ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সিদ্ধিরগঞ্জ-সোনাগাঁও) আসনে ভোটের লড়াইয়ে মোট ১১ জন প্রার্থী নির্বাচনি মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দুই জন বিদ্রোহী প্রার্থী। বিদ্রোহী প্রার্থীদেরকে ইতোমধ্যে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের একক প্রার্থী জামায়েতের হলেও একাধিক প্রার্থী ভোটের মাঠে তাদের নির্বাচনি প্রচার অব্যাহত রেখেছেন।
ভোটের মাঠে ১১ প্রার্থীদের মধ্যে ৯ প্রার্থী পুরোদমে প্রচারে ছিলেন। জামায়েতের শক্তিশালী প্রার্থী প্রথমদিকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালে, বিএনপি প্রার্থীর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরকে ভাবা হলেও, পরবর্তীতে পুনরায় জামায়াত প্রার্থীর নির্বাচনের ঘোষণায় এই আসনের হিসাব পুরোপুরি পাল্টে গেছে। বিএনপি-স্বতন্ত্রের বিরুদ্ধে জামায়েতের প্রার্থী এখনো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। বিএনপির বহিষ্কৃত দুই নেতা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায়, এই আসনে জমায়েত প্রার্থী সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন বলে মনে করছেন জনসাধারণ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে মোট ১১ জন প্রার্থীকে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপির প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নানের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন ফুটবল প্রতীক নিয়ে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন এবং ঘোড়া প্রতীক নিয়ে সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোট থেকে জামায়াতে ইসলামীর ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া (দাঁড়িপাল্লা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সী (বটগাছ), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. শাহজাহান শিবলি (রিকশা) এবং এবি পার্টির আরিফুল ইসলাম (ঈগল)।
এছাড়া গণসংহতি আন্দোলন থেকে অঞ্জন দাস (মাথাল) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে গোলাম মসীহ্ (হাতপাখা) নির্বাচনের মাঠে প্রচারণায় থাকলেও গণঅধিকার পরিষদের ওয়াহিদুর রহমান মিল্কী (ট্রাক) এবং জনতার দল এর প্রার্থী আব্দুল করীম মুন্সী (কলম)’কে প্রচারণায় দেখা যায়নি।
প্রতীক বরাদ্দের পর ১১ দলীয় জোটের জামায়াতের প্রার্থী ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন এবং খেলাফত মজলিসের মো. শাহজাহানকে সমর্থন দেন। তবে রাজনৈতিক সমীকরণ ও জনসমর্থন বিবেচনায় এই আসনে জামায়েত প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে পুনরায় প্রচারণায় নামেন। অন্যদিকে রিকশা প্রতিকের প্রার্থী শাজাহান শিবলীকে দলের আমির মামুনুল হক সরে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দিলেও তাকে প্রচারে দেখা গেছে। এছাড়া জোটের আরেক প্রার্থী আরিফুল ইসলামও (ঈগল) এখনো মাঠে রয়েছেন।
এই আসনের প্রার্থীদের মধ্যে বাগ্যুদ্ধ বিদ্যমান। গণসংযোগে বিএনপি প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা একে অপরকে নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডও নেই এবং নানা ধরনের হুমকি-ধামকির অভিযোগও তুলেছেন জামায়েতের প্রার্থী। নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে এই তিন প্রার্থীই রয়েছেন শক্ত অবস্থানে।
বিএনপি প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেন, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক এমপি সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার ভোটারদের নানাভাবে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। সিদ্ধিরগঞ্জের যারা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে কাজ করছেন, তাদেরকের এবং কর্মী-সমর্থকদের নানাভাবে ধমকি দিচ্ছেন। এমন অভিযোগ প্রতিদিনই আমার কর্মী-সমর্থকরা আমার কাছে জানাচ্ছে।
নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে তিনি শতভাগ আশাবাদী জানিয়ে বলেন, গত ১৭ বছরে এলাকার মানুষের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিলো এবং তাদের সমস্যা সমাধানে সবসময় আমি পাশে ছিলাম। সেই কাজের প্রতিফলন এ নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে পাওয়া যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এ আসন থেকে ইন-শা-আল্লাহ আমি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবো বলে মনে করি।
অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনকে বিভিন্ন সময় গণসংযোগকালে পাল্টা বিএনপির প্রার্থী ও তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে হুমকি-ধামকি, ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলাসহ নানা অভিযোগ তুলতে শোনা গেছে। এছাড়া সাবেক এই সংসদ সদস্য বিএনপির প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
এদিকে নানা বিষয়ে অভিযোগ তোলেন জামায়েত ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ ইকবাল হোসেন ভূইয়া। তিনি আমার দেশকে বলেন, এখানে আমরা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলতে যেটা বুঝি তা খুব ভালো দেখছি না। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে যারা নিজেদের বড় রাজনৈতিক দল মনে করে এবং যারা মনে করে তারা খুব তাড়াতাড়ি পাওয়ারে চলে এসেছে, তারা নির্বাচনের প্রকৃত পরিবেশ নষ্ট করছে। হুমকি-ধামকি, দেখে নেবো, হিসাব কষে কষে নেবো, গোয়েন্দা লাগিয়ে রেখেছি, নানান শব্দচয়নের কারণে সাধারণ জনগণের মাঝে কিছুটা বিভ্রান্তি আছে।
এছাড়া কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা নেই জানিয়ে শতভাগ জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী জামায়েতের এই নেতা। তিনি বলেন, আমরা আশা করছি ১২ তারিখের নির্বাচন অত্যন্ত ফ্রি, ফেয়ার এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক হবে। জনগণ তাদের প্রতিনিধি পাঁচ বছরের জন্য বাছাই করে নেওয়ার সুযোগ পাবে। দাড়ি পাল্লার পক্ষে মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। আমরা শতভাগ আশাবাদী, নির্বাচনে আমরা বিপুল ভোটে জয়লাভ করবো, ইনশাআল্লাহ।
সবমিলিয়ে এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী, জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের সমঝোতা সংকট এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগ নির্বাচনি পরিস্থিতিকে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে। ভোটের দিন এই আসনে উত্তেজনাপূর্ণ ভোটের লড়াইয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।