জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন
কুমিল্লার ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জন নিহতের ঘটনায় ৬টি কারণ শনাক্ত করেছে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কর্মকর্তারা । তদন্ত কমিটির প্রধান কুমিল্লা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী জানান, পদুয়ার বাজার লেভেলক্রসিং ৪ গেইটম্যান, বিজয়পুর লেভেলক্রসিংয়ের দুই গেইটম্যান, লালমাই রেলস্টেশন মাষ্টার, লোকোমাস্টার দুইজন, সড়ক বিভাগ নির্মান কাজ এবং বাস চালকের দায়িত্বে অবহেলা প্রতীয়মান হয়েছে ।
এডিএম মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী জানান, তদন্তে অন্তত ৬টি বিষয়ে ব্যতয় উঠে এসেছে এবং বেশ কয়েকজন ব্যক্তি ও বিভাগ দায়ী বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে মোট ৮টি সুপারিশ করেছে কমিটি। তদন্ত প্রতিবেদনটি জেলা প্রশাসক বরাবর জমা দেওয়া হয়েছে।
তবে তদন্তে গোপনীয়তার স্বার্থে এই প্রতিবেদনের সব তথ্য মাধ্যমে হুবহু প্রকাশ করা যাচ্ছে না- বলেও তিনি জানান।
কার কী দায়?
সবচেয়ে বেশি অবহেলা ৬ গেইটম্যানের
পদুয়ার বাজার রেলগেইটের দুর্ঘটনার দিন মেহেদী হাসান ও হেলাল নামের দুই গেইটম্যানের দায়িত্বপালন করার কথা থাকলেও তারা সেখানে অনুপুস্থিত ছিলেন। তার ওপর তারা এক হাজার টাকার বিনিময়ে কাউসার ও নাজমুল নামে আরো দুই গেইটম্যানকে দায়িৃত্ব দেয়- যারা সেখানে গেইট নামাতে পারেনি; কারণ তারাও অনুপস্থিত ছিল।
এই বিষয়টি তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানতো না। এছাড়া রেলের নিয়মানুযায়ী পূর্ববর্তী বিজয়পুর রেলগেইটের মশিউর রহমান ও বাবুল হোসেন নামে দুই গেইটম্যান পদুয়ার বাজারে ফোনে ট্রেন আসার বিষয়টি জানানোর কথা থাকলেও তারা সেটি করেননি। বাবুল ও মশিউর পদুয়ারবাজারে কল দেয়ার বিষয়টি দাবি করলেও তদন্তে কললিস্ট থেকে প্রমাণিত হয় যে তারা কল করেননি। এতে তাদের দুই জনেরও দায়িত্বে অবহেলা প্রতীয়মান হয়েছে। যে কারণে এই ৬ জন গেইটম্যান তাদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তদন্ত কমিটি প্রাথমিকভাবে মূলকারণ হিসেবে ধরে নিয়েছে।
লালমাই স্টেশন মাস্টারের অবহেলা
ট্রেন যখন আপ(ঢাকামুখী)-এ থাকে তখন পূর্ববর্তী স্টেশন মাষ্টার পরবর্তী ক্রসিংগুলোতে কল করে সতর্ক করার কথা থাকরেও তিনি পদুয়ার বাজারে কল করেননি বলে তদন্তে উঠে এসেছে এবং তিনি লিখিত ভাবে তদন্ত কমিটির কাছে জানিয়েছেন। সে সময় লালমাই স্টেশনে দায়িত্বে পালন করছিলেন সহকারী স্টেশন মাষ্টার মো. বশিরুল্লাহ। তদন্ত কমিটি তার দায়িত্বে অবহেলারও প্রমাণ পেয়েছে।
ট্রেনের দুই লোকোমাস্টারের গাফেলতি
দুর্ঘটনা কবলিত ঢাকা মেইল ট্রেনের দুই লোকোমাষ্টার মো. হানিফ ও নজরুল ইসলাম লেভেলক্রসিং পারাপারের সবুজ সংকেত বা ফোনকল পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু লালমাই স্টেশন মাষ্টার কল না করার কারণে বিজয়পুর লেভেলক্রসিংয়ের গেইটম্যান হয় তো তাদেরকে কল করেননি কিংবা টর্চ বা পতাকার মাধ্যমে সবুজ সংকেত দেননি। যখন তারা কল বা সবুজ সংকেত পাননি তখন তারা ট্রেনটি গতি কমিয়ে আনার কথা রয়েছে, কিন্তু তারা সে টি করেননি। তাই তাদেরও দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি আংশিকভাবে প্রতীয়মাণ হয়েছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের দায়
