চাঞ্চল্যকর ত্বকী হত্যা
নারায়ণগঞ্জের মেধাবী শিক্ষার্থী তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও মামলাটির অভিযোগপত্র (চার্জশিট) এখনো আদালতে জমা পড়েনি। বহুল আলোচিত এ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ এ পর্যন্ত ১০৫ বার পিছিয়েছে। ত্বকীর পরিবার ও মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতাসীনদের প্রশ্রয়ের কারণেই বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে থমকে আছে।
তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও বিচারের আশা ছাড়ছেন না ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি আশা করছেন, বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ত্বকী হত্যার বিচার নিশ্চিত করবেন।
২০১৩ সালের ৬ মার্চ নগরীর শায়েস্তা খাঁ সড়কের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং তদন্তের দায়িত্ব পায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)।
তদন্তের একপর্যায়ে সুলতান শওকত ভ্রমর, ইউসুফ হোসেন লিটনসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে ভ্রমর ও লিটন আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানান, আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ত্বকীকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়।
২০১৪ সালের ৫ মার্চ র্যাব এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, ওসমান পরিবারের নির্দেশে তাদের কথিত টর্চার সেলে আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করেছে। একই সময়ে র্যাব দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিলের আশ্বাস দেয়। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির এক যুগ পরও আদালতে অভিযোগপত্র জমা পড়েনি।
মামলার তদন্ত থমকে যাওয়ার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে। ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল মারা যান মামলার অন্যতম অভিযুক্ত আজমেরী ওসমানের বাবা ও জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য একেএম নাসিম ওসমান।
এর কিছুদিন পর ৭ জুন জাতীয় সংসদে নাসিম ওসমানের শোক প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওসমান পরিবারের পাশে থাকার ঘোষণা দেন। ত্বকীর পরিবারের দাবি, এরপর থেকেই মামলার তদন্ত কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
সর্বশেষ গত ১ জুলাই নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হুদা চৌধুরীর আদালতে তদন্ত কর্মকর্তা র্যাবের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দীপক চন্দ্র মজুমদার লিখিতভাবে আরো সময়ের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১২ আগস্ট নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। এর মধ্য দিয়ে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় ১০৫ বারের মতো বাড়ানো হয়।
এর আগে ১ জুন আদালত তদন্ত কর্মকর্তাকে ১ জুলাইয়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারও আগে ২৬ এপ্রিল সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সময় বাড়ানোর আবেদন মঞ্জুর করা হয়।
সর্বশেষ শুনানিতে আদালতে হাজিরা দেন আসামি জামসেদ, ইউসুফ হোসেন, কাজল হাওলাদার, সাফায়েত হোসেন, ইয়ার মোহাম্মদ পারভেজ ও রিফাত বিন ওসমান। অন্যদিকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর সুলতান শওকত ভ্রমর, সালেহ রহমান ও আবদুল্লাহ আল মামুন পলাতক রয়েছেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট প্রদীপ ঘোষ জানান, গত ২ জুন তদন্ত কর্মকর্তা পলাতক আসামি সালেহ রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিলেন। তবে তিনি পলাতক থাকায় এবং তার বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর না হওয়ায় আদালত জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ নেই বলে জানায়।
ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি বলেন, চার্জশিট কেন দেওয়া হচ্ছে না, আমরা এবং আপনারা সবাই জানি। প্রশাসনের গাফিলতি না থাকলে একটি মামলার তদন্ত এত বছর ঝুলে থাকতে পারে না।
তিনি আরো বলেন, আমরা এখনো রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতি আস্থা রাখতে চাই। শুধু ত্বকী হত্যার বিচার নয়, সাগর-রুনি, তনু, নারায়ণগঞ্জের আশিক, চঞ্চল, বুলু, মিঠুসহ সব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের হত্যারও বিচার চাই।
ত্বকী হত্যার পর প্রতি বছর মার্চ মাস এলেই নতুন করে আলোচনায় আসে মামলাটি। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন জমা না হওয়ায় বিচারের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াই শুরু করা সম্ভব হয়নি। একদিকে সাক্ষ্য, জবানবন্দি ও তদন্তে একাধিকবার ওসমান পরিবারের নাম উঠে এসেছে, অন্যদিকে তেরো বছর পরও আদালতে চার্জশিট না পৌঁছানোয় বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
ত্বকী হত্যার পর প্রতি বছর মার্চ মাস এলেই মামলাটি নতুন করে আলোচনায় আসে। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হওয়ায় বিচারের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াই শুরু করা সম্ভব হয়নি। এতে বিচারপ্রত্যাশীদের ক্ষোভ ও হতাশা ক্রমশই আরো গভীর হচ্ছে।