কোটি টাকা। একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান (এন এস গ্যালারি) দুই অর্থবছরে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই প্রায় ২৩১ কোটি টাকার ৩১টি কাজ পায়। অভিযোগ রয়েছে, কাজ সম্পন্ন না করেই অনেক ক্ষেত্রে বিল তুলে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
দেশের অন্যতম প্রাচীন কুমিল্লা সদর পৌরসভার সঙ্গে সদর দক্ষিণ পৌরসভাকে একত্রিত করে ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কুসিক। ৫৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনে ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত হয় এ সিটি করপোরেশন। প্রায় ১০ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত এ নগরীতে অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা, ভ্রমণসহ অন্যান্য সেবা নিতেও প্রতিদিন আসেন আরো লক্ষাধিক মানুষ।
দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য কুসিকÑএমনটাই মন্তব্য করেছেন সংস্থার নবাগত প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু । গত ১২ মার্চ কুসিকের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মাথায় গত চার বছরের হিসাব তুলে ধরেন তিনি। উন্নয়নের নামে হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ তার।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৫ সালের মার্চে কুসিকে অভিযান চালায়। অভিযানে দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান (এন এস গ্যালারি) দুই অর্থবছরে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই প্রায় ২৩১ কোটি টাকার ৩১টি কাজ পায়। অভিযোগ রয়েছে, কাজ সম্পন্ন না করেই অনেক ক্ষেত্রে বিল তুলে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ বিষয়ে এখনো তদন্ত রিপোর্ট দেয়নি দুদক।
২০২১ থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার বছরে কুসিকের উন্নয়নের নামে খরচ করা হয় ৭৫০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। প্রায় হাজার কোটি টাকা খরচ করা হলেও দৃশ্যমান কোনো উন্নয়নে চোখে পড়েনি সিটি করপোরেশনে। গত ১৩ এপ্রিল এ ধরনের একটি হিসাব কুসিক প্রশাসক তুলে ধরার পর সবার চোখ কপালে ওঠে। নগরবাসীর প্রশ্নÑকী উন্নয়ন হয়েছে কুমিল্লায়?
কুসিকের জন্য ২০২২ সালে প্রায় এক হাজার ৫৩৮ কোটি টাকার প্রকল্প দেওয়া হয়। বিভিন্ন প্রকল্পে গত চার বছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা রাস্তাঘাট ও কালভার্টের নামে খরচ করা হয়। প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রাস্তাঘাট নির্মাণ করা হলেও যানজটে ঢাকাকে পেছনে ফেলার তালিকায় নাম উঠিয়েছে কুমিল্লা।
এছাড়া এলজিসিআরআরপি (কোভিড) ১৯ প্রকল্পে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খরচ করা হয় প্রায় ১৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এ সময়ে এত টাকা কোন খাতে খরচ করা হয়, তার কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইউডিসিজিপি প্রকল্পে ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত কুসিক পায় ৭৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। শুধুমাত্র ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত খরচ করা হয় ৩৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রাপ্তি ১১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এ খাতে আগের প্রারম্ভিক ছিল ৫২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। ২০২৫ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত খরচ করা হয় ১৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।
কাদের পকেটে টাকা
কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত ২০২২ সালের ১৫ জুনের নির্বাচনে কুসিকের মেয়র নির্বাচিত হন। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর ২০২২-২৩ অর্থবছরেই ১৫৩ কোটি টাকা উন্নয়নকাজের নামে লুটপাট করা হয়। তারপর ২০২৪ সালের ৯ মার্চ কুসিকের প্রথম নারী মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হন তাহসিন বাহার সূচনা। মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সূচনা সদর আসনের সাবেক এমপি বাহাউদ্দিন বাহারের মেয়ে। তার আমলেই কাজ হয় প্রায় ২৪৫ কোটি টাকার। অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে গত বছরের মার্চে তার ব্যাংক হিসাব ও স্থাবর সম্পত্তি জব্দ করা হয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রায় ১২০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ করা হয়। এ সময় কুসিকের দায়িত্বে ছিলেন বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) মহাপরিচালক সাইফ উদ্দিন আহমেদ এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শাহ আলম।
কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মাসুক আলতাফ চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, বিগত সময়গুলোয় উদ্দেশ্যহীনভাবে উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়ায় লুটপাট হয়েছে। এখন পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে পারলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বলা হয়, সবাই দুর্নীতির অভিযোগ ও বিরোধী স্লোগান তুলে আসলে দুর্নীতির নিজ ক্ষেত্র তৈরি করেন। এটাই আমাদের চর্চা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নষ্ট চর্চা থেকে বেরিয়ে জনগণের ক্ষমতায়ন করা না গেলে জবাবদিহিতা আসবে না। জবাবদিহিতা না এলে দুর্নীতির চর্চা চলতেই থাকবে। জনগণ বঞ্চিতই থেকে যাবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আলী আহসান টিটু আমার দেশকে বলেন, সবার সমন্বিত প্রয়াস ছাড়া কুসিকের উন্নয়ন আসবে না। প্রশাসক একা বিপ্লব ঘটাতে পারবেন না। প্রশাসকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার প্রচেষ্টা থাকলেই টেকসই সিটি করপোরেশন দেখতে পাব।
নবাগত কুসিক প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু আমার দেশকে বলেন, গত চার বছরে প্রায় হাজার কোটি টাকার কাজ হয়েছে সিটি করপোরেশনে। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন চোখে পড়ছে না। এত টাকা কোথায় খরচ করা হয়েছেÑএ বিষয়ে তদন্ত কমিটি করা হবে।
তিনি আরো বলেন, কুসিক দুর্নীতির আখড়া ছিল। আমি গত ১৫ মার্চ প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছি। শহরকে আমি এমনভাবে সাজাতে চাই, যেন সারা দেশের মানুষ কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশংসা করে।