তদন্তে উঠে এসছে পদুয়ারবাজার লেভেলক্রসিংয়ের ২০ ফুটের মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা টিন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। এসব স্থাপনার কারণে বাস চালক লেভেলক্রসিংয়ে উঠার সময় ট্রেনটি দেখতে পাননি। যে কারণে সড়ক ও জনপথ বিভাগেরও দায় রয়েছে বলে প্রতীয়মান হওয়ায় তাদেরকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনার কথা বলছে তদন্ত কমিটি প্রধান।
বাস চালক গতি কমাননি
দুর্ঘটনা কবলিত মামুন স্পেশাল বাসের চালক শহিদুল ইসলাম এই রুটের নিয়মিত চালক হলেও তিনি লেভেলক্রসিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা অতিক্রম করার সময় গতি কমাননি বলে তদন্ত কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়। যেখানে তার অদক্ষতার পরিচয় পাওয়া গেছে বলে তদন্ত কমটির ভাষ্য। একই সঙ্গে এই রেললাইনের ওপরে যেহেতু ওভারপাস আছে – তাই বাসটি ওভারপাসের ওপর দিয়ে যাবার কথা ছিল। কিন্তু বাস কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, তারা পদুয়ার বাজার মোড়ে যাত্রী নামানোর জন্য থামার কথা রয়েছে। কিন্তু সে দাবিটি তদন্ত কমিটির কাছে সন্তোষজনক বলে মনে হয়নি, তাই সেখানে বাস চালকেরও দায় রয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। যে কারণে বাস কর্তপক্ষের বিরুদ্ধেও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
দুর্ঘটনা প্রতিরোধে তদন্ত কমিটির সুপারিশ
এছাড়াও তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী জানান, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ৮টি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে লেভেল ক্রসিংয়ে গেইটগুলোকে যথাযথ কর্তৃপক্ষ নিয়মিত মনিটর করা উচিত, গেইটম্যানরা মাদকাসক্ত এমন অভিযোগের কারণে বলা হয়েছে- নির্দিষ্ট সময় পর পরে গেইটম্যানদের ডোপটেস্ট করা, ডোপটেস্টে তারা মাদকাসক্ত প্রমাণ পেলে প্রয়োজনে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত রাখা। লেভেলক্রসিংয়ের গেইটম্যানদের ঘরে দুই বছর ধরে বিদ্যুৎ নেই বলে প্রতীয়মান হওয়ায় রেলক্রসিংয়ের সঙ্গে সিগন্যাল লাইট ও ঘণ্টা চালু রাখতে বৈদ্যুতিক সংযোগ সচল করার সুপারিশ করা হয়েছে। গেইটম্যানদের ঘরে আসবাব ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। সড়ক কর্তপক্ষ তাদের কাজের ক্ষেত্রে যেন অবশ্যই রেল কর্তপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদি রেলব্যারিকেডগুলো ও রেলসিগন্যাল যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে এই সুপারিশ করা হয়েছে। বাস যেন সঠিক রুটে চলাচল করে এবং একরুটের বাস যেন অন্যরুটে না যায় সেই সুপারিশ করা হয়েছে। বিআরটিএ যেন এর তদারকি করেন তার কথাও বলা হয়েছে।
গত ২১ মার্চ ঈদুল ফিতরের দিন ভোররাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিং এ দুর্ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের গঠন করা তদন্ত কমিটিতে প্রধান ছিলেন কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্র্যাট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী, সহকারী পরিচালক বিআরটিএ ফারুক আলম, ময়নামতি ক্রসিং হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ আবদুল মমিন, ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মো. ইকবাল হোসেন, রেলওয়ের সহকারী পরিবহন কর্মকর্তা আসিফ খান চৌধুরী।
২১ মার্চ ভোর রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিং-এ চলন্ত ট্রেন ও বাসের সংঘর্ষে ১২ জন বাসযাত্রী নিহত হয়। এই ঘটনায় আহত হয় অন্তত আরো বিশ জন। ঘটনার পর এক বাস যাত্রীর করা মামলায় এ পর্যন্ত হেলাল উদ্দিন, মেহেদী হাসান এবং কাউসার আলম নামে তিনজন গেটমেনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব ও পুলিশ।