কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার বাহিরচর ইউনিয়নের মসলেমপুর এলাকায় গঙ্গা বাঁধ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ৪৬ বছর পর পাংশায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার মানুষ । তারা গঙ্গা বাঁধ প্রকল্প ভেড়ামারার বাহিরচর ইউনিয়নের মসলেমপুর এলাকায় করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন । পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারাজটি নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট এবং একটি নেভিগেশন লক। পরে ব্যারাজের ওপর দিয়ে রেলওয়ে সেতু নির্মাণের পাশাপাশি প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সংস্থান রাখা হবে। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সুফল পাবে দেশের চারটি বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলা। এর মধ্যে খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
জানা গেছে, ১৯৮০ সালের ২৭ ডিসেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকারের আমলে ভেড়ামারার বাহিরচর ইউনিয়নের মসলেমপুর এলাকায় গঙ্গা বাঁধ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন তৎকালীন পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার-উল-হক। এখন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারাকে বাদ দিয়ে রাজবাড়ীর পাংশায় পদ্মা ব্যারাজ হতে যাচ্ছে। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পদ্মা ব্যারাজ পুনর্বিবেচনার দাবি জানান এলাকাবাসী।
জানা যায়, ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা ব্যারাজ (১ম পর্যায়) প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান। এই নেতিবাচক প্রভাব থেকে দেশ ও পরিবেশকে বাঁচাতে সরকার দুই পর্যায়ে মোট ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যার প্রথম ধাপ একনেক সভায় পাশ হলো। জানা গেছে, ১৯৮০ সালের ২৭ ডিসেম্বর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ সংলগ্ন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার মসলেমপুর এলাকায় গঙ্গা বাঁধ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল। এই প্রকল্পের লক্ষ্য দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে ১০ জেলায় ৬১ লাখ ৪০ হাজার একর কৃষিজমিসহ বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ভেড়ামারার গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের আওতায় ৪ লাখ ৮৮ হাজার একর জমিতে কৃষকদের সেচ সুবিধা প্রদান। কুষ্টিয়াসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, মৎস্য ও কৃষি সম্পদের উন্নয়ন, বনায়ন, লবণাক্ততা রোধ, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা, পরিবেশের সম্যক উন্নয়ন তথা পানির বৈচিত্র্য রক্ষার লক্ষ্যে গঙ্গা বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। গত ৪৬ বছর আগে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার নিদর্শন এখনো রয়েছে। সেই সময় কাজ বলতে শুধু হয়েছিল—পদ্মার তীরে মসলেমপুর গ্রামে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও রিসার্চ মডেল তৈরি করা হয়। এছাড়া রাজবাড়ীর হাবাসপুর ঘাটে টাওয়ার নির্মাণ এবং স্টাডি ওয়ার্কের নামে ব্যয় করা হয় কয়েক কোটি টাকা।
ভেড়ামারায় গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের ১৯৬২-৬৩ সাল থেকে আনুষ্ঠানিক চাষাবাদ শুরু হয় । কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা, যশোরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার সেচ সুবিধাপ্রাপ্ত কৃষিজমিতে যখন উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে তিনগুণে দাঁড়ায়, তখনই প্রয়োজন হয় ব্যাপক পানির চাহিদা। পরবর্তীতে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহারে বিরূপ প্রভাব পড়তে থাকে। চাষাবাদ সুবিধার জন্য জোরালো হয় গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের দাবি। তিন কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষ মডেল স্টাডির কাজ শুরু হয়। ভেড়ামারার মসলেমপুরে ক্রয় করা হয় ১২ বিঘা জমি। সেখানে নির্মাণ করা হয় রেস্টহাউস। ৪৫৬ মাইল বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ছাড়াও জেলা ওয়ারী উপকৃত ধরা হয়েছিল কুষ্টিয়ার ৮ দশমিক ১৬৪ লাখ একর, পাবনার ৩ দশমিক ৮৬৩ লাখ একর, যশোরের ১৫ দশমিক ৯৮১ লাখ একর, খুলনার ৬ দশমিক ৩৭৬ লাখ একর, ফরিদপুরের ১১ দশমিক ৬৪১ লাখ একর, রাজশাহীর ১২ দশমিক ৪৭৭ লাখ একর এবং বরিশালের ১ দশমিক ৭৪৮ লাখ একর জমি।
১৯৮০ সালে গঙ্গা বাঁধ নির্মাণ পরিকল্পনায় ছিল ১০ জেলার ৬০ লাখ ৪০ হাজার একর জমি সেচ ব্যবস্থাধীনে আনা। পাশাপাশি কুষ্টিয়ার গড়াই, হিসনা ও চন্দনাসহ পদ্মার শাখা নদীগুলোতে পানি প্রবেশ করে বিভিন্ন জেলায় প্রয়োজনীয় সেচ সুবিধা বজায় রাখা। ১৯৮৪ সালে নতুন পরিকল্পনায় গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯ হাজার ২২৫ কোটি ৬০০ টাকা। শুধু পরিকল্পনা চূড়ান্ত ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দ ছিল ৬৩ কোটি টাকা। সে সময় বলা হয়েছিল চার বছর চলবে এই যাচাই প্রক্রিয়া। আর গঙ্গা বাঁধ নির্মাণে সময় লাগবে পরবর্তী ১২ বছর। সব মিলিয়ে ব্যয় হবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। ১৯৮০ সালের পরিকল্পনা অনুযায়ী গঙ্গা বাঁধের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হয় ৬ হাজার ৯৯০ ফুট। ভারতের ফারাক্কার বিকল্প বাঁধ বা এন্টি ফারাক্কা হিসাবে গঙ্গা ব্যারাজে গেটের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় ১০০টি। ৬০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩৫ ফুট প্রস্থ বিশিষ্ট এসব গেটে পানির নির্গমন ক্ষমতা ধরা হয়েছিল ২৫ লাখ কিউসেক। একই সঙ্গে বিশাল জলধারা সৃষ্টি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। গঙ্গা কপোতাক্ষ প্রকল্পের প্রয়োজনীয় জমিতে সেচ সরবরাহ করে পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার পর্যাপ্ত জমিতে চাষাবাদের সুদূর প্রসারি পরিকল্পনা ছিল। বাঁধ নির্মাণ করে ১.৫০ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে অতিরিক্ত সেচ সুবিধার পাশাপাশি মাটির আর্দ্রতা রক্ষা করে অতিরিক্ত লোকের কর্মসংস্থান করাও ছিল এ প্রকল্পের আরো একটি লক্ষ্য। প্রকল্পটি চালু হলে, একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের মরে যাওয়া ২৫টি নদীর প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ১৯৯৬ সালে ভারতের সঙ্গে হওয়া গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। এমন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।