কুমিল্লার নিমসার কাঁচাবাজার
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কাঁচাবাজার রয়েছে কুমিল্লার নিমসারে। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণে আর বেচাকেনায় মুখরিত থাকে ২৪ ঘণ্টা। প্রতিদিন এ বাজারে হয় কোটি টাকার লেনদেন আর চাঁদাবাজি হয় প্রায় ২০ লাখ টাকা। মাসে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে কয়েক কোটি টাকা। এই চাঁদাবাজির সিন্ডিকেটে রয়েছেন বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার বুড়িচংয়ের এই বাজারটি শতবছরের পুরোনো। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সব জেলাসহ ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের ক্রেতা-বিক্রেতারা পণ্য বেচাকেনা করেন এই হাটে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ঐতিহ্যবাহী এই নিমসার বাজার ১৪৩৩ বাংলা সনের জন্য সাত কোটি ১৩ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। মোকাম ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সফিকুর রহমান ভূঁইয়া সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ইজারা লাভ করেছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ এপ্রিল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তানভীর হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে তাকে ভ্যাট ও আয়করসহ মোট ৯ কোটি ৬২ লাখ ৬৮ হাজার টাকা সাত কার্যদিবসের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বাজার কমিটির সদস্য মামুনুর রশিদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন এ বাজারে তিন হাজারের বেশি ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম হয়। এখানে পণ্য বিক্রি করলেও দিতে হয় খাজনা; আবার কিনলেও দিতে হয় খাজনা। এই খাজনা বা টোলের নামে চলছে রমরমা চাঁদাবাজি। এ বিষয়ে নিমসার বাজারে অনুসন্ধানে জানা গেছে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। বড় ট্রাক এ বাজারে ঢুকলেই দেড় থেকে দুই হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। চাঁদাবাজির অভিযোগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাজার থেকে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের ভুয়া রসিদ ও নগদ টাকা জব্দ করা হয়।
অবৈধ স্থাপনায় ২০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি
মে মাসের শুরুতে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের জায়গা থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু সেই স্থাপনায় আবারও অবৈধভাবে দখল করেছেন আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন, জামায়াতের কর্মী জাকির হোসেন, বুড়িচং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম ফারুক, আওয়ামী লীগ নেতা মারুফ, মোকাম ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি দুলাল, যুবদল নেতা আমির হোসেন, ছাত্রলীগের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি আবু নাসের সবুজ মুন্সী, যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পিন্টু মুন্সীসহ আওয়ামী লীগ-বিএনপি ও জামায়াত সিন্ডিকেটের কয়েকশ নেতাকর্মী।
সওজের দখল করা জায়গায় প্রতিদিন রাতে কোটি টাকার লেনদেন হয়। অবৈধভাবে জায়গা দখলকারীরা লাখ টাকা বিক্রি করলেই ভাড়ার নামে আট হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। কোনো ব্যবসায়ী পাঁচ লাখ টাকা বিক্রি করলে তাকে ৪০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। গুঞ্জন আছে, এ টাকার ভাগ পুলিশ, সওজ ও বিএনপির কিছু বড় নেতার পকেটে যায়। ক্যামেরা দেখলেই এসব দখলদার বাজার থেকে কেটে পড়েন।
নিমসার বাজারে খুলনা থেকে তরমুজ বিক্রি করতে আসা জাকির হোসেন জানান, এক লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করলেই দিতে হয় আট হাজার টাকা। এগুলো সরকারি জায়গা; তারপরও প্রতি লাখে আমাদের কাছ থেকে আট হাজার টাকা চাঁদা নিচ্ছেন তারা। আমরা দূর থেকে এখানে আসি। চাঁদা না দিয়ে আমাদের ব্যবসা করার কোনো সুযোগ নেই।
খাজনার নামে অতিরিক্ত আদায়
ধনিয়াপাতা বাজারে গিয়ে চোখ কপালে উঠে যায়। এখানে প্রতি কেজিতে পাঁচ টাকা খাজনা দিতে হয় বিক্রেতাকে। আর ১০০ টাকার ধনিয়াপাতা কিনলে ১০ টাকা খাজনা দিতে হয় ক্রেতাকে। কেজিতে প্রায় ১৫ টাকা খাজনা আদায় করছেন ইজারাদার।
টাঙ্গাইলের ব্যবসায়ী ওসমান গনি করলা বিক্রি করার জন্য এসেছেন নিমসার বাজারে। তিনি জানান, প্রতিবার এলেই ৪০০ টাকা খাজনা দিতে হয়। ৪০০ টাকা খাজনা না দিলে পণ্য খালাস করতে দেয় না। এগুলোর প্রতি সরকারের নজর দেওয়া উচিত।
কুমিল্লার বরুড়া থেকে সাইকেলে করে ৮০ কেজি কচুর লতি বিক্রি করতে নিমসার বাজারে এসেছেন মোহন মিয়া। তিনি জানান, ৮০ কেজি লতি বিক্রি করলে ১৬০ টাকা খাজনা দিতে হয় । কেজিতে দুই টাকা করে খাজনা নেওয়া হয়। কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, কুমিল্লায় কোনো চাঁদাবাজি চলবে না। এ বিষয়ে প্রশাসন শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
বুড়িচং থানার ওসি লুৎফর রহমান বলেন, নিমসার বাজারে চাঁদাবাজির অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছিলাম। আবারও যদি চাঁদাবাজি হয়, তাহলে আমরা ব্যবস্থা নেব। চাঁদাবাজির সঙ্গে পুলিশের কোনো সদস্য জড়িত নয়। সওজের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আগের দখলদাররাই আবার জায়গা দখল করেছে। আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছি।
সরকারি জায়গা দখল করে অবৈধভাবে ভাড়া নিচ্ছেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোকাম ইউনিয়ন জামায়াতের কর্মী জাকির হোসেন আমার দেশকে বলেন, নিমসার বাজারে বেশিরভাগ ব্যবসায়ী সরকারি জায়গায় ব্যবসা করেন।
আমার দোকান কিছুটা সরকারি
জায়গায় পড়েছে । দোকান থেকে ভাড়া তুলে চলি। সিন্ডিকেটের সঙ্গে আমি জড়িত নই।
সরকারি নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত খাজনা আদায় করছেন কেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিমসার বাজারের ইজারাদার সফিকুর রহমান ভুঁইয়া বলেন, ধনিয়াপাতা ১০ টাকা বিক্রি করলে আমরা দুই টাকা খাজনা নিই। দাম বাড়লে খাজনার পরিমাণও বাড়ে।
কাঁচাবাজারে লতির প্রতি কেজিতে দুই টাকা কেন নিচ্ছেন—এ বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতি কেজি লতিতে দেড় টাকা নিচ্ছি। এত কিছু মোবাইলে বলা যাবে না বলে তিনি ফোন কেটে দেন।
বুড়িচং উপজেলা বিএনপি সভাপতি এটিএম মিজানুর রহমান আমার দেশকে বলেন, আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ছিল কৃষকের বাজার থেকে কোনো খাজনা আদায় করা হবে না। কিন্তু নিমসার বাজারে প্রতিদিনই কৃষকের কাছ থেকে খাজনার নামে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। সরকার চেষ্টা করছে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে। এ বিষয়ে প্রশাসন আমাদের সহযোগিতা করছে না।
নিমসার বাজার থেকে পণ্য কেনা খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, পণ্য কিনে বাজার থেকে বের হওয়ার সময় বিভিন্ন পয়েন্টে গাড়িপ্রতি ২০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। দেশে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখতে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করার দাবি খুচরা ব্যবসায়ীদের।