সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়েই ভাবছে এনসিপি
মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসন আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত। বিগত আওয়ামী লীগের আমলে এ আসনের এমপি নুর-ই-আলম চৌধুরী লিটনের একচ্ছত্র নেতৃত্ব ছিল। তিনি মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসন থেকে সাতবারের সংসদ সদস্য ছিলেন। আওয়ামী লীগের সময় তিনি অন্য কোনো দলকে এ আসনে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করতে যা কিছু করার তাই করতেন। কথিত আছে বিরোধীদল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে তিনি বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করতে গোপনীয়ভাবে সহযোগিতা করতেন।
এলাকার রাজনীতি সচেতন মানুষ ও ভোটাররা মনে করেন লিটন চৌধুরীর রাজনৈতিক কৌশলের কারণেই মাদারীপুর-১ শিবচর আসনে লিটন চৌধুরীর বিপক্ষে তার দলেরও কেউ প্রার্থী হতে পারতেন না। কিন্তু দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নুর-ই-আলম চৌধুরী লিটন জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পতনের পর থেকেই পলাতক রয়েছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে দুদকের এবং ছাত্রহত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
ক্ষমতার পালাবদলে বদলে গেছে মাদারীপুর-১ শিবচর আসনের রাজনীতির চিত্রও। ৫ আগস্টের পর বিগত ১৬ বছর হামলা-মামলা, জেল-জুলুম নির্যাতনসহ নানা প্রতিহিংসার শিকার নির্যাতিত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পরে রাজনীতিতে নতুন জীবন ফিরে পায়। তাই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের গণসংযোগ ও মাঠপর্যায়ের তৎপরতা অনেকটাই বেড়ে চলেছে।
গত ঈদুল ফিতরের পর থেকেই রাজনৈতিক কর্মসূচি ছাড়াও বিভিন্নভাবে গণসংযোগ করছেন তারা। ভোটারদের বাড়িতে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে বিয়ে, মেজবান, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হাজির হচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, হেফাজত ইসলাম তাদের নির্বাচনি মাঠ গোছাতে তাদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নিজেদের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার কথা ভোটারদের জানান দিচ্ছেন। বিভিন্ন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছেন তারা।
এই আসনে বিএনপিতেই মনোনয়ন প্রত্যাশী আপন ভাইবোনসহ অর্ধ-ডজনের বেশি প্রার্থী। মাঠে পরস্পরের আবার রয়েছে আলাদা বলয়।
বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি নাজমুল হুদা চৌধুরীর (মিঠু) মৃত্যুর পর প্রায় অর্ধযুগেরও বেশি সময় ধরে শিবচর উপজেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়নি। ফলে তৃণমূলেও কমিটি না থাকায় দলীয় শৃঙ্খলার ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন তৃণমূল বিএনপির কর্মীরা।
বিএনপিতে মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রার্থীরা হলেন— জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী লাভলু, শিবচর উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক কামাল জামান নুরুদ্দিন মোল্লা, উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইয়াজ্জেম হোসেন রোমান, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবু জাফর চৌধুরী, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. রোকন উদ্দিন মিয়া, মাদারীপুর জেলা বিএনপির সদস্য নাদিরা মিঠু চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য নাভিলা চৌধুরী, জেলা বিএনপির সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান মিয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাসার সিদ্দিকী।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির নেতারা আলাদা আলাদা সভা-সমাবেশ করছেন। বিএনপির নানাভাগে বিভক্ত থাকায় দলের সাধারণ সমর্থকদের মধ্যেও রয়েছে হতাশা। তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন কেন্দ্র থেকে একজন যোগ্য প্রার্থী ঘোষণা করলে এই আসনটি বিএনপি পাবে।
মাদারীপুর-১ শিবচর আসনের প্রার্থীর ব্যাপারে জানতে চাইলে শিবচর পৌরসভা বিএনপির সাবেক সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন শফিক বলেন, দীর্ঘদিন পর সাধারণ ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবে। এখানে বিএনপির একাধিক প্রার্থী রয়েছেন। তবে দল যাকে ধানের শীষের মনোনয়ন দেবে আমরা তাকে জয়যুক্ত করার চেষ্টা করব।
মাদারীপুর-১ শিবচর আসনের মনোনয়নের বিষয়ে জানতে চাইলে মাদারীপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী লাভলু আমার দেশকে বলেন, বিএনপির একটি বড় দল, এখানে মনোনয়নের ব্যাপারে প্রতিযোগিতা থাকতেই পারে। আমি ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী ছিলাম। দলের বিপদের সময় পালিয়ে যাইনি। আশা করি দল আমাকে মূল্যায়ন করবে এবং আমি মনোনয়ন পাব।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী বিএনপির একাধিক প্রার্থী এবং গ্রুপিংয়ের সুযোগ কাজে লাগাতে চায়। শিবচর উপজেলার আমির মাওলানা সারোয়ার হোসেন মৃধাকে চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। তিনি শিবচর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন, গ্রামের হাটবাজারে গণসংযোগ করছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সভা-সমাবেশ করে নিজের প্রার্থিতা জানান দিচ্ছেন।
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হলে তিনি নির্বাচনে জয়ী হবেন বলে আশাবাদ জানান।
জামায়াতে ইসলামীর শিবচর পৌর শাখার আমির মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, এ উপজেলায় আগামী নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এই দুটি দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
এদিকে ইসলামী আন্দোলন মাওলানা আকরাম হোসাইনকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তিনি সভা-সমাবেশের পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শিবচর উপজেলা শাখার সভাপতি হাফেজ জাফর আহমাদ বলেন, আমরা শিবচর উপজেলার সব জায়গায়ই প্রচুর সাড়া পাচ্ছি। আগামী নির্বাচন যদি সুষ্ঠুভাবে হয় তবে আমরা জয়ের ব্যাপার আশাবাদী।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) খুব শিগগির ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি গঠনের কাজ শুরু করবে। নির্বাচনে প্রার্থীর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি বলে জানান এনসিপির শিবচর উপজেলার প্রধান সমন্বয়কারী রাজু আহমেদ।