অনেক স্বপ্ন নিয়ে পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে জীবনের ঝুঁকি অবৈধ পথে দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন কিছু তরুণ! তাদের স্বপ্ন, যেভাবেই হোক স্বপ্নের দেশ ইতালিতে পৌঁছাতেই হবে। এভাবে ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়েই অবৈধ পথে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগরে প্রাণ দিচ্ছেন অনেকেই। তবু থেমে নেই অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন। অনেকের কাছে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার সময় মারা যাওয়াটা নিছক একটা দুর্ঘটনা।
মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার বাঁশকান্দি এলাকার তিন যুবক বাড়ি ছাড়েন ইতালি যাত্রার স্বপ্ন নিয়ে। স্বপ্ন ছিল ইতালি পৌঁছে পরিশ্রম করে উপার্জন করবেন অনেক টাকা। আর্থিকভাবে সচ্ছল হবে পরিবার। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইতালির উদ্দেশ্যে লিবিয়ায় যায় এই তিন যুবক। তবে ১৪ মাস আগে লিবিয়া গেলেও ইতালি যাত্রার ভাগ্য পরিবর্তনের 'গেম' হয়নি তাদের। অন্যদিকে পরিবারগুলো খুইয়েছেন ৪০ লাখ করে টাকা! শেষমেশ গেমের কথা বলে বিক্রি করে দেয়া হয় মাফিয়াদের কাছে। সম্প্রতি ওই তিন যুবককে বেঁধে নির্যাতনের একটি ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে চাওয়া হয় আরও বিশ লাখ করে টাকা! নির্যাতনের ভিডিও দেখার পর দিশেহারা হয়ে পড়ে পরিবারগুলো। অন্যদিকে গাঢাকা দিয়েছে স্থানীয় দুই দালাল।
তিন যুবককে লিবিয়ায় আটকে রেখে 'গেম'-এর নামে ৪০ লাখ টাকা নিয়ে নির্যাতন করে মাফিয়ারা। ভিডিও কলে মাফিয়ারা মুক্তিপণ দাবি করে বলে জানা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায় , মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার বাঁশকান্দি ইউনিয়ন। বিলপদ্মা নদীর কোল ঘেঁষে নাওরা চর শেখপুর গ্রাম। গ্রামের ৬ যুবক স্থানীয় দালালের মাধ্যমে ইতালির উদ্দেশ্যে লিবিয়া পৌঁছায়। প্রায় ১৪ মাস আগে লিবিয়া গেলেও ৬ যুবকের ৩ জন বেশ কয়েক মাস আগেই পৌঁছে যায় ইতালি। ভাগ্য বিড়ম্বনার ফাঁদে পড়ে যায় চুন্নু তপাদারের ছেলে সবুজ তপাদার (২৫), আলাউদ্দিন খানের ছেলে আলমাস খান (২৫) ও নূর ইসলাম ফরাজীর ছেলে সজীব ফরাজী (৩৩)। ১৪ মাসে 'গেম'-এর আশায় ৪০ লাখ টাকা খুইয়েছে পরিবারগুলো। গেম না দিয়ে অবশেষে মাফিয়াদের হাতে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে তিন যুবককে। সম্প্রতি তিনজনকে বেঁধে মারধর করার একটি ভিডিও পরিবারের কাছে আসে। মাফিয়ারা দাবি করেন আরও টাকা!
