রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে জনবলের ভয়াবহ সংকট চলমান থাকায় হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা কার্যত ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কনসালটেন্ট পদ শূন্য থাকা এবং একাধিক চিকিৎসকের বিনা ছুটিতে কর্মস্থল ত্যাগের কারণে ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রায় দেড় লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত ১৯টি জুনিয়র কনসালটেন্ট পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১০ জন। এর মধ্যে জুনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু) ডা. আলাউদ্দিন এবং জুনিয়র কনসালটেন্ট (প্যাথলোজি) ডা. নাবিলা নুজহাত দীর্ঘদিন ধরে বিনা ছুটিতে অনুপস্থিত রয়েছেন। ডা. আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে এবং ডা. নাবিলা নুজহাতের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিত আবেদন পাঠানো হয়েছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনি) ডা. সাবরিনা মেহের গত ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে যোগদান করলেও গত বছরের মে মাস পর্যন্ত তিনি সপ্তাহে মাত্র এক দিন (প্রতি বুধবার) অফিস করেছেন বলে জানা গেছে। যোগদানের পর থেকে গত ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৭টি এবং গত বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ১২টিসহ মোট ৩৯টি সিজার (অপারেশন) সম্পন্ন করেন তিনি। এপ্রিল ও মে মাসে একটি করে সিজার হলেও জুন মাসের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সিজার অপারেশন হয়নি।
এদিকে, গত ছয় মাসের বেশি সময় ধরে তিনি বিনা ছুটিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্র নিশ্চিত করেছে। হাসপাতালে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন স্টাফ দাবি করে বলেন, মাসে এক বা দুই দিন ডা. সাবরিনা মেহের আসেন। তিনি হাসপাতালে অনুপস্থিত ছিলেন, তার যথেষ্ট প্রমাণ আমাদের হাতে আছে।’
সরেজমিনে গত ছয় মাসে তার সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। তবে সর্বশেষ গত বছরের ১১ ডিসেম্বর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কর্মস্থলে উপস্থিত হন জানতে পেরে তাকে হাসপাতালের দোতলায় নার্সিং সুপারভাইজারের রুমে পাওয়া যায়। এ সময় ডা. সাবরিনা মেহেরের সঙ্গে কথা হলে তিনি আমার দেশকে বলেন, ‘চলতি বছরের জুন-জুলাই দুই মাস আমি ছুটিতে ছিলাম। এবং তার পর থেকেই হাসপাতালে আসছি। অপারেশন থিয়েটার প্রস্তুত নয়। তাই আপাতত অপারেশন করা সম্ভব হচ্ছে না। অপারেশন না হলে আমি কর্মস্থলে এসেই বা কী করব?’
হাসপাতালে বর্তমানে জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন), অর্থোপেডিক, চক্ষু, ইএনটি, চর্ম ও যৌন, ইএমও ও আইএমও—এই সাত গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ফলে মাত্র সাতজন কর্মকর্তার ওপর ভর করে চলছে পুরো হাসপাতালের কার্যক্রম।
বর্তমানে দায়িত্বশীল ১৩ জন কনসালটেন্টের বিপরীতে হাসপাতাল পরিচালিত হচ্ছে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও), তিনজন মেডিকেল অফিসার, মেডিকেল অফিসার (হোমিও), ডেন্টাল সার্জন এবং একজন এনেসথেটিস্ট দিয়ে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাও শারীরিক অসুস্থতার কারণে বেশির ভাগ সময় ছুটিতে থাকেন বলে জানা গেছে।
ঢাকা–খুলনা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এই হাসপাতালে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীরা চিকিৎসার জন্য আসেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক না থাকায় অনেক গুরুতর রোগীকে জীবন ঝুঁকিতে রেখে রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতাল কিংবা ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অনেক রোগীর পথেই মৃত্যু হয়।
প্রতিদিন আউটডোরে ৩৫০ থেকে ৪০০ রোগী চিকিৎসা নিতে এলেও চিকিৎসকের সংকটের কারণে উপসহকারী দিয়ে রোগী দেখানো হচ্ছে, যা রোগীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মারুফ হাসান আমার দেশকে বলেন, ‘আমি যোগদানের পর থেকেই গাইনি কনসালটেন্ট ডা. সাবরিনা মেহেরের অনুপস্থিত লক্ষ করি এবং অল্প কিছুদিন পরেই তিনি ছুটির আবেদন করেছিলেন। কিন্তু আমাদের এখানে গাইনি কনসালটেন্ট না থাকায় তার ছুটি অনুমোদন করা হয়নি। তিনি আমার চাকরিতে সিনিয়র হওয়ায় তাকে জোরালোভাবে কিছু বলতেও পারিনি। তবে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল এবং আপাতত তার বেতন বন্ধ রয়েছে। তবু তিনি নিয়মিত অফিস করছেন না, ফলে জুন মাস থেকেই পুরোপুরি সিজার বন্ধ রয়েছে। অপারেশন থিয়েটার (ওটি) বন্ধ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, গাইনি কনসালটেন্ট ডা. সাবরিনা মেহের নিয়মিত কর্মস্থলে এলে ওটি সমস্যার দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরো জানান, হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার সিজার করার জন্য এতদিন সক্ষম থাকলেও চিকিৎসক না থাকায় সেবা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. শরীফ ইসলাম আমার দেশকে বলেন, এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শুধু গোয়ালন্দ নয়, পার্শ্ববর্তী রাজবাড়ী সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষও চিকিৎসা নিতে আসে। হাইওয়ের পাশে হওয়ায় দুর্ঘটনার রোগীর চাপও বেশি। ৫০ শয্যার বিপরীতে প্রায়ই মেঝেতে রোগী রাখতে হয়।
তিনি জানান, ভর্তি রোগীদের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ওষুধ সরকারিভাবে দেওয়া সম্ভব হলেও বাকি ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। অপারেশন থিয়েটার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় কিছু ধুলোবালু জমেছে, তবে গাইনি চিকিৎসক নিয়মিত এলে সেটা এক দিনের মধ্যেই অপারেশন চালু করা সম্ভব। আর অপারেশন থিয়েটার বন্ধ থাকলেও তো তিনি আউটডোরে রোগী দেখতে পারেন! আউটডোরে রোগী দেখা তো তার জন্য নিষেধ নেই।
জনবলের সংকট প্রসঙ্গে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আসন্ন ৪৮তম বিসিএস থেকে নতুন নিয়োগ এলে সংকট কিছুটা কাটতে পারে বলে তার ধারণা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দ্রুত জনবলের সংকট নিরসন না হলে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সিজারসহ জরুরি ও জীবন রক্ষাকারী সেবাগুলো পুরোপুরি অচল হয়ে পড়বে, যার চরম খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকে।