আওয়ামীপন্থিদের যোগসাজশে স্থাপনা নির্মাণ
দেশের অন্যতম বেসরকারি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন যশোর ইনস্টিটিউটের জমির একাংশ দখল করেছেন আওয়ামী সন্ত্রাসী আলমগীর কবির সুমন ওরফে হাজি সুমন। সেখানে অবৈধভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের অপসারিত ও পলাতক এ কাউন্সিলর।
জায়গাটি যশোর ইনস্টিটিউটের হলেও সুমন সেটি নিজের আয়ত্তে নিয়েছেন পৌরসভার কাছ থেকে। আবার পৌরসভার তৎকালীন মেয়র (বর্তমানে পলাতক) জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টুর সুপারিশে কোনো ধরনের বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই ভবনটিতে ছয়টি মিটারসহ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
কাউন্সিলর হাজি সুমন তখনকার মেয়র রেন্টু চাকলাদারের যোগসাজশে এ অপকর্মটি করলেও চুক্তিপত্র হয়েছে মো. ফিরোজ কবীর ও শাহানাজ পারভিন মায়া নামে দুজনের নামে। মায়া হলেন হাজি সুমনের স্ত্রী। আর ফিরোজ কবীর হলেন হাজি সুমনের নিকটজন। শেখ হাসিনার শাসনামলে হাজি সুমনের প্রভাবে ফিরোজ ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন।
ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় সুমনের দাপটের মুখে কিছু করতে না পারলেও সম্প্রতি ফিরোজ-মায়ার দখল থেকে জমি উদ্ধারে তৎপর হয়ে উঠেছে যশোর ইনস্টিটিউট। অবস্থা বেগতিক দেখে দখলদাররা উচ্চ আদালতে গিয়ে ভবন রক্ষার চেষ্টা করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর যশোর পৌরসভা বনাম শহরের পোস্ট অফিসপাড়ার ফিরোজ কবীর ও শাহানাজ পারভিন মায়ার মধ্যে একটি চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিপত্রে দেখা যায়, যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্রে মাওলানা মোহাম্মদ আলী (এমএম) সড়কের পশ্চিম পাশে ৭০৯ বর্গফুট জায়গা ওই বছরের ১৬ জুন অনুষ্ঠিত পৌরসভার মাসিক সভায় উল্লিখিত দুজনকে ভাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। জায়গাটি যশোর ইনস্টিটিউটের হলেও সেখানে বহুতল মার্কেট নির্মাণের জন্য ফিরোজ-মায়া দুজনের কাছে হস্তান্তরের চুক্তি করেছে পৌরসভা।
ফিরোজ কবীরের দাবি, তারা লিজ পাওয়া জমিতে সাড়ে ৫৮ লাখ টাকা ব্যয় করে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন। ভবনটির নিচতলায় এখন স্যানিটারি শোরুম, দ্বিতীয় তলায় ডেন্টাল ক্লিনিক, তৃতীয় তলায় পানির ফিল্টারের শোরুম এবং চতুর্থ তলায় ট্রাভেল এজেন্সির কার্যালয় রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী তারা যশোর পৌরসভাকে ভাড়া দিচ্ছেন।
অবৈধভাবে দুই ব্যক্তির কাছে জমি হস্তান্তর এবং সেখানে বহুতল মার্কেট নির্মাণের বিষয়টি গত ৩ মে যশোর ইনস্টিটিউট পরিচালনা পর্ষদের সভায় আলোচিত হয়। ওই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ লিটু পৌরসভার প্রশাসককে গত ৬ মে একটি চিঠি দেন। সেখানে তিনি যশোর ইনস্টিটিউটের জমিতে ‘অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করে ভাড়া প্রদান কোনোভাবেই কাম্য নয়’ জানিয়ে সম্পত্তি দখলমুক্ত করে সংস্থাটির কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন।
একই মাসের ৮ ও ১২ তারিখে সাধারণ সম্পাদক ডা. লিটু ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে ছয়টি পৃথক চিঠিতে ‘অবৈধভাবে নির্মিত’ উল্লিখিত ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অনুরোধ করেন।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাসিরউদ্দিন আমার দেশকে বলেন, ‘যশোর ইনস্টিটিউটের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ১৯ মে ওই ভবনের প্রি-পেইড মিটারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করি। কিন্তু হাইকোর্ট তিন মাসের জন্য স্টে-অর্ডার দেওয়ায় ও এ সংক্রান্ত কাগজপত্র আমাদের কাছে পৌঁছলে পরদিনই ভবনটির বিদ্যুতের পুনঃসংযোগ দেওয়া হয়।’
অভিযুক্ত ফিরোজ কবীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, যশোর ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো চিঠিপত্র দেয়নি। লোকমুখে শুনে তারা উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। আদালত তিন মাসের জন্য স্টে-অর্ডার দিয়েছেন। এখন তারা যশোর ইনস্টিটিউটকে ভাড়া দেওয়ার মাধ্যমে সম্পত্তিটি রক্ষা করতে চান বলে জানান।
যশোর পৌরসভার প্রশাসক রফিকুল হাসান আমার দেশকে বলেন, ‘ওই জায়গায় এক সময় পৌরসভার পাম্প হাউস ছিল। তবে জমিটির মালিক যশোর ইনস্টিটিউট। ওই জমির ওপর পৌরসভার কোনো দাবি নেই। আমি যে দিন বিষয়টি জানতে পেরেছি সেদিন থেকেই ভাড়া নেওয়া বন্ধ করেছি।’
তবে জেলা প্রশাসক ও পদাধিকারবলে যশোর ইনস্টিটিউটের সভাপতি আজাহারুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, পরিচালনা পর্ষদের সভায় অবৈধ স্থাপনাটি উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আইনগত কোনো বাধা না থাকলে স্থাপনাটি উচ্ছেদ করা হবে।
পলাতক ও অপসারিত কাউন্সিলর আলমগীর কবীর ওরফে হাজি সুমন পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে জমি, বাড়ি দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী বাহিনী লালনসহ নানা অভিযোগ রয়েছে পুলিশের কাছে।
হাজি সুমনের ছত্রছায়ায় থাকা ফিরোজ কবীর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ‘পানি সংরক্ষণ ও নিরাপদ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে জেলা পরিষদের পুকুর, দীঘি, জলাশয় পুনঃখনন-সংস্কার’ প্রকল্পের অন্যতম ঠিকাদার ছিলেন। ওই কাজ নিয়ে ‘১০ কোটি টাকা খরচ, দশ ফোঁটা পানিও মেলেনি’ শীর্ষক একটি তথ্যবহুল প্রতিবেদন গত ৩ মে আমার দেশে প্রকাশ হয়।
বিষয়টি নিয়ে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আবুল বাশার আমার দেশকে জানান, হাজি সুমনের নামে যশোর কোতোয়ালি থানায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, বিস্ফোরকদ্রব্য আইনসহ অন্তত চারটি মামলা আছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার পতনের পর গা ঢাকা দেওয়ায় সুমনকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। তবে তাকে ধরতে অভিযান চলছে।