সরেজমিন ওই তিন যুবকের বাড়িতে গেলে তাদের পরিবারের সদস্যরা জানান,' বাশকান্দি এলাকার নূর আলম ও সেলিম নামে দুই দালালের মাধ্যমে সমস্ত টাকা লেনদেন হয় ছেলেদের ইতালি পৌঁছে দেয়ার জন্য। গেমের অপেক্ষায় লিবিয়া আটকে থাকে তারা। এক মাস ধরে ছেলেদের সাথে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে পরিবারের ফোনে নির্যাতনের ভিডিও চিত্র পাঠানো হলে গ্রামে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। গাঢাকা দেয় দালাল নূর আলম ও সেলিম। এদিকে ভুক্তভোগী পরিবার মামলা দায়ের করলে দালালদ্বয়ের স্ত্রীদের গ্রেফতার করে পুলিশ। মাফিয়াদের কাছ থেকে মুক্তি পেতে আরও ২০ লাখ করে টাকা চাচ্ছে বলেও জানান তারা। জমি বিক্রি করে, ঋণ করে টাকা এনে দালালদের হাতে দিতে দিতে এখন নিঃস্ব পরিবারগুলো। সন্তানদের দুশ্চিন্তায় এখন রাত কাটছে নির্ঘুম।
এলাকাবাসী জানান,' ইতালি নেয়ার কথা বলে সেলিম ও নুর আলম টাকা নিছে। তার ছেলেও ওদের সাথে লিবিয়া গেছে। সেখান থেকে ইতালিও পৌঁছেছে অনেক আগে। শুধু এই তিনজন আটকে আছে দালাল চক্রের কাছে। কয়েক দফায় টাকা নিছে। এখনও নানাভাবে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে ভুক্তভোগীদের।
লিবিয়ায় নির্যাতনের শিকার বন্দি সজীব ফরাজীর মা শেফালী বেগম বলেন, 'আমার ছেলেকে ১৪ মাস আগে লিবিয়া নিছে। তারা গেম তো দেয়ই নাই, মাফিয়াদের কাছে বিক্রি কইরো দিছে। এখন আরো ২০ লাখ টাকা চায় নতুন করে । নির্যাতনের ভিডিও পাঠানোর পর দালাল নুর আলম আর সেলিম পলাইছে। গ্রামের লোকজন পুলিশকে জানাইছিল। ওদের বিরুদ্ধে আমি মামলাও করছি। এরপর লোক দিয়া হুমকি দেয় ওরা। আমি আমার ছেলেকে ফেরত চাই। সর্বস্বান্ত হইয়া গেছি। এখন ছেলেটা সুস্থভাবে বাড়ি ফিরলেই আমাগো শান্তি!'
লিবিয়ায় বন্দি আলমাস খানের বাবা আলাউদ্দিন খান বলেন, 'প্রথমে মোট ১৭ লাখ টাকার চুক্তি হয় দালাল নুর আলমের সাথে। ১০ লাখ টাকা লিবিয়া পৌঁছানোর পর এবং ৭ লাখ টাকা ইতালি পৌঁছানোর পর দেবার কথা থাকে। গত বছর আমার ছেলেসহ মোট ৬ জন লিবিয়া যায়। ধারদেনা কইরা টাকা জোগার করে দালালকে দেই। লিবিয়া নেয়ার পর গেমের কথা বইলা দফায় দফায় টাকা নেয়। ৪০ লাখ টাকা গেছে। জমি বিক্রি কইরা টাকা দিছি। এখন শুনি আমার ছেলেরে মাফিয়ার কাছে বিক্রি কইরা দিছে। গত সপ্তাহে মারধর করার ভিডিও পাঠাইছে!'
এ সময় আলমাসের মা চায়না বেগম বলেন, 'আমার পোলাডারে মারতে মারতে শ্যাষ কইরা ফালাইতেছে। আরও ২০ লাখ টাকা চায়। আমার তো সব শ্যাষ হইয়া গেছে। আমরা এখন কি করমু।’
আরেক বন্দি সবুজ তপাদারের মা পারুল বেগম বলেন, 'আমার ছেলেসহ তিনজনরে মারধর করে ভিডিও পাঠাইছে। মুক্তিপণের জন্য ২০ লাখ টাকা চায়। আগে ৪০ লাখ তো দিছি। আমার বড় একটা গরুর খামার ছিল। সব গরু বিক্রি কইরা দিছি। সব শ্যাষ আমার। এখন না জানি পোলাডা কেমন আছে!'
এ বিষয় জানতে চাইলে শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম জানান, 'লিবিয়ায় নির্যাতনের ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। দুইজন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।'